কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির নতুন দিগন্ত পূর্ব ইউরোপ

লোকমান শাহ [প্রকাশ : কালবেলা, ২২ এপ্রিল ২০২৬]

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির নতুন দিগন্ত পূর্ব ইউরোপ

বাংলাদেশের বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের এই বিশাল রিজার্ভের সিংহভাগ এসেছে বিদেশে কর্মসংস্থান তথা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। লাখ লাখ পরিবার এই বিদেশি আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

 

 

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের মূল গন্তব্য; কিন্তু এই নির্ভরতা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া, একাধিক দেশের শ্রমবাজার বন্ধ হওয়া, শ্রমশক্তি প্রেরণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া, সিন্ডিকেট কেলেঙ্কারি, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে, ঠিক তখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তথা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

 

 

রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা—এ দেশগুলোতে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় নতুন এই বাজারেও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও সংকট: কর্মীদের ‘জাম্পিং তথা অবৈধভাবে পশ্চিম ইউরোপ বা সেনজেনের দেশগুলোতে কর্মীদের পলায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং দক্ষ কর্মীর অভাব। এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সম্পূর্ণ ইতিহাস থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের বর্তমান চিত্র, ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ইতিহাস

 

 

প্রাক-স্বাধীনতাকাল থেকে শুরু: বাংলাদেশ থেকে মানুষের বিদেশ গমনের ইতিহাস স্বাধীনতার আগেও ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বিশেষত সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কিছু মানুষ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও অনিয়মিতভাবে, কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল না।

 

 

স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক বাস্তবতা: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, কৃষিনির্ভর ভঙ্গুর অর্থনীতি। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুধু ব্যক্তিগত উপার্জনের বিষয় ছিল না, এটি হয়ে ওঠে জাতীয় অর্থনৈতিক টিকে থাকার কৌশল।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের সুযোগ (১৯৭৩-৭৬)

 

 

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তেলের দাম হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য গালফ দেশ বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করে এবং লাখ লাখ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে। এটিই বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় সুযোগ।

 

 

১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আটটি গালফ দেশে মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়। তখনকার প্রেরিত কর্মীদের ৯০ শতাংশই ছিলেন অদক্ষ শ্রমিক—কৃষি, নির্মাণ ও পরিচ্ছন্নতা খাতে কর্মরত। ১৯৭৮ সালের প্রথম তিন মাসেই সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪ লাখ ডলারেরও বেশি, আর সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছিল ২ মিলিয়ন ডলার, যা তখনকার বাংলাদেশের জন্য বিশাল পরিমাণ।

 

 

জিয়াউর রহমান সরকারের অবদান (১৯৭৬-৮১)

 

 

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকে একটি কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করেন। তার নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালে ‘জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’ (BMET) প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়।

 

 

১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের আগে বাংলাদেশ ইরান সরকারের সঙ্গে ২৪ হাজার কর্মী পাঠানোর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যাতে পরবর্তী সময়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনি সরকারও সম্মতি প্রদান করেছিলেন। ১৯৮০ সাল নাগাদ আরব দেশগুলোর সঙ্গে একাধিক চুক্তির আওতায় বিপুল পরিমাণ কর্মী বিদেশে যেতে থাকেন। ১৯৮১ সালে বেসরকারি এজেন্সিগুলোকে জনশক্তি রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। জিয়া সরকারের চার বছরে ৬০ হাজারেরও বেশি দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন।

 

 

জিয়াউর রহমান মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে উন্মুক্ত করার কূটনৈতিক উদ্যোগ নেন এবং ১৯৮২ সালে The Emigration Ordinance জারির ভিত্তি স্থাপন করেন।

 

 

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে জনশক্তি রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে আছে।

 

 

১৯৮২ সালের অভিবাসন অধ্যাদেশ

১৯৮২ সালে The Emigration Ordinance জারি করা হয়, যা বিদেশে কর্মী প্রেরণের সম্পূর্ণ আইনি কাঠামো দেয়। এই অধ্যাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স, কর্মীর অধিকার সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বিধান স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে ‘Overseas Employment and Migrants Act’ নামে এটি আধুনিকায়ন করা হয়।

 

 

১৯৯০-এর দশক: সম্প্রসারণ ও মন্থরতা

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর বড় শ্রমবাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও তালিকায় যোগ দেয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমবাজারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির কারণে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে। একাধিক দেশে বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা কমে আসে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রোমানিয়া সহ বেশ কিছু দেশ তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়।

 

 

বিএনপি সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ (২০০১-২০০৬)

২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রবাসী আয়ের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে। তারা পাঁচটি মূল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এবং সেই লক্ষ্যে ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করে, যা বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

 

 

লক্ষ্যমাত্রা

১. নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও উন্মুক্তকরণ;

২. প্রবাসী কর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা;

৩. রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার;

৪. বিদেশগামী কর্মীদের কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন;

৫. রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনা।

 

 

এই মন্ত্রণালয় গঠনের ফলে ২০০৩-২০০৪ সাল থেকে পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারীরাও জর্ডান, লেবানন, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী ও গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে যেতে শুরু করেন। (চলবে)

 

 

পূর্ব ইউরোপে প্রথম পদক্ষেপ

চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে এশিয়ার পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে থাকে। রোমানিয়া, সার্বিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড গন্তব্যের মানচিত্রে যুক্ত হয়।

 

 

মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট—দুর্নীতির মহাকাব্য

 

 

২০১৬-১৮ সালের প্রথম সিন্ডিকেট

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই বাজারে দুর্নীতির ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০১৬-১৮ সালে মাত্র ১০টি বিশেষ রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়া বাজারে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়। এই সিন্ডিকেটের মূল পরিচালক ছিলেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি একজন ব্যবসায়ী, যিনি মালয়েশিয়ায় তার রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে শ্রম নিয়োগকে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। বাংলাদেশে তার অংশীদার ছিলেন। BAI RA-র (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস) তৎকালীন মহাসচিব, যিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ আমলাদের সমর্থন নিশ্চিত করেছিলেন। ২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন ও মালয়েশিয়ার MACC-এ আলাদা অভিযোগ দায়ের করা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই তদন্ত থেমে যায়।

 

 

২০১৮ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয়—একটি জাতির শ্রমিকরা সুযোগ হারায়।

 

 

২০২১-২৩ সালের বৃহত্তর সিন্ডিকেট

২০২১ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুললে ১০ এজেন্সির পরিবর্তে ১০০ এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দেখিয়েছে, অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর বড় অংশ তৎকালীন মন্ত্রী, তাদের পরিবার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

 

 

সরকারিভাবে নির্ধারিত মাইগ্রেশন খরচ ছিল মাত্র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা; কিন্তু বাস্তবে সিন্ডিকেট প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে। আগস্ট ২০২২ থেকে মে ২০২৪-এর মধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। হিসাব অনুযায়ী, এই পুরো পর্বে সিন্ডিকেট ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার করেছে।

 

 

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘুষ, ভুয়া কোটা, ভুয়া নিয়োগকর্তার নামে কর্মী পাঠানো এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো তদন্তযোগ্য। ওই সময়ে ১ লাখের বেশি বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় বেকার, অবৈতনিক বা ঋণগ্রস্ত অবস্থায় আটকে গিয়েছিল। ২০২৩ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য বাজার বন্ধ করে দেয়।

 

 

মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট শুধু দুর্নীতির গল্প নয়—এটি বাংলাদেশের লাখো গরিব মানুষকে দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নথি।

 

 

মন্ত্রণালয় ও BMET–দায়িত্ব, দুর্নীতি ও ব্যর্থতা

কার্যক্রম ও দায়িত্ব: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে BMET (Bureau of Manpower, Enpl oynent and Training) বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির মূল নিয়ন্ত্রক। এর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে: বিদেশি নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র যাচাই ও অনুমোদন, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদান ও তদারকি, কর্মীর ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স, TTC-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ,

প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন এবং বিদেশে কর্মী সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি।

 

 

রোমানিয়ার ভিসা টিম কেন পালিয়ে গেল: ২০২২ সালে রোমানিয়ার প্রথম ভিসা টিম ঢাকায় এসে BMET ভবনের পঞ্চম তলায় অস্থায়ী অফিস স্থাপন করে মাত্র তিন মাসে ৫ হাজার ৪০০ ভিসা ইস্যু করে—এটি একটি উজ্জ্বল সাফল্য। সেই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২৩ সালে আরও বড় ও শক্তিশালী টিম এসেছিল। তারা মার্চের শুরুতে কাজ শুরু করে। কিন্তু এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ না জানিয়েই তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়।

 

 

BMET-এর তৎকালীন মহাপরিচালক বলেছিলেন, ‘তারা কেন গেছে আমি জানি না।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি এড়িয়ে যায়। পরে একাধিক সূত্র জানায়, BMET-এর সাবেক একজন মহাপরিচালকসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ঘুষ দাবি ও অনৈতিক প্রস্তাব থেকে বিরক্ত হয়ে রোমানিয়ান দলটি চলে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, এ পরিবেশে কাজ করা সম্ভব নয়।

 

 

এ ঘটনায় আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু।

এই ঘটনার প্রভাব কতটা গভীর তা বোঝা যায় পরিসংখ্যানে: ২০২২ সালে বাংলাদেশ ছিল রোমানিয়ায় শীর্ষ উৎস দেশ, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পেছনে চলে গেছে।

 

 

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র

রোমানিয়ার ভিসা টিম পলায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মন্ত্রণালয় ও BMET-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো হলো: বিদেশি চাহিদাপত্র যাচাইয়ে ঘুষ, রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়ায় রাজনৈতিক তদবির ও স্বজনপ্রীতি, ভিসা প্রক্রিয়ায় দালাল চক্রের সঙ্গে আঁতাত, কর্মী নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে অনীহা এবং বিদেশি কনস্যুলার মিশনের সঙ্গে অসদাচরণ।

 

 

পূর্ব ইউরোপের পথপ্রদর্শক

বেসরকারি উদ্যোগের অগ্রগামিতা: পূর্ব ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের পুরো কৃতিত্ব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কন্টিনেন্টাল গ্রুপ (বিডি)। ঢাকাভিত্তিক এই রিক্রুটিং এজেন্সি সরকারি কোনো উদ্যোগ বা কূটনৈতিক প্রস্তুতির আগেই রোমানিয়ান নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটি বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতিতে বেসরকারি খাতের অগ্রগামিতার একটি অনন্য উদাহরণ।

 

 

২০০৮ সালের প্রথম উদ্যোগ ও ব্যর্থতা: ২০০৮ সালে এশিয়া কন্টিনেন্টাল গ্রুপের মাধ্যমে প্রথমবার বাংলাদেশি কর্মীরা রোমানিয়ায় যান। এটি ছিল পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ইতিহাসে প্রথম কাঠামোগত প্রচেষ্টা। BMET-এর অনুমোদন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান রোমানিয়ান নিয়োগকর্তাদের কাছে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য শ্রমউৎস দেশ হিসেবে তুলে ধরে; কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টায় কর্মীদের ‘জাম্পিং’ সমস্যায় ২০০৯ সালেই বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।

 

 

২০১৭ সালে পুনরুদ্ধার ও ২০২১-২৩ সালে উত্থান: প্রায় আট বছর পর ২০১৭ সালে ফের এই একই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রোমানিয়ার বাজার পুনরায় চালু হয়। ২০২০-২১ সালে করোনার কারণে রোমানিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপে বিশাল শ্রমিক স্থানান্তর ঘটলে রোমানিয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এই সুযোগে এশিয়া কন্টিনেন্টাল গ্রুপ দ্রুত উদ্যোগ নেয় এবং ব্যাপক পরিমাণ কর্মী রোমানিয়ায় পাঠাতে সক্ষম হয়।

 

 

এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য দেখেই রোমানিয়া সরকার ২০২২ সালে ঢাকায় অস্থায়ী ভিসা মিশন পাঠায়। মাত্র আড়াই বছরে ১৮ হাজার বাংলাদেশি রোমানিয়ায় যান এবং তারা সে দেশের মোট বিদেশি কর্মীর প্রায় ৪০ শতাংশ হয়ে ওঠেন।

 

 

