আমিরাতের ওপেক ত্যাগ : তেল রাজনীতির মেরূকরণ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন [সূত্র : আমার দেশ, ০৯ মে ২০২৬]

সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃক ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার বিষয়টি মূলত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এটা বিশ্ব রাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ওপেকের ভেতরে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে তেলের উৎপাদনসীমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণগুলো এবং এর লাভ-ক্ষতি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
আমিরাত গত কয়েক বছরে তাদের তেল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে তাদের প্রতিদিন প্রায় ৪০-৪৫ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের ক্ষমতা আছে। কিন্তু ওপেকের কোটা পদ্ধতির কারণে তারা এই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না, যা তাদের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। আমিরাত তাদের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চায়। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ (ভিশন ২০৩১) রূপান্তরের জন্য তাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বেশি তেল বিক্রি করে দ্রুত সেই তহবিল গঠন করাই তাদের লক্ষ্য।
ওপেকের নীতি মূলত সৌদি আরবের প্রভাববলয়ে থাকে। আমিরাত এখন আর কেবল জুনিয়র পার্টনার হিসেবে থাকতে চাচ্ছে না, বরং স্বাধীনভাবে নিজেদের বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি পরিচালনা করতে আগ্রহী। ওপেকের বাধ্যবাধকতা না থাকলে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো তেল উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারবে। এতে তাদের জাতীয় আয় বাড়বে এবং আধুনিকায়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। ওপেকের বাইরে থাকলে তারা কম দামে বেশি তেল বিক্রি করে বাজারের বড় অংশ দখল করতে পারবে।
যদি আমিরাত বেশি তেল বাজারে ছাড়ে, তবে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। সরবরাহ বাড়লে তেলের দাম কমতে পারে, যা আমদানিকারক দেশগুলো, বিশেষত ভারত ও চীনের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।
এতে ক্ষতির সম্ভাবনাও আছে। কাতার ও অ্যাঙ্গোলার পর আমিরাতের মতো বড় উত্তোলক দেশ বেরিয়ে গেলে ওপেকের জোটবদ্ধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের যে একচ্ছত্র ক্ষমতা ওপেকের আছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। সৌদি আরবের জন্য এটি বড় একটি ধাক্কা। ওপেকের প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে তাদের কথা মানার প্রবণতা কমে যাবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। অবাধ উৎপাদনের ফলে তেলের দাম অনেক কমে যেতে পারে, যা অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করবে। এছাড়া তেলের জোগান বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার জন্য নেতিবাচক।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ খুশি এবং তিনি একে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। গত ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই পদক্ষেপকে ‘দুর্দান্ত’ (Great) বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের খুশির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—ট্রাম্প মনে করেন, আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন করলে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। এতে তেলের দাম এবং বিশেষ করে আমেরিকায় পেট্রোলের (গ্যাসোলিন) দাম কমবে। তিনি বলেছেন, ‘এটি তেলের দাম কমানো এবং সব কিছুর দাম কমানোর জন্য একটি ভালো দিক।’
ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবেই ওপেকের কঠোর সমালোচক। তিনি মনে করেন, এই জোটটি বাজারে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখে। আমিরাতের মতো বড় উত্তোলক দেশ বেরিয়ে যাওয়া মানে ওপেকের ক্ষমতা খর্ব হওয়া, যা ট্রাম্প সব সময় চেয়েছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে আমিরাতের বর্তমান নেতৃত্বের (শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান) ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সখ্য বেশ ভালো। ট্রাম্পের মতে, আমিরাত এখন তাদের নিজস্ব পথে চলতে চায় এবং এটি তাদের সার্বভৌম অধিকার। সহজ কথায়, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো সস্তায় জ্বালানি এবং মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙা রাখা। আমিরাত যদি ওপেকের কোটা ভেঙে বেশি তেল বাজারে ছাড়ে, তবে ট্রাম্পের সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়া সহজ হবে। তাই তিনি আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগ করার পেছনে ইসরাইলের সরাসরি এবং পরোক্ষ—উভয় ধরনের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে চলমান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপটি ইসরাইলের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসরাইলের প্রধান স্বার্থগুলো হলো : ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস (Abraham Accords) স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হয়েছে। আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, তারা এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব ব্লকের তেল রাজনীতির বাইরে গিয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এটি ইসরাইল ও আমেরিকার বলয়ে আমিরাতের অবস্থানকে আরো সুসংহত করবে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওপেকের শক্তি খর্ব হওয়া ইসরাইলের জন্য ইতিবাচক। ইরান তেল রপ্তানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। আমিরাত যদি ওপেক ত্যাগ করে এবং স্বাধীনভাবে প্রচুর তেল বাজারে ছাড়ে, তবে তেলের বৈশ্বিক দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তেলের দাম কমলে ইরানের মতো তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর রাজস্ব আয় কমে যাবে, যা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। আমিরাত ও ইসরাইলের মধ্যে জ্বালানি ক্ষেত্রে বেশ কিছু গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি রয়েছে। আমিরাত স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন করলে ইসরাইলের জন্য সস্তায় ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পাওয়ার পথ সহজ হবে। ওপেক মূলত আরব দেশগুলোর একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট। আমিরাতের এই বিচ্ছেদ জোটটিকে দুর্বল করবে। ইসরাইল ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য দেখতে চায়, যেখানে আরব দেশগুলো একক কোনো শক্তিশালী জোটের অধীনে না থেকে বরং খণ্ডিত ও স্বাধীনভাবে কাজ করে। এটি ওই অঞ্চলে ইসরাইলের প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়।
আমিরাত এখন তাদের তেলের বাণিজ্য বাড়াতে ইসরাইলের পাইপলাইন (যেমন ইলাত-আশকেলন পাইপলাইন) ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরো বেশি আগ্রহী হতে পারে। ওপেকের সদস্য থাকাকালে অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে সরাসরি ইসরাইলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা তাদের জন্য কঠিন ছিল। এখন সেই বাধা অনেকখানি দূর হবে। ইসরাইল সরাসরি তেলের রাজনীতি না করলেও, তাদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র আমিরাতের ওপেকের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী জোট থেকে বেরিয়ে আসা তাদের ‘ইরানবিরোধী’ কৌশলকে শক্তিশালী করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরো স্বাধীন ও মজবুত করে তোলে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগ করার এই সিদ্ধান্তটি বর্তমান ২০২৬ সালের ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই ঘটনায় ইরানের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া বেশ স্পষ্ট। ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে, যা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল যাতায়াত করে। আমিরাত ঠিক এই সময়েই ওপেক ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। ইরান ওপেককে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল, যাতে তেলের দাম চড়া থাকে এবং পশ্চিমা বিশ্বযুদ্ধের চাপে নতি স্বীকার করে। আমিরাতের এই বিচ্ছেদ ওপেকের সেই ‘একতাবদ্ধ’ শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা ইরানের তেল রাজনীতির ওপর একটি বড় আঘাত। ইরান ও আমিরাত একে অপরের প্রতিবেশী হলেও তেলবাজারে তারা বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। আমিরাতের এই পদক্ষেপে ইরান ক্ষুব্ধ, কারণ এটি ওপেক প্লাস (OPEC+) জোটের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে।
আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, তারা এখন কোটা ছাড়াই প্রচুর তেল উৎপাদন করতে পারবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে দাম চড়া থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে দাম কমলে ইরানের যুদ্ধকালীন অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরান ওপেকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আমিরাতের মতো শক্তিশালী সদস্য বেরিয়ে গেলে ওপেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে সৌদি আরব ও ইরানের মতো দেশগুলোর বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়, যা ইরানের ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির শক্তিকে কমিয়ে দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কড়া অবরোধ (Blockade) আরোপ করে রেখেছে। আমিরাত যদি বেশি তেল বাজারে ছাড়ে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আরো নির্ভয়ে ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সাহস পাবে, কারণ আমিরাতের অতিরিক্ত তেল সেই অভাব পূরণ করে দেবে।
আমিরাতের ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্তে ইরানের কি কোনো লাভ আছে? সরাসরি কোনো লাভ না থাকলেও পরোক্ষভাবে একটি বিষয় ইরানের পক্ষে যেতে পারে: আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরো স্পষ্ট হয়েছে। জিসিসি দেশগুলোর এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলো একতাবদ্ধ না থাকলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ইরানের জন্য সহজ হয়। ইরানের জন্য এটি মূলত একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি। আমিরাতের এই ‘একলা চলো’ নীতি ইরানের তেল দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এবং ট্রাম্পের ইরানবিরোধী নীতিকে সাহায্য করছে।
ওপেক ও তার উৎপাদন ক্ষমতা
২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ওপেকের সদস্যসংখ্যা এখন ১১। সংযুক্ত আরব আমিরাত বিদায় নেওয়ায়, এই সংখ্যা ১০-এ নেমে এসেছে। নিচে সদস্য দেশগুলোর নাম এবং তাদের তেল উৎপাদন সক্ষমতার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো। ওপেক মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি জোট। দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, গ্যাবন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও বিষুবীয় গিনি (Equatorial Guinea)। উল্লেখ্য, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর ও অ্যাঙ্গোলা এর আগে ওপেক ত্যাগ করেছে। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওপেকের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং দেশভিত্তিক প্রধান কয়েকটির তথ্য উল্লেখ করা হলো: দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা (ব্যারেল), বর্তমান বাস্তব উৎপাদন (২০২৬-এর গড়)।
সৌদি আরব প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ, ৯৯ লাখ – ১ কোটি ১০ লাখ; ইরাক প্রায় ৪৮ লাখ, ৪৪ লাখ – ৪৫ লাখ; আমিরাত প্রায় ৪৫ লাখ, ৪০ লাখ – ৪২ লাখ; ইরান প্রায় ৩৮ লাখ, ৩৫ লাখ – ৪২ লাখ; কুয়েত প্রায় ২৯ লাখ, ২৬ লাখ – ২৭ লাখ; নাইজেরিয়া প্রায় ১৫ লাখ, ১৩ লাখ – ১৪ লাখ; অন্যান্য সদস্য প্রায় ৪৫-৫০ লাখ। সর্বমোট (OPEC) প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ+, প্রায় ২ কোটি ৯৭ লাখ।
ওপেকের বাইরেও রাশিয়া, কাজাখস্তান, মেক্সিকো এবং ওমানের মতো আরো ১০টি দেশ ওপেকের সঙ্গে মিলে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। এই জোটটিকে বলা হয় OPEC+। রাশিয়ার উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক প্রায় এক কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ ওপেক দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া বিশ্বের প্রমাণিত তেলের মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ এই দেশগুলোর হাতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় একজন উৎপাদক (যাদের ক্ষমতা ৪৫ লাখ ব্যারেল) বেরিয়ে যাওয়ায় ওপেকের মোট শক্তিতে বড় ধরনের ধস নামবে।
পরিশেষে বলা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগ কেবল একটি অর্থনৈতিক জোট থেকে বেরিয়ে আসা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। একদিকে যেমন এই পদক্ষেপটি আমিরাতের নিজস্ব ‘ভিশন ২০৩১’ বাস্তবায়নে এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে, অন্যদিকে এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের ‘তেল কূটনীতি’র প্রথাগত কাঠামোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিল। ওপেকের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে ফাটল ধরায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ, যা একদিকে যেমন ট্রাম্প প্রশাসনের সস্তা জ্বালানি নীতিকে তুষ্ট করছে, তেমনি অন্যদিকে ইরান বা সৌদি আরবের মতো তেলনির্ভর দেশগুলোর জন্য তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি। বর্তমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের এই উত্তাল সময়ে আমিরাতের এই ‘একলা চলো’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরূকরণকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। বাজার দখলের লড়াই আর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের এই খেলায় শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, বিশ্ব তেলের বাজারে ওপেকের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে এবং এক নতুন, অস্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি যুগের দিকে ধাবিত হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার