কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

এখনই সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানির

গৌরাঙ্গ নন্দী [প্রকাশ : আজকের পত্রিকা, ২৫ এপ্রিল ২০২৬]

এখনই সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানির

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে সৃষ্ট যুদ্ধ ভূ-রাজনীতিতে অদ্ভুত টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে। অনিবার্য ফল হিসেবে বৈশি^ক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীলতায় পড়েছে। আমরা যার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার শিকার। প্রকৃতপক্ষে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিবিধ ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। রান্নায় ব্যবহৃত গ্যাস-সিলিন্ডারের মূল্য বেড়েছে। যানবাহনে ভাড়া বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়ছে। বলা বাহুল্য, এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। তারা দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। যা উৎসাহব্যঞ্জক। কারণ আমদানীনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি, কয়লা, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা আমাদের নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। কারণ, পেট্রোলিয়াম, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা। যা পরিবহন খাত, শিল্প-কারখানা এবং রান্নাঘরে জ্বালানি জোগায়। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুদ ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আমাদের দেশের জ্বালানি মূলত আমদানিনির্ভর। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন। এ কারণে রিজার্ভে টানাপড়েন লেগেই থাকে। মনে রাখা দরকার, গত এক দশকে দেশে জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরে এসে আমরা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়েছি। ২০১৭ সালে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন দৈনিক ২,৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছালেও এখন তা আর উল্লেখ করার মতো নেই। বিপরীতে শিল্প-কারখানা ও নগরে জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

 

 

২০২৪-২৫ সালে এলএনজির চাহিদা ৭.৪১ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায়  ১৯ শতাংশ বেশি। পেট্রোলিয়ামের চাহিদা বছরে প্রায় ৭ মিলিয়ন টনে স্থিতিশীল রয়েছে। যেহেতু বাড়ি বাড়ি পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ স্থগিত রয়েছে, তাই দেশের ৯৮ শতাংশ পরিবেশবান্ধব রান্নার প্রয়োজনে এলপিজি পছন্দের জ্বালানি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এলএনজি আমদানি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি মৌলিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে, যা দেশ হিসেবে আমাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’র আশ্রয় ‘স্পট মার্কেট’ হতে আমরা এখন এলএনজি আমদানি শুরু করেছি। যেখানে আরও ধনী ইউরোপীয় এবং পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমরা দরের লড়াই করছি। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টন এলএনজি ক্রয়ের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আনুমানিক মোট মূল্য ১৫ বিলিয়ন ডলার। বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ ব্যয়ই বর্তমানে আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবহন খাত অভ্যন্তরীণ জ্বালানি থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং আমদানিকৃত পেট্রোলিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। এই খাতে মোট বিদ্যুতের ২ শতংশ এবং জ্বালানি তেলের ৬৩.৪১ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করলে এ কারণেই ভাড়া ও পরিবহন খাতে খরচ বেড়ে যায়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

 

 

 

সেই প্রতিক্রিয়ার আগুনে এবারও সাধারণ মানুষ জ্বলতে শুরু করেছে। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। আমরা এখন আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবস্থা হতে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নিজেদের পরিবর্তিত করতে পারি। এক্ষেত্রে সামনে পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কার উদাহরণ রয়েছে। চীন অনেক আগেই পেট্রোলিয়াম-নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে একাধিক পদক্ষেপ নিতে পারে। পদক্ষেপগুলো হচ্ছে : ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থায় ডিজেলের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের প্রচলন করা। বাংলাদেশে ৪ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার পরিবার রয়েছে, যারা জাতীয় গ্রিডের ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এই পরিবারগুলোর ৪১ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি পরিবার অন্তত ১ কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারে। এতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়তে পারে। যার ফলে বছরে ২৬ হাজার মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুধু জ্বালানি খরচ বাবদই প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে আমরা প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারি।
 
 
 
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের একটি স্থিতিশীল উৎস আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে, যা পরিস্থিতির চাপে নুইয়ে পড়তে হবে না। শুধু পারিবারিক ছাদ নয়, সরকারের নিজস্ব ভবনগুলো সৌরবিদ্যুতের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ২০২৫ সালের আগস্টে নেওয়া তিন হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচিটি এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়াও দেশের ১ লাখ ২২ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার   ১৩৭টি কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২  হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায়। এটি সম্ভব হলে সরকারের জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমালে তা শিল্প খাতে বরাদ্দ করা যাবে, ফলে কারখানার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকবে। রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
 
 

বর্তমানে দেশে ১২ লাখেরও বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে। বিদ্যুতায়িত সেচপাম্পের সংখ্যা ৫ লাখ। সেখানে সৌরচালিত সেচপাম্প মাত্র ৩ হাজার ৬০২টি। আমরা ডিজেলচালিত পাম্পগুলোকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে সরকারকে বছরে ১০,৯১৪ কোটি টাকার ডিজেল আমদানি করতে হবে না। বর্তমানে প্রতি বছর মাত্র ২০০-২৫০টি সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই এক বছরের মধ্যে নেট মিটারিং সংযোগসহ কমপক্ষে ১০ হাজার সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপন করা নিশ্চিত করতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরচালিত সেচপাম্প ছাড়াও দেশজুড়ে ৩২ হাজার ৩১৫টি জলাশয়ে কমপক্ষে ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। দেশের ১,৫০০ বর্গকিমি পুকুরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

 

এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলো জমির স্বল্পতার সমাধান যেমন করবে, তেমনি সবুজ জ্বালানি সরবরাহও করবে। ব্যক্তিগত ও শিল্প-কারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং সৌরচালিত সেচপাম্পের উদ্যোগে সহায়তা করার জন্য কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি আবর্তন তহবিল গঠন করা উচিত। পাশাপাশি নিয়ম করা উচিত, এই তহবিল সঞ্চালনে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কোনো সুদ নেবে না এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ন্যূনতম সুদ গ্রহণ করবে। পরিবহন খাতে পেট্রোলিয়াম-নির্ভরতা কমাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলোতে গণপরিবহনের জন্য অবিলম্বে বৈদ্যুতিক বাস সংগ্রহ ও চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য এ ধরনের যানবাহনের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য কর প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়াও সরকারের উচিত, প্রতিটি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বাড়িতে বসে দাপ্তরিক কাজ করা, ব্যক্তিগত যানবাহন পরিহার এবং রান্নার জন্য এলপিজির পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো।

 

 

এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সরকারকে অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক কর এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করতে হবে। উপরন্তু প্রতিটি ব্যক্তিগত সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে তিন কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি প্রদান করা উচিত। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে নারী ও আদিবাসীদের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া উচিত। এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ন্যূনতম বাজেট বরাদ্দের ধারা ভেঙে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অধীনে জ্বালানি বাজেটের কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বরাদ্দ করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বেসরকারি খাতকে ছাড়িয়ে যায় এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়। এর ফলে ব্যক্তিগত ও শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ কমে যাবে এবং মানুষ নিজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে এগিয়ে আসবে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোলার প্যানেলের দাম প্রায় নব্বই শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানে একটি গোষ্ঠী চাইছে, আরও জ্বালানি আমদানি করার জন্য সরকার ঋণ গ্রহণ করুক, নতুন কয়লাখনি খননের উদ্যোগ নিক এবং কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানোর উদ্যোগ নিক। এসব প্রস্তাবে সায় দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমাধান তো হবেই না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশ আরও আমদানির ফাঁদে আটকে যাব আমরা।

 

 

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক