একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলো
এ কে এম আতিকুর রহমান [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ৩ মার্চ ২০২৬]

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঙালি, বাংলাদেশ এবং একাত্তরের মার্চ এক সুতায় গাঁথা হয়ে আছে। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়টা বাঙালির জন্য একদিকে যেমন ভয়াবহরূপে আবির্ভূত হয়েছিল, অন্যদিকে জীবন বাজি রেখে সেই ভয়াবহতাকে হটিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমগ্র বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। এর আগে এই মাটি যেমন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন দেখেছে, উনসত্তরের গণ-আন্দোলন দেখেছে; তেমনি একাত্তরের মার্চে বাংলার জনগণ দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনার ইতিহাসটিও প্রত্যক্ষ করেছে।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বরতা আর ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশের জনগণকে থামিয়ে রাখতে পারেনি, বরং তাদের ওই সব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই ত্বরান্বিত করেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুর্বল রাজনৈতিক অভিজ্ঞান, যা অবৈধ পন্থায় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার ইন্ধন জুগিয়েছে এবং পাকিস্তানকে বিভাজনের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে ক্ষমতা ধরে রাখা যে নিজেদের জন্যই কতটা ক্ষতিকর, তা তখনকার পাকিস্তানি নেতাদের বোধগম্য হয়নি বা তাঁরা বুঝতে চাননি। আসলে দেশের সাধারণ মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন তাদের দমন করা যে সম্ভব হয় না, তা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে গণনা করা শুরু করতে হলো একাত্তরের এই মার্চ মাস থেকেই।
তাইতো মার্চ আমাদের স্বাধীনতার বীরত্বগাথার অংশ হয়ে আছে।
আমরা জানি, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের দুই অংশ (পূর্ব ও পশ্চিম) মিলে সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৩টিসহ ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৮৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা ভাবতে পারেনি যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এভাবে একজোট হতে পারে। পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান সরকারের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আসবে, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হলো, যখন ডিসেম্বরের শেষ দিকে তিনি ঘোষণা করলেন যে সিন্ধু ও পাঞ্জাব ছিল পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং তাঁর দল ওই দুই প্রদেশেই জয়ী হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না এই কারণে যে তারা পাকিস্তানের সংবিধান পরিবর্তন করতে চায়, যা পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর মধ্যে এবং পরিশেষে শেখ মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকগুলোর সমাপ্তিতে ইয়াহিয়া খান প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের আহবান করবেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান মার্চের ৩ তারিখে ঢাকায় জাতীয় সংসদের বৈঠক আহবান করলে ভুট্টো ওই বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দেন। মূলত এসবই ছিল ইয়াহিয়া খান বা ভুট্টোর রাজনৈতিক ছলচাতুরী, যাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ না করতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সময় পাওয়া যায়। ইয়াহিয়া খানের ভেতরের পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে বিমানবিধ্বংসী কামানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এর কিছুদিন পর অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভর্তি করে একটি জাহাজ করাচি থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। অন্যদিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে সভা করে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াতে লাগলেন। এমনকি তিনি বললেন যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংসদ হবে একটি কসাইখানা।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় সংসদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দেন। যদিও অজুহাত দেখানো হয় যে বিদ্যমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আরো সময়ের প্রয়োজন, কিন্তু মূলত তারা এসব করছিল সামরিক প্রস্তুতির জন্য। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ইয়াহিয়ার ওই ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি, সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জনগণ মিছিল করে রাস্তায় নেমে আসে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণার দাবি জানাতে থাকে। ২ মার্চ ছাত্রলীগ ঢাকা শহরে বড় ধরনের মিছিল করে এবং বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। এরই মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে এক বিরাট জনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের কোনো কিছুই আর পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে চলছিল না। অসহযোগ আন্দোলনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া সেদিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইঙ্গিত দিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাস্তবতার দিকে এগিয়ে চলে।
৭ মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে জনতার সভা, সমাবেশ ও মিছিল শুধু ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ রইল না, বাংলার আনাচকানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। আর ওই সব মিছিল বা মিটিংয়ে শুধু ছাত্রদেরই নয়, নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ক্রমেই বেড়ে চলল। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় প্রতিটি মানুষের মধ্যে এক সংগ্রামী চেতনা স্পষ্ট হয়ে উঠল। পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা শুরু হলো। সবার মধ্যেই প্রথমে প্রতিরোধ, তারপর প্রতিশোধ এবং সব শেষে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় প্রত্যয় জেগে উঠল।
কার্যত পূর্ব পাকিস্তান নামের পাকিস্তানের এই প্রদেশে দিন দিন ইয়াহিয়া সরকারের শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়তে লাগল। ৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং অফিস-আদালতে হরতাল পালন করা শুরু হয়ে গেল। ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে রাস্তার ব্যারিকেড সরাতে অস্বীকৃতি জানালে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে এবং বহু লোক হতাহত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজে পাকিস্তানের করাচি থেকে আনা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নামাতে বন্দর শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করেন। ২৩ মার্চ সারা পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন এবং পরের দিন শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। মূলত ইয়াহিয়া খানের সামনে বিরাজমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তখন দুটি পথ খোলা ছিল—আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া অথবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাঙালিদের আন্দোলনকে প্রতিহত করা। ওই সময় ভুট্টোও ঢাকায় এলেন এবং ২৪ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। ২৫ মার্চ তাঁদের আলোচনা ব্যর্থ হলে ওই দিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ছাড়েন এবং রাতেই পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সংগ্রাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করলে আমরা শত্রুমুক্ত বাংলাদেশকে পাই।
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার বাংলাদেশের, যা সবার অংশগ্রহণে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু এতটা বছরেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। সেই গুরুদায়িত্ব পালন করার ভার যাদের ওপর ন্যস্ত হয়, তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব যত দিন থাকবে, তত দিন তা স্বপ্নই রয়ে যাবে। দেশকে ভালোবাসলে, দেশের মানুষকে ভালোবাসলে তা অর্জন অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এই মার্চ থেকেই শুরু হোক না সেই অঙ্গীকার নেওয়ার এবং তা বাস্তবায়নের যাত্রা। আমাদের নেতৃত্বের মাঝে বর্তমান প্রজন্ম হয়তো তখন মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনার অন্তত কিছুটা আলো দেখতে পাবে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব