কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বৈশ্বিক নিরাপত্তা, শান্তি ও মানবিকতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা

কর্নেল মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম [কালের কণ্ঠ, ২১ এপ্রিল, ২০২৬]

বৈশ্বিক নিরাপত্তা, শান্তি ও মানবিকতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা

বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষার মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠানটি আজও মানবজাতির আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশ্বপরিমণ্ডলে অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক সংগঠন। পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও পরিণতি বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও শান্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রয়াসে আবির্ভাব ঘটে জাতিসংঘের।

 

জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গসংস্থা এবং অসংখ্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সংকটে বিশ্ব মানবজাতির পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক উদ্যোগ হলো শান্তি রক্ষা মিশন, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক গর্বিত অংশীদার হিসেবে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে ভূমিকা রেখে আসছে।

 

মূলত বৈশ্বিক নিরাপত্তা অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী সংঘাত, যুদ্ধ ও জাতিগত দাঙ্গা প্রশমনের প্রয়োজনে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের উৎপত্তি। সাধারণত জাতিসংঘ সনদের অধ্যায় ৬ ও ৭-এর আওতায় এই মিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

 

 

অধ্যায় ৬-এ উল্লেখ করা হয়েছে মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া, যেখানে জাতিসংঘ একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে। অন্যদিকে অধ্যায় ৭-এর অধীনে থাকছে প্রয়োজনীয় প্রয়োগযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিধান, যেখানে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুমতি দেওয়া হয়।

 

জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাহিনী নেই, বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রেরিত সামরিক, বেসামরিক ও আধাসামরিক সদস্যরাই এই মিশনের মূল চালিকাশক্তি। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠিত হয় এবং সেই থেকে বিভিন্ন সংকটময় এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে মিশন পাঠানো হচ্ছে।

 

 

এই শান্তিরক্ষীরা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠাই নয়, বরং অবকাঠামো পুনর্গঠন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সাংগঠনিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। এ পর্যন্ত জাতিসংঘ ৭১টি শান্তি রক্ষা মিশন পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে এখনো ১২টি মিশন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়, যা এই মিশনের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম প্রমাণ।

 

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সুসপষ্ট অবস্থান তুলে ধরে।

 

আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিমালার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেছে এবং জাতিসংঘের সব শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করেছে। স্বাধীনতার ১৭ বছরের মধ্যে ১৯৮৮ সালে ইউনিমগ (UNIMOG) বা ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ মিশনে ১৫ জন সেনা সদস্য প্রেরণের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। এই সূচনা থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তির এক বিশ্বদূত হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই থেকে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল পথচলা। বাংলাদেশের গর্বিত শান্তিরক্ষীরা আজ পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি স্থানে ৫৬টি শান্তি রক্ষা মিশনে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী। এ পর্যন্ত মোট এক লাখ ৬৬ হাজার ১৩৫ জন সেনা সদস্য এই মিশনগুলোতে অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে এক হাজার ৬৫০ জন নারী সদস্যও রয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিন হাজার ৬১৭ জন সদস্য, যাঁদের মধ্যে ২১৭ জন নারী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৬টি কন্টিনজেন্টে মোতায়েন রয়েছেন। শুধু সংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা, বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, উন্নত সরঞ্জাম, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, উন্নত মূল্যবোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মিশন এলাকার জনসাধারণ ও জাতিসংঘের আস্থা অর্জনে ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক শান্তি রক্ষা মিশনে ব্যবহারের জন্য পেরু সশস্ত্র বাহিনীকে দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী যান (Remotely Operated Vehicle) প্রদান এবং শান্তি রক্ষা মিশনের অধীনে বেসামরিক-সামরিক সহযোগিতার (Civil Military Co-ordination) অংশ হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত তোয়াদেরা (Touadera) কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরো উজ্জ্বল করেছে। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চার সদস্যের একটি প্রশিক্ষকদল গাম্বিয়া আর্মড ফোর্সেস ট্রেনিং স্কুলে ছয় সপ্তাহব্যাপী প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।

 

 

 প্রশিক্ষণে গাম্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর ২৫০ জন কর্মকর্তা ও সৈনিক অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিংয়ের (বিপসট) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল গাম্বিয়ার Quick Reaction Force (QRF)-কে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর কন্টিনজেন্টের সঙ্গে যৌথভাবে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা।

 

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুরুষ সদস্যের পাশাপাশি নারী শান্তিরক্ষী সদস্যরাও বর্তমানে আগের তুলনায় অধিক হারে শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁরা মেডিক্যাল, কমিউনিকেশন, মিলিটারি পুলিশ, লজিস্টিকস ও ইনফ্যান্ট্রি ইউনিটে কাজ করছেন। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ, নারী ও শিশুদের সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান, স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়ন, শান্তি আলোচনা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নারীদের সমপৃক্তকরণ, যৌন নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করছেন তাঁরা। ফলে মিশন এলাকার জনসাধারণের কাছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

 

 

এ ছাড়া জাতিসংঘ সদর দপ্তর, ফোর্স সদর দপ্তরসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে মিনারসো (Minurso), পশ্চিম সাহারায় ফোর্স কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের একজন মেজর জেনারেল পদবির কর্মকর্তা কর্তব্যরত, যা মিলিটারি কমান্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিযুক্তি। এ ছাড়া সব মিশনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদবির একজন করে সেক্টর কমান্ডার মোতায়েন আছেন, যা মিশনে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে অন্যতম। অধিকন্তু জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন পদবির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন, যাঁরা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে এখন পর্যন্ত ১৩৭ জন সেনা সদস্য শাহাদাতবরণ করেছেন এবং ২৫৬ জন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ও বীরত্ব গাথা জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 

 

জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন একটি বহুজাতিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন দেশের সেনা সদস্যদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়, ভাষাগত দক্ষতা অর্জন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সামরিক পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছেন। এতে শুধু সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বরং ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলিও বিকশিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মিশন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অর্জিত আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ শান্তিরক্ষীরা পেয়ে থাকেন এবং এর বেশির ভাগ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যার পরিমাণ গত ২৮ বছরে প্রায় ৩০ হাজার ৮৯৮.০৪ কোটি টাকা। শান্তি রক্ষা মিশন থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

 

 

আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল; যেমন—ডিআর কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, আবেই, মালি, আইভরি কোস্ট, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন ইত্যাদি এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এসব অঞ্চলের বেসামরিক নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদানসহ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বিমানবন্দর, স্কুল ও নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ, চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং শিক্ষা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে তাঁরা ভূমিকা রেখেছেন।

 

 

পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার মাধ্যমে সারা বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ১৯৭৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে মেডিক্যাল সহায়তা প্রদান করে। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের (বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ) পর সিরিয়ার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। যুদ্ধের ফলে হাজারো মানুষ আহত ও গৃহহীন হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা ছিল চরমভাবে বিপর্যস্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা মিশনে অংশগ্রহণ করে। প্রায় ২০০ সদস্যের একটি চিকিৎসাদল, যার মধ্যে ডাক্তার, নার্স ও সহকারী কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

 

 

২০১০ সালে হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। একইভাবে ২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে উদ্ধার সরঞ্জাম ও মানবিক সহায়তা সামগ্রী পাঠায়। এর আগে ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরীয় সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মেডিক্যাল ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নেয়। ২০১৫ সালে নেপালে ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দক্ষ দল উদ্ধার, চিকিৎসা ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিবিয়ায় ঘূর্ণিঝড় ড্যানিয়েলের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে লিবিয়ায় জরুরি মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়।

 

 

২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্প তুরস্ক ও সিরিয়ায় আঘাত হানে। এতে ৫২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। শুধু তুরস্কেই নিহত হয় ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ। তুরস্ক সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আদিয়ামান প্রদেশে উদ্ধারকার্য ও চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের জন্য ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বিমানবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল তুরস্কে গমন করে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ১০ সদস্যের সেনাবাহিনীর দুটি মেডিক্যাল টিম প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদিসহ জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য গমন করে। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে বৈরী পরিস্থিতিতেও নিরলসভাবে উদ্ধারকার্য পরিচালনা করে একজনকে জীবিত এবং ২২ জনের মরদেহ উদ্ধারসহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণ করে বিশেষ উদ্ধারকারী দল। তুরস্কে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকার্য পরিচালনাকারী বাংলাদেশ দলকে মানবিক সহায়তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান।

 

 

২০২৫ সালের ২৮ মার্চ মায়ানমারে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ৫৫ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী ও মেডিক্যাল দল প্রেরণ করা হয়। পাশাপাশি দেশটিতে তিন ধাপে পাঁচটি বিমান ও একটি নৌযানের মাধ্যমে সর্বমোট ১৫১.৫ টন মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ছিল খাদ্য, ওষুধ, তাঁবু, বিশুদ্ধ পানি, কম্বল, পোশাক ও বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী। মায়ানমার সরকার বাংলাদেশের উদ্ধারকারী দলকে দেশটির বিভিন্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী উদ্ধার করার দায়িত্ব প্রদান করে, যা তারা সফলভাবে সম্পন্ন করে। পাশাপাশি মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোর বিভিন্ন এলাকায় ৪৫টি ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ভবন, ক্লিনিক, শপিং মল ইত্যাদির ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। এ ছাড়া নেপিডো সেন্ট্রাল ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে যৌথ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ দল একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এবং ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে মায়ানমার কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে।

 

 

বৈশ্বিক নিরাপত্তা, শান্তি রক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবেলায় এক অনন্য নাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সামরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি প্রস্তুত করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে ক্ষেত্র প্রস্তুতে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে উড্ডীন লাল-সবুজের পতাকা শুধু একটি দেশের পরিচায়কই নয়, বরং তা মানবতা, শান্তি ও আস্থার প্রতীক। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস বিশ্ববাসীর হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। এই ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল ও অহংকারের ইতিহাস। নিরাপত্তা ও শান্তির বার্তা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক তাদের কর্ম, সাহসিকতা ও ভালোবাসার সুনাম।

 

 

লেখক : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা