ডিজিটাল বিভাজন বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈষম্য
মো. জসিম উদ্দিন [সূত্র : সময়ের আলো, ৯ মে ২০২৬]

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে এক নতুন ও জটিল রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একে আমরা বলছি ডিজিটাল বিভাজন। গত এক দশকে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে থেকে বিশ্বের নজর কেড়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনেও এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল কি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে? সাম্প্রতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির নাগাল পাওয়ার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সমাজে এক নতুন ধরনের শ্রেণিবিভাগ তৈরি হচ্ছে। একদিকে এক দল মানুষ হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমৃদ্ধি অর্জন করছে, অন্যদিকে বিশাল এক জনগোষ্ঠী কেবল সংযোগের অভাবে বা কারিগরি দক্ষতার অভাবে উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই বিভাজনই মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এখন প্রধান অন্তরায়।
পরিসংখ্যানে ডিজিটাল বাস্তবতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘আইসিটি অ্যাকসেস অ্যান্ড ইউজ সার্ভে’ এবং বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৯ কোটি ছাড়িয়েছে এবং ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বিশাল সাফল্য মনে হলেও গভীরে তাকালে বৈষম্যের চিত্রটি ভিন্ন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের হার এখনও ৫০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনও সরাসরি ডিজিটাল সুবিধার বাইরে। স্মার্ট ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই বিভাজন আরও স্পষ্ট- শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করলেও গ্রামাঞ্চলে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রযুক্তির এই অসম বণ্টনই মূলত আধুনিক বাংলাদেশের নতুন বৈষম্য-কাঠামো তৈরি করছে, যা কেবল তথ্যের অভাব নয়, বরং উপার্জনের সুযোগেরও অভাব তৈরি করছে।
ডিজিটাল যুগে নতুন বৈষম্য
ডিজিটাল বিভাজনকে কেবল ইন্টারনেট আছে কী নেই- এই সরল সমীকরণে দেখলে ভুল হবে। আধুনিক অর্থনীতিতে এটি তিনটি স্তরে কাজ করছে। প্রথমত ‘অ্যাকসেস ডিভাইড’ বা সংযোগের সুযোগ, যেখানে গ্রাম ও শহরের অবকাঠামোগত পার্থক্য বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত ‘ইউসেজ ডিভাইড’ বা ব্যবহারের পার্থক্য, যেখানে একজনের হাতে দামি ডিভাইস থাকলেও তিনি সেটি কেবল বিনোদনের জন্য ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে অন্যজন সেটি দিয়ে আয় করছেন। তৃতীয়ত ‘অ্যালগরিদমিক ডিভাইড’, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করতে জানা গোষ্ঠীটি অন্যদের তুলনায় কয়েকগুণ দ্রুত সম্পদ আহরণ করছে। এই তিন স্তরের বিভাজন সমাজে এমন এক অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে, যেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য সামনের সারিতে আসা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে ডিজিটাল বাধা
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের এমএফএস বা মোবাইল ব্যাংকিং খাত বিশ্বে একটি রোল মডেল। প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এই মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল আর্থিক লেনদেনে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ কতটা গুণগত? দেখা যাচ্ছে, স্মার্ট ফোন এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেটের অভাবে অনেক নিম্নবিত্ত মানুষ এখনও এজেন্টের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে তারা ডিজিটাল অর্থনীতির সরাসরি সুবিধাভোগী হওয়ার বদলে এক ধরনের ডিজিটাল ট্যাক্স বা বাড়তি খরচ প্রদান করছে। যারা অ্যাপ ব্যবহার করতে পারছে, তারা ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট পাচ্ছে, আর যারা বাটন ফোন ব্যবহার করছে, তারা কেবল খরচই দিচ্ছে। এটিই ডিজিটাল বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন অর্থনৈতিক বৈষম্য।
ডিজিটাল বিভাজন ও শিক্ষা বৈষম্য
করোনা মহামারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে শিক্ষার ডিজিটাল বিভাজন কতটা ভয়াবহ হতে পারে। অনলাইন ক্লাসের সুযোগ কেবল শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের নাগালে ছিল। গ্রামের প্রান্তিক শিক্ষার্থী, যাদের বাড়িতে ব্রডব্যান্ড নেই বা একটি স্মার্ট ফোন কেনার সামর্থ্য নেই, তারা দীর্ঘ সময় শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই যে শিখন-ক্ষতি তা দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলবে। ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ যখন উচ্চ বেতনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সফটওয়্যার খাতে কাজ করবে, তখন ডিজিটাল শিক্ষাবঞ্চিত তরুণটি কেবল কায়িক শ্রমের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই শিক্ষাগত বৈষম্যই আগামী ২০-৩০ বছরের জন্য সমাজে আয়-বৈষম্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
দক্ষতার ঘাটতি ও ডিজিটাল শ্রমবাজার
বর্তমান বিশ্বে অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। কয়েক লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিন্তু এই অর্জনের সিংহভাগই ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরকেন্দ্রিক। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং মফস্বল এলাকায় নিম্নমানের গতির কারণে গ্রামীণ মেধাবী তরুণরা বৈশ্বিক এই বিশাল সুযোগগুলো গ্রহণ করতে পারছে না। বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে মোবাইল ফোনের ব্যাপক বিস্তার থাকলেও কম্পিউটার চালনার প্রাথমিক জ্ঞান আছে মাত্র ১০ শতাংশের কম মানুষের। পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল লিটারেসি বা কারিগরি সাক্ষরতার হার আরও কম। এই দক্ষতার ব্যবধানই মূলত স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
লিঙ্গবৈষম্য ও ডিজিটাল জগৎ
ডিজিটাল বিভাজন বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকেও নতুন করে উসকে দিচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় নারীদের ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোন ব্যবহারের হার ১০-১৫ শতাংশ কম। যখন সরকারি-বেসরকারি সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাট ফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখন প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা নারীরা স্বাভাবিকভাবেই মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকছে। বিশেষ করে ই-কমার্স বা এফ-কমার্সের এই যুগে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা যদি ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ না হন, তবে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না।
শহরমুখী অভিবাসন ও আঞ্চলিক বৈষম্য
ডিজিটাল অবকাঠামো যখন শহরকেন্দ্রিক হয়, তখন কর্মসংস্থানের সুযোগও শহরেই সীমাবদ্ধ থাকে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সুবিধা ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎসংযোগ না থাকায় জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে বড় ধরনের আইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণরা কাজের সন্ধানে ঢাকামুখী হচ্ছে। এতে ঢাকার ওপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতি ডিজিটালাইজেশনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার ছিল বিকেন্দ্রীকরণ, কিন্তু ডিজিটাল বিভাজন উল্টো কেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত করছে।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির নীতিগত পথ
এই ভয়াবহ ডিজিটাল বিভাজন রোধ করতে হলে প্রথাগত নীতিমালার বাইরে এসে কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে হবে-
১. ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি : পানি বা বিদ্যুতের মতো ইন্টারনেটকে একটি অত্যাবশ্যকীয় সেবা হিসেবে গণ্য করতে হবে। প্রান্তিক মানুষের জন্য ইন্টারনেটের ওপর থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রত্যাহার করে এর মূল্য সর্বজনীন করা জরুরি।
২. ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন : কেবল ডিভাইস দিলেই হবে না, তা ব্যবহারের দক্ষতাও শেখাতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কোডিং ও ডিজিটাল দক্ষতার পাঠদান বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
৩. অবকাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ : ‘এক দেশ এক রেট’ ইন্টারনেটের কার্যকর বাস্তবায়ন সারা দেশে নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে হাই-স্পিড অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে সচল রাখতে হবে।
৪. নারীবান্ধব ডিজিটাল ইকোসিস্টেম : নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে স্মার্ট ফোন লোন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. আর্থিক প্রণোদনা : যারা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীল কাজ করছে (যেমন- কৃষক যারা অ্যাপ ব্যবহার করে বালাইনাশক বা বাজার দর জানছে), তাদের বিশেষ ডাটা প্যাক বা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল বিভাজন দূর করা এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি একটি মৌলিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। যদি এই বিভাজন রোধ করা না যায়, তবে আমরা এমন এক প্রবৃদ্ধির দিকে যাব যা কেবল একটি নির্দিষ্ট উচ্চবিত্ত ও প্রযুক্তি-সক্ষম শ্রেণিকে ধনী করবে, আর সাধারণ মানুষকে ‘ডিজিটাল প্রলেতারিয়েত’ বা নতুন ধরনের দাসে পরিণত করবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি তখনই সার্থক হবে যখন প্রযুক্তির চাবিকাঠি রাজধানীর বহুতল ভবন থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষের হাতেও সমানভাবে থাকবে। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে কেবল রোবোটিক্স বা এআই নয়, স্মার্ট বাংলাদেশ মানে হলো প্রযুক্তির সেই সাম্য- যেখানে সুযোগের সমতা থাকবে সবার জন্য। ডিজিটাল বিভাজন ঘুচিয়েই গড়ে তুলতে হবে আগামীর সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।
প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা, এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর