বাংলাদেশ ফার্স্ট : নতুন পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার
মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৩ মার্চ, ২০২৬]

বাংলাদেশ আজ তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ভৌগোলিক স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আবারও জাতিকে সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। দীর্ঘ সময়ের শাসনের অবসান এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হয়েছে একটি স্পষ্ট নীতি, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ অগ্রাধিকার’ পররাষ্ট্রনীতি, যার মূল লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। তাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশেরও উচিত তার পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ করা নিজস্ব স্বার্থ, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সামনে রেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিশোধের রাজনীতি বা বিচ্ছিন্নতার নীতি নয়, বরং এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যেখানে আত্মমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান এবং পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এই দর্শনের মূলকথা হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং প্রতিটি অর্থনৈতিক চুক্তির কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে, বরং এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখবে, কিন্তু কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবে না। এই নীতির ভিত্তি হতে পারে একটি বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক বজায় রাখা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সমতার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং বৃহৎ জনশক্তি—এই সবকিছু মিলিয়ে দেশটি ভবিষ্যতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, বাস্তববাদী এবং সুদূরপ্রসারী। অতএব, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রদর্শন। এর মূলভিত্ত্তি সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার। বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, সহযোগিতা থাকবে বহুস্তরে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সব সময় বাংলাদেশের স্বার্থ সামনে রেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি সুসংহতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ কেবল একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং একটি আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অমর। কিন্তু ইতিহাস বর্তমান নীতির একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য, পানিবণ্টন, ট্রানজিট, নিরাপত্তা সহযোগিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু চুক্তি জনমনে ভারসাম্যহীনতার ধারণা তৈরি করেছে। দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি, তিস্তা নদীর পানিচুক্তির অনিশ্চয়তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক জনমতের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সম্পর্ক ছিন্ন করার আহবান নয়, বরং সমতার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের দাবি। এই নীতির কেন্দ্রে রয়েছে কূটনৈতিক বৈচিত্র্য। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে একক নির্ভরতা কমাতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা হবে কৌশলগত লক্ষ্য। বিমসটেক, আসিয়ান ও অন্যান্য আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে বহুমাত্রিক অংশীদারি গড়ে তোলা বাংলাদেশের দর-কষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করবে। বহুমুখী কূটনীতি মানে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান—কোনো শিবিরে নয়, বরং স্বার্থনির্ভর অবস্থান।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এই নীতির আরেকটি স্তম্ভ। বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে, তবে তা হবে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং কৌশলগত নিরাপত্তার শর্তে। টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো সংবেদনশীল খাতে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিরোধে নীতিগত সুরক্ষা প্রয়োজন। প্রতিটি চুক্তির মানদণ্ড হবে—এটি কি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করছে? পানি কূটনীতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক বণ্টন কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় অবস্থান, সম্মানজনক আলোচনার মাধ্যমে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা। নিরাপত্তা সহযোগিতাও নতুন করে পর্যালোচিত হবে। আঞ্চলিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা প্রয়োজনীয় হলেও তা অবশ্যই বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক যোগাযোগে পারস্পরিকতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
তথ্যযুদ্ধের যুগে বর্ণনাগত সার্বভৌমত্বও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির যথাযথ উপস্থাপন নিশ্চিত করা হবে সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। জাতীয় ভাবমূর্তি রক্ষা এখন কূটনীতির অংশ। ২০২৪ সালের আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই নীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। তাদের প্রত্যাশা গণতান্ত্রিক শাসন, স্বচ্ছতা ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যা সমতার ভিত্তিতে আলোচনা করবে এবং জাতীয় স্বার্থে আপসহীন থাকবে। এই নীতি ভারতের বিরুদ্ধে নয়, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা বাস্তবতা। তবে অংশীদারি হবে সমতার ভিত্তিতে। ন্যায্য বাণিজ্য, সময়মতো পানিচুক্তি, সীমান্তে মানবিক আচরণ এবং সংবেদনশীল কূটনৈতিক যোগাযোগ—এসবই পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে পারে। একটি স্থিতিশীল, আত্মনির্ভর বাংলাদেশ ভারতেরও স্বার্থে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে, এক নির্ভরতার জায়গায় আরেক নির্ভরতা যেন না তৈরি হয়। চীন, জাপান, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কও হবে ভারসাম্যপূর্ণ। বহুমুখী কূটনীতি মানে কৌশলগত নমনীয়তা। অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক শক্তি বৃদ্ধিই বহির্নীতির ভিত্তি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বচ্ছ নির্বাচন ও জবাবদিহি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই শক্তিশালী কূটনীতির ভিত্তি। অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ বাংলাদেশকে আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থান দেবে। উৎপাদন ও রপ্তানিতে বৈচিত্র্য এনে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ আসলে ১৯৭১-এর চেতনার পুনরুজ্জীবন—কারো বিরুদ্ধে নয়, বরং আত্মনির্ধারণের পক্ষে। স্বাধীনতা এককালীন অর্জন নয়, এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করার অঙ্গীকার। সামনের পথ সহজ নয়। তবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান এবং বহুমুখী অংশীদারির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসী, স্থিতিশীল ও সম্মানিত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, যেখানে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে।
লেখক : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক