কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

আরব কূটনীতির নতুন বাঁক

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার [সূত্র : খোলাকাগজ, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬]

আরব কূটনীতির নতুন বাঁক
একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত জোট, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ কাঠামো আরব রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হলেও, একই সঙ্গে তা তাদের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও নীতি-নির্ধারণের পরিসরকে সীমিত করে রেখেছিল। 
 
 
 
তবে সাম্প্রতিক দশকে বৈশ্বিক শক্তি বিন্যাসে যে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে, তা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই ঐতিহ্যগত নির্ভরশীলতার মডেল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি, রাশিয়ার সক্রিয় আঞ্চলিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার পুনর্গঠন মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আরব রাষ্ট্রগুলো আর শুধু বৈশ্বিক শক্তির নীতির অনুসারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করছে না; বরং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে তারা তাদের কৌশলগত বিকল্প সম্প্রসারণে মনোযোগী হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংস্কার, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরব বিশ্বে একটি আত্মবিশ্বাসী ও স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
 
 
 
 
অন্যদিকে, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক, ধর্মীয় ও প্রভাবগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরব কূটনীতির নতুন গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যারিয়েবল হিসেবে কাজ করছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে আঞ্চলিক সংলাপ, মধ্যস্থতা এবং কৌশলগত সমঝোতার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো একদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার রক্ষক ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা জোরদার করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও স্বার্থনির্ভর ও পরিস্থিতি-সংবেদনশীল কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করছে।
 
 
 
এ বাস্তবতায় আরব পররাষ্ট্রনীতি আর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বা ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, বহুপাক্ষিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক কৌশল এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের পুনঃসংজ্ঞার সমন্বয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক রূপ লাভ করছে। এই প্রবন্ধে সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে ‘আরব কূটনীতির নতুন বাঁক’ এর রাজনৈতিক অর্থ, কৌশলগত তাৎপর্য এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
 
 
 
চীন-আরব সংলাপ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিসরে এক নতুন বহুপাক্ষিক বাস্তবতার সূচনা করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে চীন আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একটি বিকল্প কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে, যা ঐতিহ্যগত পশ্চিমা নির্ভরতার একমাত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আরব রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক বিকল্প সম্প্রসারণ এবং নীতি-নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করছে। চীনের ‘অ-হস্তক্ষেপ’ নীতি এবং বাস্তববাদী কূটনৈতিক আচরণ অনেক আরব রাষ্ট্রের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও ঝুঁকিমুক্ত অংশীদারত্ব হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত মানচিত্রে নতুন শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করছে।
 
 
 
 
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতার উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বমুখর ভূরাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও প্রভাবগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করে রেখেছিল এবং প্রক্সি সংঘাতকে বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছিল। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংলাপ ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন স্থায়ী সংঘাত আর কৌশলগতভাবে লাভজনক নয়। বরং দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা ও সীমিত সহযোগিতার মাধ্যমেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ সমঝোতা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে : আঞ্চলিক নিরাপত্তা আর শুধু বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকিয়ে রাখা যাবে না; বরং স্থানীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাস্তববাদী সমঝোতাই এর প্রধান ভিত্তি।
 
 
 
মার্কিন নির্ভরতা হ্রাস ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি
 
 
আরব রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ঐতিহ্যগত নির্ভরতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। এটি কোনো আকস্মিক বিচ্ছেদ নয়; বরং একটি হিসাবি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন আরব রাষ্ট্রগুলোকে বিকল্প কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধানে উৎসাহিত করেছে। 
 
 
 
এর ফলে বহুপাক্ষিক কূটনীতির গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় শক্তি এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এই বহুমুখী কৌশল আরব রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার এবং নীতি-নির্ধারণে কৌশলগত নমনীয়তা নিশ্চিত করছে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির এই প্রবণতা আরব রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। 
 
 
 
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলো এখন শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির অংশগ্রহণকারী নয়; বরং তারা সক্রিয়ভাবে ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। কৌশলগত অংশীদারত্ব, মধ্যস্থতামূলক কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে এসব রাষ্ট্র নিজেদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি করছে। 
 
 
 
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানচিত্রে একটি নতুন বাস্তবতা গড়ে উঠছে, যেখানে আরব রাষ্ট্রগুলো আর শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং উদ্যোগী ও প্রভাবশালী কৌশলগত অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। কাজেই, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার সীমা অতিক্রম করে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে আরব রাষ্ট্রগুলোর এই রূপান্তর তাদের পররাষ্ট্রনীতি, কূটনৈতিক আচরণ এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে মৌলিকভাবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে। 
 
 
 
চীন আরব সংলাপের সম্প্রসারণ, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতার ধীর কিন্তু সুস্পষ্ট হ্রাস এসবই আরব রাষ্ট্রগুলোর নীতি-নির্ধারণে এক নতুন বাস্তববাদী কৌশলের ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রগুলো শুধু কূটনৈতিক বিকল্প বাড়াচ্ছে না; বরং নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের সক্ষমতাও সুদৃঢ় করছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো একদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সংঘাত ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বহুপাক্ষিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং মধ্যস্থতামূলক উদ্যোগের সমন্বয়ে তারা এমন এক কূটনৈতিক কাঠামো নির্মাণে সচেষ্ট, যা একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্ক ও স্বার্থসমন্বয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। 
 
 
 
এই রূপান্তরকে শুধু আঞ্চলিক রাজনীতি বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। বাস্তবে এটি একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর নীতি প্রণয়ন, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সমন্বিতভাবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা কাঠামো এবং কূটনৈতিক আচরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি রচিত হচ্ছে যার প্রভাব শুধু আরব বিশ্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈশ্বিক জিওপলিটিক্সের গতিপথ অনুধাবনের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হবে।
 
 
 
লেখক : আইনজীবী ও গবেষক