দক্ষতা উন্নয়ন—TTC-তে প্ৰশিক্ষণ কার্যক্রম

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TIC): BMET-এর অধীনে সারা দেশে ৩৭টি (কোনো কোনো সূত্রে ১০৪টি) কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, বগুড়া, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, পাবনাসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এই কেন্দ্রগুলো রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ঢাকা ও চট্টগ্রামে কোরিয়া-বাংলাদেশ TTC এবং ঢাকায় বাংলাদেশ-শ-জার্মান TTC, যা উন্নত প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেয়।

 

 

প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু

TIC-গুলোতে ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক, প্লাম্বিং, অটোমেকানিক্স, কম্পিউটার অপারেশন, গামেন্টস অপারেটিং, রড বাঁধাই, মেসনরি, মেরিন টেকনোলজিসহ ৩০টিরও বেশি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ট্রেড দক্ষতা পরীক্ষার আগে তিন দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণও পরিচালিত হচ্ছে।

 

 

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম

BMET-এর অধীনে ‘Migration Support Unit (MSU)’ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর্মীরা এখন নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ তালিকাভুক্তি, ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স এবং বিদেশ থেকেও অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। BMET-এর ই-লার্নিং সেন্টার বিশেষত ভাষা প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

 

সংকট: চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধান

সব প্রচেষ্টার পরও মূল সংকট হলো প্রশিক্ষণের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। বিদেশে বার্ষিক দক্ষ কর্মীর চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কিন্তু BMET-এর মোট প্রশিক্ষণ সক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার জন। অন্যান্য সরকারি TVET প্রদানকারী আরও ৪০ হাজার যোগ করলেও মোট সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম।

পূর্ব ইউরোপে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী নেপাল ও শ্রীলঙ্কার কর্মীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ, বেশি ইংরেজি জানা এবং প্রশিক্ষিত। এই ব্যবধান না কমালে এই বাজারেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।

 

 

বাংলাদেশের প্রতিযোগী—শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও অন্যরা

রোমানিয়ার শ্রম বাজারে পতন: ২০২২ সালে রোমানিয়ায় বাংলাদেশ ছিল শীর্ষ উৎস দেশ। মাত্র দুই বছরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত রোমানিয়ায় কর্মরত ১ লাখ ৩৬ হাজার বিদেশি কর্মীর মধ্যে নেপাল শীর্ষে ৪৫ হাজার ৮০২ জন নিয়ে, তারপর শ্রীলঙ্কা ২২ হাজার ৫৫৯ জন এবং বাংলাদেশ মাত্র ৮ হাজার ৪৪৯ জন নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে।

 

 

দেশ ২০২২ অবস্থান ২০২৫ কৰ্মী সংখ্যা বর্তমান র্যাঙ্ক

নেপাল ২য় ৪৫, ৮০২ ১ম

শ্রীলঙ্কা ৩য় ২২,৫৫৯ ২য়

বাংলাদেশ ১ম ৮৪৪৯ ৬ষ্ঠ

 

 

নেপাল ও শ্রীলঙ্কা কেন এগিয়ে

তিনটি মূল কারণে বাংলাদেশের চেয়ে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার কর্মীরা ইউরোপীয় নিয়োগকর্তাদের কাছে বেশি পছন্দের। প্রথমত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার কর্মীরা তুলনামূলকভাবে ভালো ইংরেজি বলতে পারেন, যা ইউরোপীয় কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । দ্বিতীয়ত, এই কর্মীরা সাধারণত গন্তব্যে থেকে যান—‘জাম্পিং বা অন্য দেশে পালিয়ে যান না’, যা তাদের নির্ভরযোগ্য হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। তৃতীয়ত, এই দেশগুলোর শ্রম মন্ত্রণালয় ও বিদেশের দূতাবাসগুলো বেশি সক্রিয় এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।

 

 

কেনিয়া, উগান্ডা ও লাতিন আমেরিকা

রোমানিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বড় রিক্রুটিং ফার্ম/কোম্পানিগুলো এখন কেনিয়া, উগান্ডা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও কর্মী নিচ্ছে। এই কর্মীরা ইংরেজিতে দক্ষ, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে অভিজ্ঞ এবং নতুন দেশে সহজে খাপ খাইয়ে নেন। এমনকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যেমন ব্রাজিল, পেরু ও কলম্বিয়া থেকেও কর্মী নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, কারণ রোমানিয়ান ভাষার সঙ্গে স্প্যানিশের গঠনগত মিল আছে।

 

 

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া মানে শুধু বাজার হারানো নয়, এটি লাখ লাখ পরিবারের কর্মসংস্থান সুযোগ হারানো, রেমিট্যান্স হারানো।

পূর্ব ইউরোপের ছয়টি বাজার—বিস্তারিত বিশ্লেষণ

রোমানিয়া

 

 

ইতিহাস ও সূচনা

 

 

২০০৮ সালে এশিয়া কন্টিনেন্টাল গ্রুপের উদ্যোগে শুরু। ২০০৯ সালে জাম্পিংয়ের কারণে বন্ধ। ২০১৭ সালে পুনরায় শুরু। ২০২১-২৩ সালে মাত্র আড়াই বছরে ১৮ হাজার কর্মী। ২০২৪ সালের মার্চে রোমানিয়া শেনজেন জোনে প্রবেশ করে।

 

 

 

বর্তমান অবস্থা

বাজারটি বর্তমানে কার্যত স্থগিত। ‘জাম্পিং’ ও BMET কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে রোমানিয়ান নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে অনাগ্রহী। শেনজেনভুক্তির পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

 

 

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

রোমানিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ লাখেরও বেশি বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য ৯০ হাজার কোটা নির্ধারিত। সরকার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগ নিচ্ছে। ঢাকায় শ্রম কনস্যুলার মিশন স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

 

 

ক্রোয়েশিয়া

ইতিহাস ও সূচনা

২০২১-২২ সাল থেকে শুরু। ২০২৩ সালে পূর্ণাঙ্গ শেনজেনভুক্তি। জানুয়ারি ২০২৫ সালে একমাসেই ৩০০ কর্মী গেছেন।

 

বর্তমান সংকট

২০২৪ সালে ১২ হাজার ৪০০ পারমিটের মধ্যে ৮ হাজার কর্মী কখনো ক্রোয়েশিয়ায় পৌঁছাননি এবং যারা গেছেন তাদের ৫০ শতাংশ অন্যত্র চলে গেছেন। ক্রোয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য ভিসা স্থগিতের হুমকি দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সমাধান: কর্মী বা এজেন্সিকে সরকারের কাছে নির্দিষ্ট জামানত জমা রাখতে হবে এবং চুক্তি পূর্ণ করলে ফেরত পাবে।

 

 

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

পর্যটন ও নির্মাণ খাতে চাহিদা প্রবল। ২০২৪ সালে মোট ২ লাখ ৬ হাজার ৫২৯ ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু হয়েছে—২০২০-এর তুলনায় ২১০ শতাংশ বেশি। শ্রম সহযোগিতা চুক্তি হলে সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

 

 

সার্বিয়া

ইতিহাস ও সূচনা: ২০২১ সালে সার্বিয়ার শ্রমমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২০২২-২৩ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে।

বর্তমান অবস্থা ও সুবিধা: শেনজেনের বাইরে থাকায় ‘জাম্পিং’ সমস্যা তুলনামূলক কম। ২০২৪ সালে সার্বিয়া বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন আইন চালু করেছে, যার আওতায় তিন বছর পর্যন্ত একক পারমিট এবং ইলেকট্রনিক আবেদনের সুবিধা। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে চাহিদা শক্তিশালী।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

UNDP-র সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সার্বিয়ায় শ্রমের চাহিদা ২০২৪ সালের ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১ লাখ ৪৪ হাজারে পৌঁছবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে সার্বিয়া জনসংখ্যা হ্রাসে বিশ্বে ১৩তম—দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কর্মীর চাহিদা থাকবে। সরকার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে।

 

 

পোল্যান্ড

ইতিহাস ও সূচনা: ২০১৪ সালে পোল্যান্ডে মাত্র ১৬০ জন বাংলাদেশি ছিলেন। ২০১৭-১৮ সাল থেকে কর্মী যাওয়া শুরু। ২০২৩ সালে বাংলাদেশি কর্মীসংখ্যা দ্বিগুণ হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পোল্যান্ডে ৬ হাজার ২৭৫ জন বাংলাদেশি বাস করছেন।

বর্তমান অবস্থা

পোল্যান্ড এখন বাংলাদেশের জন্য পঞ্চম বৃহত্তম ইউরোপীয় শ্রমবাজার। ফুড প্রসেসিং, নির্মাণ, লজিস্টিকস ও মেটাল শিল্পে চাহিদা প্রবল। ন্যূনতম মজুরি মাসে ৯৭৭ ইউরো। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন আইনে সব বিদেশি কর্মীকে নিয়মিত কর্মসংস্থান চুক্তিতে নিযোগ দিতে হবে।

ঝুঁকি ও সম্ভাবনা

শেনজেনভুক্ত দেশ হওয়ায় ‘জাম্পিং’-এর ঝুঁকি আছে। তবে দক্ষ কর্মীদের জন্য ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ অনেক। ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এখনো একটি বাধা।

 

 

উত্তর মেসিডোনিয়া

২০২২-২৩ সাল থেকে উদীয়মান বাজার। শেনজেনের বাইরে এবং ইইউ প্রার্থী দেশ। ন্যাটো সদস্য। নির্মাণ, শিল্প ও পরিবহন খাতে চাহিদা বাড়ছে। সরকার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। ইইউ সদস্যপদ পাওয়ার পর মজুরি ও সুযোগ দুটোই বাড়বে।

 

 

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা

২০২২-২৩ সাল থেকে সীমিত সংখ্যায় বাংলাদেশি কর্মী যাচ্ছেন। ২০২৫ সালে বসনিয়া ৬ হাজার ৭০২টি বিদেশি ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৫.৬ শতাংশ বেশি। নির্মাণ, হোটেল ও উৎপাদন খাতে শ্রমিক ঘাটতি। শেনজেনের বাইরে থাকায় ‘জাম্পিং’ সমস্যা কম। বিশেষজ্ঞরা বসনিয়াকে আগামীর সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 

 

দেশ কর্মী পাঠানো শুরু বৰ্তমান অবস্থা প্ৰধান খাত বেতন () মূল চ্যালেঞ্জ

রোমানিয়া ২০০৮/১৭ স্থগিত নির্মাণ ৬০০-৯০০ জাম্পিং, দুর্নীতি, ভিসা মিশন পলায়ন

ক্রোয়েশিয়া ২০২১-২২ স্থগিত পর্যটন ৭০০-১০০০ জাম্পিং, ভিসা স্থগিত

সার্বিয়া ২০২১-২২ চলমান নির্মাণ ৫০০-৯০০ দূতাবাস সংকট

পোল্যান্ড ২০১৭-১৮ আশঙ্কা ফুড/লজিস্টিকস ৯০০-১২০০ দীর্ঘ তিসা প্রক্রিয়া

উ. মেসিডোনিয়া ২০২২-২৩ নতুন নির্মাণ ৪০০-৭০০ সীমিত পরিচিতি

বসনিয়া ২০২২-২৩ নতুন নির্মাণ, হোটেল ৫০০-৮০০ স্বল্পপরিচিত বাজার

 

 

কর্মীদের ‘জাম্পিং’—সবচেয়ে বড় সংকট

জাম্পিং কী ও কেন হয়: ‘জাম্পিং’ বলতে বোঝানো হয় কোনো দেশে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গিয়ে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অন্য দেশে (সাধারণত জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি) অবৈধভাবে চলে যাওয়া। ক্রোয়েশিয়ায় ৬৪ শতাংশ, রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ায় উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশি কর্মী এটি করেছেন।

 

 

জাম্পিংয়ের পেছনে রয়েছে তিনটি মূল কারণ: প্রথমত, ‘রোমানিয়া বা ক্রোয়েশিয়া গেলে সহজেই পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া যাবে।’ দ্বিতীয়ত, উচ্চ বেতন ও উন্নত জীবনের আশা। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বাসি/ মন্ত্রণালয়ের তদারকির অভাব।

 

 

জাম্পিং প্রতিরোধের সমাধান:

জামানত ব্যবস্থা: কর্মী বা কর্মীর অভিভাবক সরকারের কাছে নির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদ জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। চুক্তি পূর্ণ করলে ফেরত, না হলে বাজেয়াপ্ত।

প্রি-ডিপার্চার সঠিক তথ্য: কর্মীদের স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে। শেনজেন পারমিট দিয়ে অন্য দেশে গেলে অবৈধ হওয়া মানে গ্রেপ্তার, কারাগার ও দেশে ফেরত পাঠানো।

ডিজিটাল ট্র্যাকিং: BMET প্ল্যাটফর্মে কর্মীর অবস্থান ও কর্মসংস্থান নিয়মিত আপডেট নিশ্চিত করা।

 

 

দেশের সুনাম রক্ষা ও কূটনৈতিক কৌশল

ভাবমূর্তির সংকট

জাম্পিং সমস্যা, মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট কেলেঙ্কারি এবং BMET কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির ঘটনা—এই সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডের নিয়োগকর্তারা এখন বাংলাদেশের বদলে নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

 

 

সুনাম পুনরুদ্ধারে করণীয়

• দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: BMET/ মন্ত্রণালয়/ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, দুর্নীতি প্রমাণ হলে বিচারের আওতায় আনা এবং তা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার করতে হবে যাতে বিদেশি সরকারগুলো বুঝতে পারে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

 

 

• ‘Bangladesh Skilled Worker’ ব্র্যান্ড: সরকারিভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও বিশ্বস্ততা তুলে ধরার জন্য একটি জাতীয় ব্র্যান্ডিং কৌশল তৈরি করতে হবে।

দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি: বিদেশে প্রতারণার শিকার কর্মীকে দ্রুততার সঙ্গে প্রতিকার দিলে দেশের সুনাম বাড়ে।

 

 

শক্তিশালী রাষ্ট্রদূত নিয়োগ ও দূতাবাসের ভূমিকা

পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে বাংলাদেশের কার্যকর দূতাবাস নেই অথবা লেবার উইং নিষ্ক্রিয়। সার্বিয়ায় বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত রোমে বসে বেলগ্রেডের দায়িত্ব পালন করেন। রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়ায় কার্যকর শ্রম উইং নেই।

 

 

-প্রতিটি লক্ষ্য-দেশে পেশাদার লেবার কাউন্সেলর নিয়োগ দিতে হবে যারা সে দেশের ভাষা ও শ্রমবাজার সম্পর্কে জানেন।

 

 

-দূতাবাসকে কনস্যুলার সেবার পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে নিয়োজিত করতে হবে।

-রাষ্ট্রদূত নিয়োগে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে কূটনৈতিক দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

 

ঢাকায় বিদেশি দূতাবাস আনতে লবিং

রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়াসহ অনেক পূর্ব ইউরোপীয় দেশের ঢাকায় কোনো দূতাবাস নেই। ভিসার জন্য কর্মীদের নয়াদিল্লি বা অন্য দেশ যেতে হয়, যা সময় ও অর্থ উভয়ই নষ্ট করে।

 

 

সরকার এই দেশগুলোকে ঢাকায় দূতাবাস খুলতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। এই কূটনৈতিক লবিং কার্যকর হলে মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

 

 

আইন সংস্কার, কঠোর প্রয়োগ ও সুশাসন

প্রবাসী কল্যাণ আইনকে সময়োপযোগী করা: ২০১৩ সালে প্রণীত ‘Overseas Employment and Migrants Act’ পূর্ব ইউরোপের নতুন শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত। এই আইনে নিম্নলিখিত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি:

 

 

-জাম্পিংবিরোধী কঠোর বিধান: চুক্তি ভেঙে অন্যত্র চলে যাওয়া কর্মীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে পাসপোর্ট ব্লক/রিনিউ বন্ধ করতে হবে।

-জামানত ব্যবস্থার আইনি কাঠামো: কর্মী/অভিভাবকের নির্দিষ্ট অর্থ/সম্পদ সরকারের কাছে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে, অন্য দেশে পালিয়ে গেলেই তা বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

 

 

-ডিজিটাল ট্র্যাকিং: অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সব কর্মীর অবস্থান ট্র্যাকিং করতে হবে।

-কর্মীর আইনি সহায়তা তহবিল: বিদেশে আটকে পড়া বা প্রতারিত কর্মীর জন্য কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন, এজেন্সিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

-দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: মাইগ্রেশন দুর্নীতির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা, এজেন্সি সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

 

কঠোর আইন প্রয়োগ

আইন থাকলেই হবে না, প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত BMET কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচার, মিথ্যা চুক্তিতে কর্মী পাঠানো এজেন্সির সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত হয়রানির জন্য অভিযোগ দায়ের করলে কর্মীদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জ্যাম্পিংকৃত কর্মীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত, পাসপোর্ট ব্লক করার কঠিন আইন প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙাটাই সব সংস্কারের পূর্বশর্ত।

 

 

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সামগ্রিক করণীয়

ইতিবাচক দিক: পূর্ব ইউরোপের শ্রম বাজারের ভবিষ্যৎ কয়েকটি কারণে উজ্জ্বল। এই অঞ্চলের নিজস্ব নাগরিকরা পশ্চিম ইউরোপে চলে যাওয়ায় এবং জন্মহার কমে যাওয়ায় বিশাল শ্রম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রোমানিয়া একাই ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ লাখেরও বেশি বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হবে। রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ক্রোয়েশিয়া শেনজেনে যোগ দিয়েছে এবং সার্বিয়া, বসনিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়া ইইউ সদস্যপদের পথে ভবিষ্যতে মজুরি ও সুযোগ আরও বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের বিপরীতে এই দেশগুলোতে নির্দিষ্ট সময় বৈধভাবে কাজ করলে স্থায়ী বাসস্থান (PR) ও পরিবার আনার সুযোগ রয়েছে।

 

 

সামগ্রিক করণীয়

• সরকারি পর্যায়: রোমানিয়া, সার্বিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া ও বসনিয়ার সঙ্গে দ্রুত দ্বিপক্ষীয় শ্রম চুক্তি সম্পাদন; বিদেশি দূতাবাস ঢাকায় আনতে কূটনৈতিক লবিং; BMET-এর সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্তকরণ।

 

 

-দক্ষতা উন্নয়ন: TTC-র সক্ষমতা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত করা; ইউরোপমুখী বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু; ইংরেজি ও ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

 

 

-আইন ও নিয়ন্ত্রণ: প্রবাসী কল্যাণ আইন সংশোধন; জামানত ব্যবস্থা চালু; দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন।

 

 

-কর্মীদের জন্য: BOESL-এর মাধ্যমে সরকারি চ্যানেলে যাওয়া; গন্তব্য দেশে অন্তত ৩-৫ বছর থেকে PR-এর লক্ষ্য রাখা; কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে বিনিযোগ।

 

 

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী দিয়ে। আজ প্রতি বছর ১০-১৩ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন। কিন্তু এই বিশাল শ্রম প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং দক্ষ কর্মী তৈরির ক্ষমতা গড়ে উঠেছে কম।

 

 

পূর্ব ইউরোপ আজ এক অপার সুযোগের দ্বার। রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া ও বসনিয়া—প্রতিটি দেশেই কাজ আছে, বেতন ভালো, স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই সুযোগ বারবার হাতছাড়া হচ্ছে কারণ আমাদের নিজেদের সমস্যা—দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং সংকীর্ণ স্বার্থান্বেষণ।

 

 

মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট থেকে রোমানিয়ার ভিসা টিমের পলায়ন— সর্বত্র একটি সূত্র: যখনই সুযোগ এসেছে, কেউ না কেউ সেই সুযোগকে লুটের সুযোগে পরিণত করেছে। এক বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, অথচ দায়ীরা মুক্ত। একটি দেশের কূটনৈতিক সুযোগ নষ্ট হয়েছে ঘুষের দাবিতে, অথচ কারও বিচার হয়নি।

 

 

এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না। কিন্তু শুরু করতে হবে এখনই। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে, প্রতিটি গন্তব্য দেশে কার্যকর দূতাবাস স্থাপন করতে হবে, প্রবাসী কল্যাণ আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অটলভাবে কার্যকর করতে হবে। তবেই পূর্ব ইউরোপের এই নতুন দিগন্ত বাংলাদেশের কোটি পরিবারের জীবন বদলে দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হবে।