বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি আনতে পারে
এম কবির হাসান [সূত্র : বর্ণিক বার্তা; ২৪ এপ্রিল, ২০২৬]

ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্ত বৈঠক (স্প্রিং কনফারেন্স) থেকে বাংলাদেশ অর্থ ছাড় পায়নি।
কিন্তু এ বৈঠক থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে ফিরতে পেরেছে। সেটি মূলত এক ধরনের সতর্কসংকেত। সংকেতটি হলো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা অর্জন এখন আর আলোচনার ভিত্তিতে নির্ভর করে না। বরং নীতি পর্যায়ে কঠোর বাস্তবায়ন, বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের ফল দেখানোর ওপর নির্ভর করে। এ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বড় প্রত্যাশা নিয়েই গিয়েছিল। স্থগিত হওয়া আইএমএফের ঋণ পুনরায় চালু করা, বিশ্বব্যাংকের বাজেট নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক পরিসর থেকে স্পষ্ট অর্থনৈতিক বার্তা নিয়েই দেশে ফিরতে চেয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থায়নের নিশ্চয়তা ছাড়াই তাদের ফিরতে হয়েছে। ফিরেছে সদিচ্ছা, সম্ভাবনা ও একগুচ্ছ কঠিন শর্ত নিয়ে। এ ব্যর্থতা পুরোপুরি বাংলাদেশের নয়। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন কঠিন পর্যায়ে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি থাকবে মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতি স্থিতিশীল নয়, আর মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলছে। আর বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি সরাসরি চাপ বাড়িয়েছে। এসব চাপ প্রভাব ফেলছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে, ভর্তুকি ব্যয়ে ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যে। সবদিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার জন্য এটি কোনো সহজ সময় নয়।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা ‘গঠনমূলক’ ছিল, এমনটি কূটনৈতিক ভাষা। বাস্তব অর্থে এর মানে সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি, কিন্তু অগ্রগতিও হয়নি। সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় প্রত্যাশিত ১৩০ কোটি ডলারের কিস্তি জুনের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। মোট ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচির একটি বড় অংশ এখনো ঝুলে আছে। এক্ষেত্রে আইএমএফের চারটি মূল উদ্বেগ বারবার সামনে এসেছে। এগুলো হলো কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতে দুর্বল শৃঙ্খলা, জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের অভাব ও বিনিময় হার সমন্বয়ে বিলম্ব। এ চারটি ইস্যু আসলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর সমস্যার প্রতিফলন।
বর্তমান সরকার একটি পূর্ববর্তী সরকারের নেয়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ফলে কিছু শর্ত পুনর্বিবেচনার দাবি রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিক। কিন্তু আইএমএফ একটি ভিন্ন যুক্তিতে চলে। তাদের কাছে সরকার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট: আইএমএফ শর্ত শিথিল করে না; বরং বিকল্প সংস্কার পরিকল্পনা দাবি করে। আইএমএফ একটি নতুন কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা অনেকের কাছে কঠোর শর্তের পূর্বাভাস হিসেবে মনে হতে পারে। কিন্তু এটিকে অন্যভাবে দেখা উচিত। একটি নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশকে তিনটি সুযোগ দিতে পারে। প্রথমত, এটি নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী শর্ত নির্ধারণ করার সুযোগ দিতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করাতে পারে এবং নীতিগত মালিকানা বাড়ানোর পথ উন্মোচন করতে পারে। অবশ্য ঝুঁকিও আছে। কারণ শর্ত আরো কঠোর হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ‘রিসেট অপরচুনিটি’ হিসেবেও কাজ করতে পারে। আইএমএফ যেখানে শর্ত আরোপে কঠোর, বিশ্বব্যাংক সেখানে তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও সহযোগিতামূলক। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বাংলাদেশের ৩১ দফা ইশতাহারের সঙ্গে প্রকল্প সমন্বয়ের আগ্রহ দেখিয়েছেন। এটি একটি বিরল সুযোগ, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে চায়। তবে এ সহযোগিতারও শর্ত আছে। এসব শর্তের মধ্যে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন আধুনিকায়ন রয়েছে। এছাড়া বন্ড ও সুকুক ব্যবহারের প্রস্তাব বাংলাদেশের অর্থায়ন কৌশলকে বৈচিত্র্যময় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কিছু অর্থনৈতিক সূচক ইতিবাচক। রিজার্ভ বেড়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, নীতিসূচক সুদহার স্থিতিশীল। কিন্তু আইএমএফের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী। এ একটি সূচকই পুরো আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের সংস্কার অনেক জরুরি। এ খাতে খেলাপি ঋণ সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব নয়, এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। কিন্তু আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাৎক্ষণিক সমাধান চায় না, তারা চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সমাধান নয়, বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপই আলোচনায় অগ্রগতি আনতে পারে। বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শর্ত মেনে চলার অবস্থানে ছিল। এ বৈঠকে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গেছে—সরকার এখন শর্ত নির্ধারণে অংশ নিতে চায়, শুধু অনুসরণ করতে নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। এটি সফল করতে হলে দরকার শক্তিশালী কারিগরি প্রস্তুতি, সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও তা সময়মতো বাস্তবায়ন।
এটা মনে রাখা দরকার, আইএমএফ কর্মসূচি সক্রিয় না থাকলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ আইএমএফ কেবল অর্থায়ন দেয় না—এটি একটি ক্রেডেবিলিটি সিগন্যাল। এটি দেখায় একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এ সংকেত না থাকলে অন্যান্য বহুপক্ষীয় উৎস থেকেও অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটা তাই আমাদের জন্য পরীক্ষার সময়। অর্থমন্ত্রী যে ‘সতর্ক আশাবাদ’ ব্যক্ত করেছেন—এটি রাজনৈতিকভাবে সঠিক বার্তা। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরো কঠিন। আগামী কয়েক সপ্তাহে বিশেষত আইএমএফ মিশনের মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি একটি নতুন অর্থনৈতিক পথ তৈরি করতে পারবে নাকি এটি আরেকটি বিলম্বের চক্রে আটকে যাবে। সবশেষে বলা যায়, এ বৈঠক বাংলাদেশকে অর্থ দেয়নি, কিন্তু একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। সেটি হলো আলোচনা নয়, বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় মুদ্রা।
এম কবির হাসান: অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার, ফাইন্যান্স বিভাগ, নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র এএওআইএফআই শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান