কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশেও জ্বালানি রূপান্তর যেভাবে সম্ভব হতে পারে

শফিকুল আলম [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ৬ মে ২০২৬]

বাংলাদেশেও জ্বালানি রূপান্তর যেভাবে সম্ভব হতে পারে

এক দশকেরও বেশি আগে নোবেল বিজয়ী স্টিভেন চু বলেছিলেন, ‘কথিত আছে, পাথরের যুগ পাথরের অভাবে শেষ হয়নি; বরং আমরা এর চেয়ে ভালো সমাধানের পথ বেছে নিয়েছি।

 
 
 

জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের জন্য একই সুযোগ করে দিয়েছে।’ তার বলা এ ভালো সমাধান একটি পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য জরুরি। তার চেয়ে বেশি জরুরি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে সরবরাহ ও উচ্চমূল্যের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে। আর ৬২ শতাংশের বেশি প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করা বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো ও পরিষ্কার জ্বালানিতে বিনিয়োগ, অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্তরের প্রাসঙ্গিকতা অনেক দেশের চেয়ে বেশি। ২০২২ সালের ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনেক ভুগেছে এবং ভুগিয়েছে জনগণ, শিল্প খাত ও ব্যবসায়ীদের। দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, তবু পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করা যায়নি। বেড়েছে ভর্তুকির চাপ।

 
 
 
 
 

প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির রয়েছে যথেষ্ট উপযোগিতা: একসময় সোলার হোম সিস্টেম এ সফলতা পেলেও শুরু থেকেই আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত ধীরলয়ে এগিয়েছে। অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে, আমাদের মাঝে কাজ করেছে নানা শঙ্কা। একদিকে কৃষিনির্ভর ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির সংকট নিয়ে বারবার আলোচনা করা হয়েছে, অন্যদিকে সৌর ঘণ্টা নিয়েও এখনো হচ্ছে বিস্তর আলোচনা। এটা অনস্বীকার্য বাংলাদেশের জমির সংকট রয়েছে। তবে সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প স্থাপন করার মতো জমি এদেশে নেই তা বলা যাবে না। বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে অনেক জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যেখানে সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সেচ কাজে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং ৮৭ হাজার গ্রামে কিছু কিছু করে সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে পরিমাণটা মেগাওয়াটে নেহাত মন্দ হবে না।

 

আবার পাকিস্তান ও ভারতে সৌর ঘণ্টা আমাদের চেয়ে বেশি সেটা মাথায় নিয়েই এগোতে হবে। আমাদের সৌর ঘণ্টা কম হওয়ায় সৌরবিদ্যুতের খরচ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। তথাপি সৌরবিদ্যুতের রয়েছে যথেষ্ট আর্থিক উপযোগিতা। প্রথমেই সৌরবিদ্যুৎ পারে আমাদের দিনের বেলায় সবচেয়ে খরুচে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকে প্রতিস্থাপন করতে। যেহেতু ব্যাটারি স্টোরেজের খরচ কমেছে, ক্রমে রাতের বেলায় আমরা যে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি তা নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফার্নেস অয়েল দিয়ে ১০ হাজার ৮৬০ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ১৬ টাকার বেশি জ্বালানি খরচ হয়েছে। শুল্ক বাদ দেয়া হলেও প্রতি ইউনিট তেলভিত্তিক বিদ্যুতে জ্বালানি খরচ হয়েছে ১২ দশমিক ৫ টাকার বেশি। গত অর্থবছরে তেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিবেচনায় নিয়ে তার ৮০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ফার্নেস অয়েল আমদানি কমাতে পারে। আইইইএফএর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান এবং পোশাক শিল্পে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম তাদের বিদ্যুতের ১ শতাংশেরও কম তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করলেও গত অর্থবছরে আমরা ১১ শতাংশের মতো বিদ্যুৎ তেল থেকে উৎপাদন করেছি। আমাদেরও ক্রমে তেল ব্যবহার কমাতে হবে, যাতে খরচ বাঁচানো যায়।

 

 

আবার বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুতের সুযোগের সদ্ব্যবহার আমরা এখনো খুব একটা করতে পারিনি। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও স্রেডা প্রকাশিত তথ্যানুসারে এ খাতে স্থাপিত সক্ষমতা ৩১৬ মেগাওয়াট। শিল্প-কারখানার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় এর পরিমাণ ৫০০ মেগাওয়াটের চেয়ে বেশি। তথাপি শিল্প খাতে এখনো ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের অনেক সুযোগ রয়ে গেছে।

 

 

এর সঙ্গে সেচ ব্যবস্থায় এক মিলিয়নের বেশি ডিজেলচালিত পাম্প রয়েছে, যেগুলো সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে বছরে শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ডিজেল আমদানি সাশ্রয় করা যাবে। গ্রিডে সংযুক্ত করা হলে সেচ মৌসুম ছাড়া অন্য সময় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

 

 

বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে অফশোর এ বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি বায়োগ্যাস ও অন্যান্য উৎসের উপযুক্ত ব্যবহার আমাদের জানাই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

 

 

জ্বালানি দক্ষতা বাড়লেও এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়েছে: আইইইএফএর গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৫২। বাংলাদেশে জ্বালানি দক্ষ যন্ত্র যেমন এলইডি বাতি মোটামুটি সবাই ব্যবহার করে। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষ ইনভার্টার সংযুক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। শিল্প খাতে অনেক কারখানায় পুরনো মোটর পরিবর্তন করে দক্ষতা বাড়ানো হয়েছে এবং অনেকেই ক্যাপটিভ জেনারেটার থেকে নির্গত তাপ ব্যবহার করছে। অন্য কারখানাগুলোকেও জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে এ পদক্ষেপগুলো নিতে উৎসাহিত করতে হবে। বয়লারের দক্ষতা বাড়ানো অথবা ইলেকট্রিক বয়লার বা হিট পাম্পে স্থানান্তরের দিকেও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এতে জ্বালানি সাশ্রয় অনেক বাড়বে।

 

 

স্রেডা কর্তৃক বাছাইকৃত মনোনীত ভোক্তাদের (১৮৯টি) জ্বালানি নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যোলোচনা করে, তাদের বার্ষিক জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে।

 

 

জ্বালানি রূপান্তরে প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে ও দক্ষতা বাড়াতে আমদানি শুল্ক একটি বড় বাধা। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশে ২৮ দশমিক ৭৩ থেকে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য, যা প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রাংশেও (ইনভার্টার যুক্ত কম্প্রেসর) উচ্চ আমদানি শুল্ক রয়েছে। জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে আগামী বাজেটে সরকার চাইলে এ শুল্ক বাতিল করতে পারে।

 

 

আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অংশীজনরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন নিট-মিটারিংয়ের সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতার কথা। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় নিট-মিটারিংয়ের সংযোগ প্রাপ্তির সময়সীমা সাতদিন করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেকেই আগ্রহী হবে।

 

 

পোশাক শিল্প খাত ও বিভিন্ন করপোরেট (যেমন টেলিকম) কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। তথাপি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাদের জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য উৎসের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট নীতিমালা ২০২৫ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তা বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ কারখানা বা করপোরেটের কাছে এ বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে।

 

 

কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনা থেকে জানা যায় বিদ্যুৎ খাতের ইউটিলিটিগুলো এ ধরনের প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি প্রায় ৩ টাকা হুইলিং ও আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে ধার্য করতে চায়। প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১০ টাকা বিবেচনায় নিলে একটি কারখানার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ পড়বে ১৩ টাকা, যা শিল্পে ব্যবহৃত গ্রিডের বিদ্যুৎ খরচের চেয়ে বেশি। শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুতের ব্যবহার কমে গেলে রাজস্ব কমে যাবে ভেবে ইউটিলিটিগুলো এ বাড়তি টাকা নিতে চাচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত দুই অর্থবছরে শিল্পে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে যথাক্রমে ৬ দশমিক ১ ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টের আওতায় একটি সময় নির্দিষ্ট করে দিতে পারে, যার ভেতর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হুইলিং ও আনুষঙ্গিক খরচ দশমিক ৫ থেকে ১ টাকা পর্যন্ত হবে (উদাহরণস্বরূপ)।

 

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে। এতে সরকারি জমি ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পে গতি আনতে হলে জমি লিজ দেয়া থেকে শুরু করে ট্যারিফ নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা প্রয়োজন। সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য জরুরি হলো জমির ভাড়া, বিদ্যুতের ট্যারিফ ও চুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো।

 

 

জ্বালানি রূপান্তরে গ্রিড আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে হবে।

 

 

পরিশেষে বাংলাদেশেও জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব এটা আমাদের যেমন বিশ্বাস করতে হবে, তেমনি এ রূপান্তরে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং পরিকল্পিত জ্বালানি রূপান্তরে নিতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ।

শফিকুল আলম: ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসে (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত