কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

এডিপি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

ড. মো. আইনুল ইসলাম [সূত্র : জনকষ্ঠ, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫]

এডিপি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি কেবল একটি সরকারি হিসাব-নিকাশের দলিল নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। বিগত ৫০ বছরের জাতীয় বাজেটের তথ্য-পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের এডিপি মূলত একটি বৈষম্যমূলক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বদলে একটি ক্ষুদ্র সুবিধাবাদী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে। ১৯৭২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত মোট ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্প-কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এ-বাবদ মোট ৬০ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা প্রকল্পের জন্য ব্যয়িত হয়েছে। যার বণ্টন-বিন্যাস পর্যালোচনা করলে এডিপির একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রায় ৮৭ শতাংশ জনসংখ্যার বিশাল অংশটিকে বঞ্চিত করে অন্য খাতে প্রবাহিত হয়েছে।

 

 

একে কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা বললে ভুল হবে; এটি একটি পরিকল্পিত কাঠামোগত লুণ্ঠন বা ‘ইনস্টিটিউশনাল রেন্ট-সিকিং’। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাক্সক্ষার জন্ম হলো, তখন প্রত্যাশা ছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকার এই জরাজীর্ণ ও অন্যায্য কাঠামো ভেঙে ফেলবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ১৬ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১ শতাংশের আশপাশে থাকা এবং বরাদ্দের চরিত্রে কোনো আমূল পরিবর্তন না আসা ইঙ্গিত দেয় যে, বৈষম্যের সেই পুরনো ভূত এখনো নীতি-নির্ধারণী অলিন্দে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই স্থবিরতা কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা এবং উন্নয়নের দর্শনগত সংকটেরও বহিঃপ্রকাশ।

 


অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ ও প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক পদে যারা আসীন আছেন, তারা প্রত্যেকেই অর্থনীতির পণ্ডিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। তাদের জ্ঞানের গভীরতা অনস্বীকার্য হলেও, মাঠপর্যায়ের এডিপি বাস্তবায়নের যে করুণ চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা তাদের তাত্ত্বিক পাণ্ডিত্যের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। অলিভার উইলিয়ামসনের ‘ট্রানজ্যাকশন কস্ট ইকোনমিকস’ বা লেনদেন ব্যয় তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের এডিপি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব লেনদেন ব্যয়কে এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই প্রকৃত সামাজিক উপযোগিতা প্রায় লোপ পেয়ে যায়।

 

 

বর্তমান পণ্ডিত নীতিনির্ধারকরা হয়তো তাদের অর্জিত পুঁজিবাদের প্রথাগত পাঠ্যবই থেকে উন্নয়নের সংজ্ঞা খুঁজছেন, কিন্তু তারা এই ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধা ভাঙতে ব্যর্থ হচ্ছেন। প্রকল্পের ডিজাইন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যে অসংখ্য সভা ও রিপোর্টিংয়ের বোঝা চাপানো থাকে, তা মূলত প্রকল্পের গতিকে মন্থর করে দেয়। তারা যদি তাদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধুনিক সংস্করণ প্রয়োগ করতে পারতেন, তবে তারা বুঝতে পারতেন যে, একটি অসম্পূর্ণ চুক্তির পরিবেশে যেখানে লক্ষ্য ও সময়সীমা অনিশ্চিত, সেখানে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি নয় বরং কাঠামোগত সংস্কারই ছিল প্রথম কাজ। নীতিনির্ধারকদের এই তাত্ত্বিক বিচ্যুতি বা তত্ত্বের ভুল প্রয়োগের কারণেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতেও বিপুলসংখ্যক প্রকল্প বরাদ্দবিহীন বা অননুমোদিত অবস্থায় ঝুলে আছে, যা প্রকারান্তরে প্রকল্পের ‘রিটার্ন’ বা প্রতিদানকে নামিয়ে আনছে শূন্যের কোঠায়।

 

 


সামাজিক বিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতান্ত্রিক তত্ত্বের সাথে যদি আমরা বর্তমান এডিপি বাস্তবায়ন ব্যবস্থার তুলনা করি, তবে একটি বিশাল তাত্ত্বিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ওয়েবারীয় ‘ফর্মাল র‌্যাশনালিটি’ বা আনুষ্ঠানিক যুক্তিবাদিতা পালনে যতটা পটু, ‘সাবস্ট্যান্টিভ র‌্যাশনালিটি’ বা প্রকৃত ফল অর্জনে ততটাই বিমুখ। স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যখন বাস্তবায়নের হার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন বোঝা যায় যে, নীতিনির্ধারকরা কেবল ফাইলে সই আর সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন। অর্থনীতির এই পণ্ডিতেরা যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন, তখন তাদের উচিত ছিল আমলাতন্ত্রের এই জড়তা ভেঙে একটি ফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা। কিন্তু তারা সম্ভবত পুঁজিবাদনির্ভর যে অর্থব্যবস্থার তাত্ত্বিক কাঠামোতে অভ্যস্ত, সেখানে আমলাতন্ত্রের এই লক্ষ্যচ্যুতি বা ‘গোল ডিসপ্লেসমেন্ট’, যেখানে প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয় বরং প্রক্রিয়া পালনই মুখ্য, তা তারা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি।
বাংলাদেশের এই ভঙ্গুর এডিপি কাঠামোর বিপরীতে চীনের উন্নয়ন কৌশল ও প্রশাসনিক মডেল একটি চমৎকার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পাঠ হতে পারে। চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূলে রয়েছে ‘ডেভেলপমেন্টাল স্টেট’ বা বিকাশমান রাষ্ট্র তত্ত্বের সফল প্রয়োগ। চীন দেখিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কেবল নথিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তা যদি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার (কি পারফরমেন্স ইন্ডিকেটর-কেপিআই) মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবেই দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব।

 

 বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা যখন প্রকল্পের দায়িত্ব এককভাবে একজন প্রকল্প পরিচালকের ওপর ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন, চীনে তখন প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় নেতার পদোন্নতি নির্ভর করে তাদের বরাদ্দকৃত প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। চীনা দর্শনে নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ বা ‘হোল-প্রসেস পিপলস ডেমোক্রেসি’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। চীনের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার যদি সত্যিই উদ্ভাবনী হতেন, তবে তারা চীনের এই সমন্বিত প্রশাসনিক মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের এডিপি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তারা এখনো বিশ^ব্যাংকের-আইএমএফের তৃতীয় বিশে^র জন্য প্রণীত মান্ধাতা আমলের আইএমইডি রিপোর্টিংয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা সমস্যা সমাধানের বদলে কেবল বিলম্বই ঘটায়।

 


ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘আস্থা তত্ত্ব’ (ট্রাস্ট থিওরি) বর্তমান বাংলাদেশের এডিপি সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। রাজনৈতিক উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার ওপর যখন আস্থা কমে যায়, তখন ঠিকাদার থেকে শুরু করে আমলা-সবাই ঝুঁকি এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করে। ২০২৪ সালের জুলাইপরবর্তী সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের এই মন্থর গতি মূলত একটি ‘লো ট্রাস্ট ইক্যুইলিব্রিয়াম’ বা নিম্ন আস্থার ভারসাম্যের ফল। পরিকল্পনা উপদেষ্টার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকদের দায়িত্ব নিতে অনীহা এই আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। দক্ষ অর্থনীতিবিদ হিসেবে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কাজ ছিল এই আস্থার সংকট দূর করে বেসরকারি খাত ও সরকারি আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করা। কিন্তু তারা সম্ভবত তাত্ত্বিকভাবে এতটাই ‘বিশুদ্ধ’ পুঁজিবাদী কাঠামোতে বিশ্বাসী যে, বাজার বা প্রশাসনের এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথবা ভবিষ্যতে হেনস্তার আতঙ্কে দুর্নীতিনির্ভর এডিপির কম বাস্তবায়নকেই নিরাপদ ভাবছেন। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অজুহাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে, যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই আস্থাহীনতা কেবল বর্তমানের ক্ষতি করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল ঋণের বোঝা ও উন্নয়ন বৈষম্যের উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে।

 


বাংলাদেশের এডিপি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি আমূল তত্ত্বভিত্তিক রূপান্তর বা প্যারাডাইম শিফট। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের সামনে সুযোগ ছিল একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করার। কিন্তু তাদের কার্যক্রমে সেই সংকল্পের অভাব স্পষ্ট। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত হবে একটি ফলভিত্তিক বাজেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি টাকার হিসাব থাকবে জনগণের কাছে উন্মুক্ত। ওয়েবারীয় আমলাতন্ত্রের সংস্কার করে মেধাতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন তৈরি না করলে এবং ডিজিটাল গভর্নেন্সের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তদারকি নিশ্চিত না করলে এডিপি কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের পকেট ভরার হাতিয়ার হয়েই থাকবে। আলবার্ট হিরশম্যানের অসমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি তত্ত্বের অপব্যাখ্যা বন্ধ করে সমতামূলক ও বিকেন্দ্রীকৃত বিনিয়োগের দিকে যেতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে যে, পাণ্ডিত্য কেবল বইয়ের পাতায় নয়, তার সার্থকতা হলো সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। যদি এই সুযোগে এডিপির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা না যায়, তবে ২০২৪ সালের কিশোর-তরুণদের সেই মহান আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে।

 


মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রাকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা এবং চীনের মতো পরীক্ষিত ও প্রমাণিত মডেলের কঠোর বাস্তবায়ন কৌশলের কোনো বিকল্প নেই। এ কোশল বাস্তবায়ন করা খুবই সম্ভব। কারণ, বিসিএস ক্যাডার হিসেবে যোগ দেওয়া দেশের মেধাবীরাই আগামীর প্রশাসনিক সংস্কারের আসল কারিগর। বিদ্যমান কাঠামোর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের সততা ও উদ্ভাবনী চিন্তা নীরব বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম। তারা কেবল ব্যবস্থারই অংশ নন, বরং ভেতর থেকে পরিবর্তনেরও বীজ। দীর্ঘমেয়াদে এই মেধাবীরাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও জনবান্ধব ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু ‘সিস্টেম’টাই এমন যে, তারা মেধা বিকাশ ঘটাতে না পেরে নিজেরাই সিস্টেমে পড়ে যান। মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রকৃত সম্ভাবনাকে জনসেবায় রূপান্তর করতে না পারা জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা না কাটাতে পারলে প্রতিবছর এডিপি কম বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের আত্ম-দায়মুক্তি সারতে হবে। 

 


লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়