ডব্লিউইএফ বার্ষিক সম্মেলন
যুক্তরাষ্ট্র আর ভর্তুকি দিয়ে পুরো বিশ্বকে চালাবে না ডোনাল্ড ট্রাম্প [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬]

সুন্দর দাভোসে আবার আসতে পেরে ভালো লাগছে। এত সম্মানিত ব্যবসায়ী নেতা, এত বন্ধু, কয়েকজন শত্রু, আর সব বিশিষ্ট অতিথির সামনে কথা বলতে পারাটা সত্যিই বিশেষ। এক ধরনের ‘হু ইজ হু’ বলা যায়। আমি এ বছরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে এসেছি আমেরিকা থেকে অসাধারণ খবর নিয়ে। গতকাল ছিল আমার শপথ নেয়ার এক বছর পূর্তি। আর আজ আমাদের অর্থনীতি রীতিমতো চাঙ্গা। প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন ঘটেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, বিনিয়োগ আকাশছোঁয়া, আয় বাড়ছে, মূল্যস্ফীতিও পরাজিত হয়েছে। যে সীমান্ত আগে খোলা ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেটি এখন বন্ধ, প্রায় অভেদ্য। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত ও সবচেয়ে নাটকীয়।
আমি ইউরোপকে ভালোবাসি, ইউরোপ ভালো করুক চাই, কিন্তু তাদের গন্তব্য সঠিক দিকে যাচ্ছে না। গত কয়েক দশকে ওয়াশিংটন আর ইউরোপীয় শহরগুলো একটা কনভেনশনাল উইসডমে দাঁড়িয়েছিল—আধুনিক পশ্চিমা অর্থনীতি বাড়াতে হলে সরকারি খরচ অনবরত বাড়াতে হবে, সীমাহীন গণ-অভিবাসন চলতে দিতে হবে এবং অবিরাম বিদেশী আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। তথাকথিত ‘ডার্টি জব’ আর ভারী শিল্প বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে। আর দূর-দূরান্তের ভিন্ন জনগোষ্ঠী এনে দেশকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এ ভুল পথটাই ‘স্লিপি জো বাইডেন’সহ অনেক পশ্চিমা সরকার অনুসরণ করেছে। যার ফলাফল রেকর্ড বাজেট ঘাটতি, বাণিজ্য ঘাটতি, সার্বভৌম ঘাটতি; আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-অভিবাসনের ঢেউ। তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা বলেছিল আমার পরিকল্পনা বিশ্বমন্দা ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। এক বছরে এমন পরিবর্তন এসেছে, যা আমেরিকা শত বছরের বেশি সময় দেখেনি। শুল্কনীতিতে আমরা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়েছি। যেটা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়; বছরে ১ ট্রিলিয়নেরও বেশি ক্ষতি হচ্ছিল।
আমরা এমন সব ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি করেছি, যা মোট মার্কিন বাণিজ্যের ৪০ শতাংশকে কাভার করে। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া অনেকেই বড় বড় চুক্তিতে এসেছে। এসব চুক্তি প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, বাজার চাঙ্গা করে—শুধু আমেরিকায় নয়, যারা চুক্তি করতে এসেছে তাদের দেশেও। কারণ আপনারা দেখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওপরে উঠলে আপনারাও ওপরে ওঠেন।
আমি অনেক নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছি। আগে আমি ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম, কিন্তু নিরাপত্তায় অগ্রগতি অবিশ্বাস্য—আমরা নিউক্লিয়ারে জোর দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা এআইয়ে বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছি, চীনের চেয়েও এগিয়ে। আমি চাই ইউরোপ ভালো করুক। আমি চাই যুক্তরাজ্য ভালো করুক। অথচ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানিসম্পদের ওপর বসে থেকেও তারা তা ব্যবহার করছে না। আমরা শক্তিশালী মিত্র চাই, দুর্বল মিত্র নয়। আমরা চাই ইউরোপ শক্তিশালী হোক। শেষ পর্যন্ত এগুলো সবই জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
বর্তমান সময়ে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যে পরিস্থিতি চলছে, তার চেয়ে স্পষ্ট করে আর কোনো ইস্যু এ বাস্তবতা তুলে ধরে না। আপনারা কি চান, আমি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে দু-একটি কথা বলি? আমি আসলে এ বক্তৃতায় বিষয়টি বাদ দেয়ার কথাই ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে মনে হলো, যদি এটা বাদ দিই খুব নেতিবাচকভাবে আমার বক্তব্য মূল্যায়ন করা হবে।
গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ও ডেনমার্কের জনগণের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু ন্যাটোর প্রতিটি মিত্রেরই নিজের ভূখণ্ড রক্ষা করার সক্ষমতা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো দেশ বা জোট গ্রিনল্যান্ডকে নিরাপদ রাখার অবস্থানে নেই। মানুষ যতটা বোঝে যুক্তরাষ্ট্র তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। আমার মনে হয়, দুই সপ্তাহ আগে ভেনিজুয়েলার মানুষ সেটা বুঝতে পেরেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মাত্র ৬ ঘণ্টার লড়াইয়ে ডেনমার্ক জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। নিজেকে তো বটেই, গ্রিনল্যান্ডকেও রক্ষা করতে পুরোপুরি অক্ষম ছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছিল নিজেদের বাহিনী পাঠিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ড ধরে রাখতে। আর আমরা সেটাই করেছি—বিপুল খরচ ও ত্যাগের বিনিময়ে। তারা সেখানে পৌঁছানোর কোনো সুযোগই পায়নি, যদিও চেষ্টা করেছিল। আমরা ডেনমার্কের জন্য গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলাম, ডেনমার্কের জন্য লড়েছি। এটা এক বিশাল, সুন্দর বরফের টুকরো। একে ভূমি বলা কঠিন—এটা আসলে এক বিশাল বরফখণ্ড। এরপর যুদ্ধ শেষ হলো, যুদ্ধটি আমরা জিতেছিলাম। নয়তো আমাদের ছাড়া আজ আপনারা সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলতেন—হয়তো একটু জাপানিও।
যুদ্ধের পর আমরা গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দিয়েছি। কতটা বোকামি ছিল সেটা! তবু আমরা তা করেছি, আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এখন তারা কতটা অকৃতজ্ঞ! আজ আমাদের দেশ এবং গোটা বিশ্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় ঝুঁকির মুখে—ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র আর এমন সব যুদ্ধাস্ত্রের কারণে, যেগুলোর কথা আমি বলতেও পারি না।
গ্রিনল্যান্ড একটি বিশাল ভূখণ্ড, প্রায় পুরোপুরি জনমানবহীন ও অনুন্নত। এটি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মাঝামাঝি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে আছে, কার্যত অরক্ষিত অবস্থায়। যখন আমরা এটি ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, তখন এর গুরুত্ব আজকের মতো ছিল না। তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। অনেকে খনিজের কথা বলেন, বিশ্বজুড়েই তো এমন জায়গা আছে। ‘রেয়ার আর্থ’ বলে আসলে কিছু নেই। আছে ‘রেয়ার প্রসেসিং’। পৃথিবীতে রেয়ার আর্থের অভাব নেই। সেটা আমাদের প্রয়োজনও নয়। আমাদের প্রয়োজন কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কারণে। এ বিশাল অরক্ষিত দ্বীপটি বাস্তবে উত্তর আমেরিকারই অংশ। তাই এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ। বাস্তবে শত শত বছর ধরেই আমাদের নীতি হলো বাইরের কোনো হুমকিকে আমাদের গোলার্ধে ঢুকতে না দেয়া। আমরা সেটা অত্যন্ত সফলভাবেই করে এসেছি। আজ আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
এ কারণেই প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা করে আসছেন। প্রায় দুইশ বছর ধরে এ চেষ্টা চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই এটা রেখে দেয়া উচিত ছিল, কিন্তু তখন অন্য একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সেটা ঠিক আছে, মানুষ ভিন্নভাবে ভাবে। তবে আজ এটি যে মাত্রায় প্রয়োজনীয়, তখন ততটা ছিল না।
তবে ২০১৯ সালে ডেনমার্ক ঘোষণা দিয়েছিল, তারা গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করবে। কিন্তু আপনারা জানেন, তারা সেই অর্থের ১ শতাংশেরও কম খরচ করেছে। সেখানে ডেনমার্কের কার্যকর উপস্থিতির কোনো চিহ্নও নেই। এ বিশাল ভূখণ্ড, এ বিশাল বরফখণ্ড রক্ষা করা, উন্নয়ন করা এবং এটিকে ইউরোপের জন্যও উপকারী ও নিরাপদ করে তোলার সক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই আছে। একই সঙ্গে এটি আমাদের নিজেদের জন্যও ভালো হবে। এ কারণেই আমি অবিলম্বে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসতে চাই। ইতিহাসে আমরা এভাবেই বহু ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করেছি। ইউরোপের অনেক দেশও তাই করেছে। এতে কোনো সমস্যা নেই।
এতে ন্যাটোর জন্য কোনো হুমকি তৈরি হবে না। বরং এটি পুরো ন্যাটো জোটের নিরাপত্তাকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করবে। সত্যি কথা বলতে, ন্যাটোর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র খুবই অন্যায় আচরণের শিকার হয়—আমি এটা আপনাদের বলতে চাই। ভাবলে দেখবেন, কেউই এটা অস্বীকার করতে পারবে না। আমরা এত কিছু দিই, অথচ বিনিময়ে পাই খুব কম। আমি বহু বছর ধরেই ন্যাটোর সমালোচক ছিলাম। তবু বাস্তবতা হলো ন্যাটোকে শক্তিশালী করতে আমি যতটা করেছি, আমার আগে কোনো প্রেসিডেন্টই তা করেননি, কেউই না।
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধই তার একটি উদাহরণ। আমরা হাজার হাজার মাইল দূরে—মাঝখানে বিশাল এক মহাসাগর। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা কখনই শুরু হওয়া উচিত ছিল না। আর যদি ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কারচুপি না হতো, তাহলে এ যুদ্ধ শুরুই হতো না। নির্বাচনটি কারচুপি করা হয়েছিল—এটা ছিল একটি রিগড ইলেকশন। এখন সবাই সেটা জানে।
আমি দায়িত্ব নেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত খোলা ছিল, মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া ছিল, সবকিছুই খারাপ অবস্থায় ছিল। একই সঙ্গে আমি ইউক্রেন ও রাশিয়ার একটি ভয়াবহ জটিল পরিস্থিতিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। গত এক বছরে আমি এ যুদ্ধ নিয়ে কাজ করছি। এ সময়ের মধ্যেই আমি আরো আটটি যুদ্ধ মিটিয়ে ফেলেছি। ভারত, পাকিস্তানসহ আরো কিছু সংঘাত। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান—সেই যুদ্ধও। ভ্লাদিমির পুতিন আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, তুমি ওটা মিটিয়ে ফেলেছ।’
এসব কাজের বিনিময়ে, এ বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী পাচ্ছে—মৃত্যু, ধ্বংস আর এমন মানুষের হাতে বিপুল অংকের টাকা তুলে দেয়া ছাড়া, যারা আমাদের করা কাজের কোনো মূল্যই বোঝে না? তারা আমাদের কাজের কদর করে না। আমি ন্যাটোর কথাই বলছি, ইউরোপের কথাই বলছি। ইউক্রেন নিয়ে কাজ করা তাদের দায়িত্ব, আমাদের নয়। যুক্তরাষ্ট্র তো অনেক দূরে। আমাদের আর ইউরোপের মাঝখানে রয়েছে এক বিশাল, সুন্দর মহাসাগর। এ সংঘাতের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই।
আমি আসার আগে ন্যাটোর দেশগুলোর জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় করার কথা ছিল, কিন্তু তারা সেটাও দিচ্ছিল না। বেশির ভাগ দেশই কার্যত কিছুই দিচ্ছিল না। প্রায় পুরো ন্যাটোর খরচই যুক্তরাষ্ট্র বহন করছিল। আমি সেটা বন্ধ করেছি। আমি বলেছি, ‘এটা ন্যায্য নয়।’ কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি ন্যাটোকে ৫ শতাংশ দিতে বাধ্য করেছি। আর এখন তারা দিচ্ছে।
আমরা কখনই কিছু চাইনি আর কখনই কিছু পাইনি। সত্যি বলতে গেলে, আমি যদি অতিরিক্ত শক্তি ও বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে সম্ভবত এবারো কিছুই পাব না। আর সেটা করলে আমরা হব অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু আমি সেটা করব না—ঠিক আছে? আমি বলপ্রয়োগ চাই না। যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটিই জিনিস চাইছে, গ্রিনল্যান্ড নামে একটি জায়গা।
প্রশ্ন হলো, ন্যাটো থেকে আমরা কী পেয়েছি? ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত থেকে রক্ষা করা, আর এখন রাশিয়ার হাত থেকে রক্ষা করা—এর বাইরে আমরা কিছুই পাইনি। বহু বছর ধরে আমরা তাদের সহায়তা করেছি, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই পাইনি। শুধু ন্যাটোর খরচ আমরা বহন করেছি দীর্ঘদিন ধরে। আমরা এখন যা চাইছি, তা শুধু গ্রিনল্যান্ড—সম্পূর্ণ অধিকার ও মালিকানাসহ। কারণ মালিকানা ছাড়া এটাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে সক্রিয় ও বিপজ্জনক সম্ভাব্য শত্রুদের দূরে রাখতে ডেনমার্কের কাছে আমরা শুধু এটুকুই চাই। এ ভূখণ্ডে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোল্ডেন ডোম নির্মাণ করব। আমরা এমন একটি গোল্ডেন ডোম বানাতে যাচ্ছি, যার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যই হবে কানাডাকেও সুরক্ষা দেয়া। কানাডা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই বিনামূল্যে পায়। তাদেরও কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, কিন্তু তারা তা নয়। গতকাল আমি আপনাদের (কানাডার) প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেখেছি—তাকে খুব একটা কৃতজ্ঞ মনে হয়নি। কানাডার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই টিকে আছে। মার্ক, পরেরবার বক্তব্য দেয়ার সময় এটা মনে রাখবেন।
ইসরায়েলের জন্য আমরা যা করেছি, তা ছিল অসাধারণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং বিশ্বের বাকি অংশের জন্য আমরা যা করতে যাচ্ছি, তার তুলনায় সেটাও কিছু নয়। আমরা এমন একটি ডোম বানাতে যাচ্ছি, যার তুলনা নেই। আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে কথা বলছি, তিনি একটা সমঝোতায় যেতে চান। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গেও কথা বলছি এবং আমার মনে হয় তিনিও একটা সমঝোতা চান। এ যুদ্ধ থামতেই হবে। কারণ খুব বেশি মানুষ মরছে, অকারণে মরছে। খুব বেশি প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এটিই একমাত্র কারণ, যার জন্য আমি এতে আগ্রহী।
কয়েক দিন আগ পর্যন্ত আইসল্যান্ডের (প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ড) লোকেরা আমাকে ভালোবাসত। আগেরবার তারা আমাকে ‘ড্যাডি’ বলেছিল। অথচ এখন আমি এক লাফে ‘ভয়ংকর মানুষ’ হয়ে গেলাম। কিন্তু এখন আমি যা চাইছি, তা হলো এক টুকরো বরফ। যেটি বিশ্ব শান্তি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বহু দশক ধরে আমরা তাদের জন্য যা যা করেছি, তার তুলনায় এটা খুবই ছোট দাবি।
কিন্তু ন্যাটোর সঙ্গে সমস্যাটা হলো আমরা তাদের জন্য শতভাগ পাশে থাকব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা কি আমাদের জন্য একইভাবে পাশে থাকবে? আমি নিশ্চিত নই। এত অর্থ ব্যয় করার পর, এত রক্ত, ঘাম আর অশ্রু দেয়ার পরও আমি নিশ্চিত নই তারা আমাদের পাশে থাকবে। গতকাল আমাদের শেয়ারবাজার প্রথমবারের মতো পতন দেখেছে আর সেটা হয়েছে আইসল্যান্ডের (গ্রিনল্যান্ড) কারণেই। এখন বিশ্ব সুরক্ষার স্বার্থে আমরা একটি বরফখণ্ড চাই, যদিও তারা সেটা দিতে রাজি নয়। আমরা চাইলে ওই ভূখণ্ডটা রেখে দিতে পারতাম, কিন্তু রাখিনি। এখন তাদের সামনে একটি পছন্দ আছে। তারা ‘হ্যাঁ’ বলতে পারে, তাহলে আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকব। অথবা তারা ‘না’ বলতে পারে, সেক্ষেত্রে আমরা তা মনে রাখব।
লন্ডনে যে ওষুধের দাম ১০ ডলার, নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসে সেই একই ওষুধের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ১৩০ ডলারে। এর কারণ ছিল খুব সরল—যুক্তরাষ্ট্র কার্যত বিশ্বের প্রতিটি দেশকে ভর্তুকি দিচ্ছিল। কারণ একের পর এক প্রেসিডেন্ট তাদের এ সুযোগ নিয়ে যেতে দিয়েছেন। বিষয়টা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। ন্যায্যভাবে বললে—হ্যাঁ, এর মানে দাম দ্বিগুণ বা তিন গুণ হতে পারে। এখন আমরা দিচ্ছি ১৩০ ডলার, আর তারা দিচ্ছে ১০ ডলার। এটা হতে পারে না। আমরা আর পুরো বিশ্বকে ভর্তুকি দিয়ে চালাব না।
আমি সরকারি-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছি—সুদের হার নামাতে সর্বোচ্চ ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মর্টগেজ বন্ড কিনতে। শিগগিরই আমি নতুন ফেড চেয়ারম্যানের ঘোষণা দেব। আমার মনে হয় তিনি খুব ভালো কাজ করবেন। এখন আমাদের একজন ভয়ংকর চেয়ারম্যান আছে—জেরোম ‘টু লেট’ পাওয়েল। তিনি সবসময়ই দেরি করেন। সুদের হার কমানোর বেলায় দেরি—শুধু নির্বাচনের আগে অন্য পক্ষের সুবিধা হয়, তখন একদম ঠিকঠাক। তাই আমরা এমন একজন আনব যিনি দারুণ আর আশা করি তিনি সঠিক কাজ করবেন।
আমাদের উচিত বর্তমানের চেয়ে অনেক কম সুদে ঋণ নেয়া। আমাদের উচিত বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে কম সুদ দেয়া। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অনেক দেশই টিকে থাকে না। সুইজারল্যান্ডের একটা গল্প বলি, আমরা তো এখন সুইজারল্যান্ডেই। তারা তাদের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে শূন্য শুল্কে বিক্রি করত। ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। আমি বললাম, ‘তাহলে ৩০ শতাংশ শুল্ক বসাও—কিছুটা অন্তত ফেরত আসুক।’ কিন্তু ৩০ শতাংশ দিতেই ওদের মধ্যে হাহাকার, ফোন, দৌড়ঝাঁপ। এরপর প্রধানমন্ত্রী ফোন করলেন, প্রেসিডেন্ট নাকি প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত নই, একজন নারী। তিনি বারবার বললেন, ‘না, না, না—৩০ শতাংশ করা যাবে না। আমরা ছোট দেশ।’ আমি বললাম, ‘তোমরা ছোট হতে পার, কিন্তু ঘাটতি বিশাল—অনেক বড় দেশের চেয়েও বড়।’ তিনি বারবার একই কথা বললেন, ‘আমরা ছোট দেশ।’ তার কথার ভঙ্গি আমাকে বিরক্ত করল। আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ ম্যাডাম।’ তারপর আমি শুল্ক ৩৯ শতাংশ করে দিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রই অনেকটা পুরো বিশ্বকে ভাসিয়ে রাখছে। আমি এখানে বসা দেশগুলোর মধ্য থেকেই ছয়-সাতটা উদাহরণ দিতে পারি। আমি সবাইকে চিনি। কেউ কেউ এখন চোখ নামিয়ে রাখছে—চোখে চোখ রাখতে চাইছে না। কারণ সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে কাজে লাগিয়েছে।
পশ্চিমের সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, উপসংহার—এসব শুধু ট্যাক্স কোড থেকে আসেনি। এসেছে আমাদের বিশেষ সংস্কৃতি থেকে। এটাই সেই মূল্যবান উত্তরাধিকার, যা আমেরিকা ও ইউরোপ একসঙ্গে ভাগ করে। আমাদের এটা শক্ত রাখতে হবে। আমাদের আগের চেয়েও শক্তিশালী, সফল, সমৃদ্ধ হতে হবে। আমাদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে আর সেই চেতনাকে আবার খুঁজে পেতে হবে, যে চেতনা পশ্চিমকে অন্ধকার যুগের গভীরতা থেকে তুলে মানব অর্জনের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।
আমরা এক অবিশ্বাস্যভাবে বদলে যাওয়া সময়ে বাস করছি। সময়টা সত্যিই অবিশ্বাস্য। কিন্তু আমরা যে সময়ে আছি, সেই সময়কে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের হাতে এমন সব প্রযুক্তি আছে, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় কল্পনাই করতে পারতেন না। আজ আমরা যা দেখছি, তা তারা স্বপ্নেও ভাবেননি। আর এগুলো যে গতিতে তৈরি হচ্ছে, সেটাও অবিশ্বাস্য। দুই বছর আগে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দটাই কেউ শোনেনি, আর এখন সবাই সেটা নিয়েই কথা বলছে। এর কিছু ব্যবহার হতে পারে দারুণ ভালো; আবার কিছু ব্যবহার হতে পারে বিপজ্জনক—সেজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু এর কারণেই নানা কিছু ঘটছে আর আমরা এতটা এগিয়ে আছি, আমরা খুব ভালো করছি।
কিন্তু মানব ইতিহাসে কখনো না দেখা এত বড়, এত মহৎ সুযোগ ঠিক আমাদের সামনেই। আর এ কক্ষে যারা আছেন—তারাই সেই অগ্রদূত। আপনারা অনেকেই সত্যিকারের অগ্রদূত। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ পৃথিবীর যেকোনো জায়গার সেরা নেতা। আপনারাই বিশ্বের সেরা মস্তিষ্ক। ভবিষ্যৎ সীমাহীন। আর তার বড় একটা অংশই আপনাদের কারণে। তাই আমাদের আপনাদের সুরক্ষা দিতে হবে, আপনাদের আগলে রাখতে হবে।
আমি সবসময় বলি আমাদের মেধাবী মানুষদের আগলে রাখতে হবে, কারণ তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই আত্মবিশ্বাস, সাহস আর অধ্যবসায় নিয়ে চলুন আমরা আমাদের মানুষকে এগিয়ে নিই, আমাদের অর্থনীতিকে বড় করি, আমাদের যৌথ নিয়তিকে রক্ষা করি, আর আমাদের নাগরিকদের জন্য এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি, যা হবে আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আরো রোমাঞ্চকর, আরো অনুপ্রেরণাদায়ী এবং পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি এমন মহান। আজ আমরা এমন অবস্থানে আছি, যেখানে এমন কিছু করার সুযোগ আছে, যা কেউ কখনো কল্পনাও করেনি।
আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি—আপনারা এমন কিছু করতে পারেন, যা অন্য কেউ ভাবতেও পারে না। তাই আপনাদের অসাধারণ সাফল্যের জন্য আবারো অভিনন্দন। যুক্তরাষ্ট্র ফিরে এসেছে আরো বড় এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে। আবার দেখা হবে। আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট
[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বক্তব্যের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত রূপ]