কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগমুখী না করলে বিদেশিরা আসবে না

মাসুদ রুমী [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৩ মে ২০২৬]

দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগমুখী না করলে বিদেশিরা আসবে না

বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি আমদানিতে বিলম্ব, শিল্পের সরবরাহব্যবস্থার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই অস্থিরতাকে আরো তীব্র করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়েছে, শিল্প উৎপাদন কমিয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই আরো সতর্ক হয়ে পড়েছেন।

 

নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করছেন, যার প্রভাব পড়ছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে।

 

ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আংকটাড) সাম্প্রতিক ‘ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’-এ এই উদ্বেগ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই মজুদ ছিল ১৮.২৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের ছিল ২৪৯.১৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৩ গুণ বেশি), ইন্দোনেশিয়ার ৩০৫.৬৭ বিলিয়ন (প্রায় ১৭ গুণ) এবং কম্বোডিয়ার ৫২.৬৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় তিন গুণ)।

 
 

 

এই নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আংকটাড সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি, একীভূত আইনকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ডিজিটাইজেশনের সুপারিশ করেছে।

 

 

এমন সংকটকালে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো দেশি বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্টভাবে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের সব বাধা তিন মাসের মধ্যে দূর করা হবে।

 
 

 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সোনা ব্যবসা খাতের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। সঠিক নীতি ও আধুনিক সুবিধার মাধ্যমে এই খাতকে সাদা অর্থনীতির আওতায় এনে বছরে ১২ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন। বর্তমানে এ খাতের বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক। সরকার এটিকে নিয়মতান্ত্রিক করতে কাজ করবে। জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং দুর্বলতা ও লজিস্টিক সমস্যা বেসরকারি খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বন্ধ কারখানা চালু করতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। যদি এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগমুখী হবেন, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আয় বাড়বে। দেশি বিনিয়োগকারীরা মাঠে না নামলে বিদেশি বিনিয়োগও আসে না।

 

প্রতিযোগী দেশগুলো ইরান যুদ্ধের সংকট কাটাতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা দেখলে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। ভিয়েতনাম জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় ই-১০ বায়োফুয়েলের রোল আউট ত্বরান্বিত করেছে, অফশোর উইন্ড ও হাইড্রোপাওয়ারসহ ৮০টির বেশি মূল্যবান এনার্জি প্রকল্প অনুমোদন করেছে এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) উৎপাদন ও চার্জিং অবকাঠামোতে উৎসাহ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ভিয়েতনাম ১৫.২ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আকর্ষণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২.৯ শতাংশ বেশি। তারা ২০২৫ ইনভেস্টমেন্ট ল চালু করে হাই-টেক ও স্ট্র্যাটেজিক প্রকল্পের জন্য সহজ লাইসেন্সিং, ডিকেন্ট্রালাইজেশন এবং ইনভেস্টমেন্ট সাপোর্ট ফান্ডের মাধ্যমে ট্রেনিং, আরঅ্যান্ডডি ও ফিক্সড অ্যাসেটে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে। গ্লোবাল মিনিমাম ট্যাক্সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টার্গেটেড ইনসেনটিভ প্রদান করছে।

 

 

ভারত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মাধ্যমে দেশি উৎপাদনকে উৎসাহিত করে আমদানিনির্ভরতা কমাচ্ছে। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ফাস্টার অ্যাপ্রুভাল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এবং এফটিএর মাধ্যমে এক্সপোর্ট-ওরিয়েন্টেড ম্যানুফ্যাকচারিং আকর্ষণ করছে। ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল ভিত্তিক বায়োডিজেলের মিশ্রণ বি৫০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে এবং জ্বালানি সাবসিডি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফিসক্যাল স্পেস রক্ষা করছে। এসব দেশ সংকটকে সুযোগে পরিণত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হাই-টেক এবং সাপ্লাই চেইন ডাইভার্সিফিকেশনে জোর দিচ্ছে।

 

 

আসন্ন বাজেটে বিনিয়োগ আকর্ষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমত, দেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা দরকার—কম সুদে ঋণ, ট্যাক্স ছাড় এবং জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা করার খরচ কমাতে পোর্ট, কাস্টমস ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ডিজিটাইজ করা এবং তিন মাসের মধ্যে বাধা অপসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। তৃতীয়ত, সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে (সোনা ও জুয়েলারি, আইসিটি, ফার্মা, লেদার ও অ্যাগ্রোপ্রসেসিং) পোশাক খাতের মতো একই সুবিধা ও ইনসেনটিভ দেওয়া। চতুর্থত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এনার্জি এফিসিয়েন্সি প্রকল্পে বড় বরাদ্দ রাখা, যাতে জ্বালানিসংকট দীর্ঘ মেয়াদে মোকাবেলা করা যায়। পঞ্চমত, একীভূত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন করে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাসহ বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পথে যেসব বাধা রয়েছে, তা দূর করা দরকার।

 

 

এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি। নন-পারফরমিং লোন কমিয়ে ক্রেডিট ফ্লো দেশি উদ্যোক্তাদের দিকে নির্দেশিত করতে হবে। এসএমই খাতের জন্য বিশেষ ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানবসম্পদকে প্রতিযোগিতামূলক করা দরকার। ইউএনসিটিএডের সুপারিশ অনুসারে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করে বিডা, বিএসসিআইসি ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে ওভারল্যাপ কমাতে হবে।

 

 

এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা উচিত। পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমেই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব। ভিয়েতনাম ও ভারত যেভাবে সংকটকে সুযোগে পরিণত করছে, বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে।

 

 

আসন্ন বাজেট যদি দেশি বেসরকারি খাতকে প্রাণ ফিরিয়ে দেয়, বাধা দূর করে এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে উজ্জীবিত করে, তাহলে এফডিআই প্রবাহ বাড়বে, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যথায় শুধু বড় অঙ্কের বাজেট ঋণের বোঝা বয়ে আনবে।

 

 

দেশি উদ্যোক্তারা যদি বিনিয়োগে সক্রিয় না হন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত আসেন না—এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের একটি সুপরিচিত বাস্তবতা। দেশি উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজার, নিয়ম-কানুন, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিদেশিদের কাছে এক ধরনের ‘আস্থার সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করে। যখন দেশি ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন, কারখানা চালু রাখেন এবং সম্প্রসারণ করেন, তখন বিদেশিরা বুঝতে পারেন যে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতি সহায়ক এবং লাভজনক সম্ভাবনা রয়েছে।

 

অন্যদিকে দেশি উদ্যোক্তাদের অনীহা বা স্থবিরতা বিদেশিদের মনে সন্দেহ জাগায়; যেমন—হয়তো নিয়ম-কানুনের জটিলতা, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সমস্যা বা রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে, যা তাঁরা নিজেরাই মোকাবেলা করতে চান না। ফলে বিদেশিরা ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি গ্রহণ করেন। ভিয়েতনাম, ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে দেখা যায়, দেশি বিনিয়োগের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ সমান্তরালভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও তাই দেশি উদ্যোক্তাদের মাঠে নামানো ছাড়া এফডিআইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রবাহ আশা করা কঠিন। সরকারের উচিত দেশি ব্যবসায়ীদের বাধা দূর করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া, যাতে তাঁরা নেতৃত্ব দিয়ে বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে পারেন।

 

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, পুরনো পথ ত্যাগ করে উদ্ভাবনী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া। দেশি উদ্যোক্তারা যদি আত্মবিশ্বাস ফিরে পান, বিদেশিরা স্বাভাবিকভাবেই আসবেন। এটিই হবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সংকট থেকে উত্তরণে সতর্ক বাজেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

চিফ বিজনেস এডিটর, কালের কণ্ঠ