চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ৯৮ হাজার কোটি টাকা
ফারজানা লাবনী [প্রকাশ: খবরের কাগজ, ২২ এপ্রিল ২০২৬]

চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা হয়েছে। এর আগে এক অর্থবছরের ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে এত ঘাটতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অর্থবছরের বাকি আছে মে আর জুন মাস। এই দুই মাসে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে। রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব পড়েছে সমগ্র অর্থনীতির ওপর।
তবে এনবিআর সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। নতুন সরকার আসার পর অনেকে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধকালিন পরিস্থিতির কারণে অনেকে পিছিয়ে গিয়েছেন। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর এর কারণে অনেকে রাজস্ব পরিশোধ করতে পারছেন না।
তবে এ বড় অঙ্কের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে বকেয়া আদায়ে জোর দিতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করে সঠিক হিসাবে আদায় এবং অনিষ্পত্তি হওয়া রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতেও নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশ পাওয়ার পর এসব কাজে আরও জোর বাড়িয়েছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার কারণ জানতে চেয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে এনবিআরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে চলমান ঋণ পাওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল রাজস্ব খাত সংস্কার। যথাযথ সংস্কার না হওয়ায় ঋণের কিস্তি এর আগে আটকে দেওয়া হয়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই দেশে রাজনৈতিক সংকট চলছে। এর কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমেছে। নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সরকারপ্রধান বৈঠকে বসেছেন। ব্যবসাবাণিজ্যে গতি এলে রাজস্ব আদায় বাড়ার কথা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানামুখী সংকটের মধ্যে আছে ব্যবসা–বাণিজ্য। আর এ কারণে রাজস্ব আদায় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজস্ব বিশেষজ্ঞ আবদুল মজিদ আরও বলেন, প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়। লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও রাজস্ব প্রশাসন সেভাবে সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভরতায় কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে এনবিআরের সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে এনবিআর কর্মকর্তারা জোর দিয়ে কাজ করছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে। আশা করি এর সুফল পাওয়া যাবে। রাজস্ব আদায় বাড়বে।
গত মঙ্গলবার এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যানুসারে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর–এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত ৯ মাসে এনবিআর সব মিলিয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এ সময়ে শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। গত ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। ৯ মাসে ঘাটতি হয় সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি খাতে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। গত জুলাই-মার্চ মাসে ভ্যাট বা মূসক আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এনবিআর রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোয় জোর দিয়েছে। কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে কাজ করছে।
গত অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এবারে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেল। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এ হিসাবে এনবিআরকে প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা আদায় করতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই এনবিআর ৭০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। এনবিআরের আদায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে গত জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আর বর্তমানে যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি চাপে আছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য গতি কমেছে। রপ্তানিও কমেছে। নতুন বিনিয়োগও তেমন আসছে না। তাই রাজস্ব আদায়ে গতি আনা কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারলে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে মনে করি।