কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

আলোচনার মধ্যেই হামলা যুদ্ধকে প্রলম্বিত করার ইঙ্গিত

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬]

আলোচনার মধ্যেই হামলা যুদ্ধকে প্রলম্বিত করার ইঙ্গিত

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা বন্ধে একটি কার্যকর শান্তি স্থাপনে কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলমান রয়েছে। চলমান এই আলোচনা কোনোভাবেই ইউক্রেনের ভূমিতে রাশিয়ার হামলা থামাতে পারেনি, উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরো জোরদার হয়েছে। এই শীতে ইউক্রেনের মানুষ যখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে মরিয়া, এমন সময়ে রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে দেশের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ব্যবস্থা। এরই মধ্যে কয়েক দফায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা।

 
 
 

 

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই আশার কথা শোনাচ্ছেন।

 
 
 
 

 

 

 

যুদ্ধ বন্ধে চলমান এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইউক্রেনের ওপর অব্যাহত রুশ হামলা থেকে এটা অনুমান করা যায় যে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এই যুদ্ধ বন্ধ এবং ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তিকে খুব একটা আমলে নিতে চাইছেন না। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উত্তরসূরি হিসেবে ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর রুশ বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে তেমন একটা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না।

 
 
 
 
 
 

 

যখন থেকে এই আলোচনা শুরু হয়েছিল, ওই পর্যন্ত সময়ে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের ভূখণ্ডের শতকরা ২০ ভাগের কাছাকাছি অঞ্চল দখলে নিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এসে তারা তাদের দখলকৃত এলাকা অনেকটাই সম্প্রসারণ করেছে এবং বর্তমানে দোনবাস অঞ্চলের ৮৫ শতাংশেরও বেশি এলাকা রাশিয়ার দখলে রয়েছে। গত ৩ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে মস্কোতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাক্ষাতে এই শান্তি প্রস্তাব নিয়ে খুব একটা যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা বলা যাবে না, যদিও ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছিলেন। ওই বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট পুতিনের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের দোনবাস এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সংকল্পের কথা জানানো হয়েছিল।

 

 

এখানে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা এই মুহূর্তে বিরাজ করছে তা হচ্ছে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের প্রতিটি মুহূর্তের বিলম্বের খেসারত দিতে হচ্ছে ইউক্রেনের নতুন নতুন ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর এরই মধ্যে এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে যে রাশিয়া এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেকটাই সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এর আগেই ইউক্রেনকে কিছুটা ভূখণ্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে এই যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দেওয়া হলেও জেলেনস্কির পক্ষ থেকে তা বারবারই নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধরত দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের একত্রে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হয়নি। আর এর মূল কারণ হচ্ছে রুশ প্রসিডেন্ট পুতিনের অনীহা, তিনি জেলেনস্কিকে ইউক্রেনের বৈধ কর্তৃপক্ষ মনে করছেন না।

 

 

 

রুশ প্রেসিডেন্ট মনে করছেন, নিজের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার স্বার্থে জেলেনস্কি এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করছেন। এর কিছুটা যে ভিত্তি নেই, সেটা বলা যাবে না। এরই মধ্যে ইউক্রেনে জেলেনস্কির নির্ধারিত মেয়াদ শেষের পর যুদ্ধকালীন সময়ের কারণে নির্বাচন স্থগিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন এই বিষয়টিকেই তাঁর দাবিগুলোর পক্ষে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি জানিয়েছেন যে যদি শান্তিপূর্ণভাবে যুদ্ধ বন্ধে জেলেনস্কি সম্মত না হন তাহলে রাশিয়া শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়েই এর সমাধান করবে।

 

 

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যদিও একটি চুক্তির দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে শতকরা ৯৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, এর সপক্ষে রাশিয়া কোনো ধরনের তৎপরতা না দেখানোয় ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তি প্রস্তাবটি অনেকটাই একপক্ষীয় একটি প্রস্তাব হয়ে আছে। রাশিয়া ট্রাম্পের কোনো প্রস্তাবে সে রকম স্পষ্টভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, উপরন্তু তারা তাদের এর আগে উত্থাপিত দাবিগুলোর প্রতিই অটল রয়েছে, যা আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠকের সময় পুতিনের তরফ থেকে ট্রাম্পের কাছে পেশ করা হয়েছিল এবং এরপর এ ক্ষেত্রে তাঁদের দিক থেকে কোনো ধরনের ছাড়ের খবর জানানো হয়নি।

 

 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ট্রাম্প এবং জেলেনস্কির মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, এটিতে রাশিয়া কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা স্পষ্ট হয়নি। রুশ ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের শান্তিরক্ষী হিসেবে উপস্থিতির বিষয়টি যদি এই নিরাপত্তার অংশ হয়ে থাকে তবে এতে বরাবরই রাশিয়ার আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে দোনবাস অঞ্চলসহ রুশ দখলকৃত অঞ্চল থেকে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনী সরে যাবে—এমন প্রস্তাবে ইউক্রেন সম্মত হলেও রাশিয়া কোনোভাবেই তাদের দখলকৃত এলাকা ছাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় এই শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে তা এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে গেছে। আগামী মাসে আবারও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে একটি কার্যকর প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে বলে জানানো হলেও বাস্তব অবস্থা থেকে এটাই বুঝা যাচ্ছে যে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের উদ্যোগের মধ্যে অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে, যা একটি শান্তিচুক্তিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

 

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।