কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় বাধা ৮টি

[সূত্র : প্রথম আলো, 30/04/2026] নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় বাধা ৮টি

বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বর্তমানে আটটি বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো। আরেকটি সমস্যা হলো, কোনো সমন্বিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের কৌশল না থাকা। সেই সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো ও উচ্চকরের চাপ। এ অবস্থায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে এসব বাধা দূর করতে হবে।

 

 

প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে আয়োজিত ‘দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা এসব বাধার কথা উল্লেখ করেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ জানান, বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যান্য বাধার মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ নিয়ে পরিকল্পিত প্রচারণার অভাব, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক, সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে দূরত্ব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, বিনিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক খাতের অভাব এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবার ঘাটতি।

 

 

এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে কিছু পরামর্শ দিয়ে মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সরকার তাৎক্ষণিক সাতটি সংস্কার করতে পারে। এগুলো হলো, একটি সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগনীতি প্রণয়ন; ব্যবসা নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা; অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের সংকট নিরসন; অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; দক্ষ জনবল তৈরি; পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের প্রসার এবং বাণিজ্যিক চুক্তির সুরক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আধুনিক আইনি কাঠামো প্রণয়ন।

 

 

মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, নতুন সরকারের সামনে আগামী দুই বছরের কম সময়ে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এটা কেবল বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমেই সম্ভব হবে। আর এ জন্য ব্যবসায়িক পরিবেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে হবে।

 

 

অনুষ্ঠানে ইউরোচ্যামের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ক্রান্তিকালে রয়েছে। এ অবস্থায় ইইউর সঙ্গে অবশ্যই আমাদের একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি থাকতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজারে যদি মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা না থাকে, তাহলে বিনিয়োগ বাড়ার তেমন কোনো সুযোগ থাকবে না। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভিয়েতনাম ও ভারত ইতিমধ্যেই এ চুক্তি করেছে।’

 

 

রপ্তানির নতুন বাজার সম্প্রসারণে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করার পরামর্শ দেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশে বাজার সম্প্রসারণ করা যাবে। কিন্তু এ জন্য আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা প্রয়োজন। কারণ, বর্তমানে এসব দেশে রপ্তানিতে শুল্ক অনেক বেশি। আমরা এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি।’

 

 

মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘জ্বালানি সমস্যা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ঋণের ১৩% থেকে ১৪% সুদ ব্যবসা শুরু করা বা চালিয়ে যাওয়ার জন্য খুব একটা সহায়ক পরিস্থিতি নয়। এ বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমর্থন চাই।’

 

 

ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) জিনিয়া হক বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নথিপত্র ও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর ও সময়সাপেক্ষ। সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যা ব্যবসার গতিকে কমিয়ে দেয়।

 

 

মারগুব কবির অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের হেড অব চেম্বারস মারগুব কবির বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হলো বিরোধ নিষ্পত্তি। এ ক্ষেত্রে আমাদের মূল সমস্যা হলো, ধীরগতির বিচারব্যবস্থা। যেমন আমার এক জাপানি মক্কেল ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করছেন। ২০১৮ সাল থেকে তাঁদের একটি চুক্তিসংক্রান্ত বিরোধ চলছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই মামলার সুরাহা হয়নি।’

 

 

স্বাগত বক্তব্যে এমসিসিআই মহাসচিব ফারুক আহমেদ বলেন, ‘দুই দশক ধরে বাংলাদেশে বার্ষিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে ১৮০ কোটি ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর এফডিআই অনেক গুণ বেড়েছে। কারণ, আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব সমস্যা যতক্ষণ না আমরা সমাধান করতে ও বাধাগুলো ডিঙাতে না পারছি, আমরা যতই আলোচনা করি না কেন, দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই বাড়বে না।’