কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিনি স্থানান্তর নয় বাস্তুচ্যুতির প্রস্তাব

ইয়োসি মেকেলবার্গ । সূত্র : কালবেলা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

ফিলিস্তিনি স্থানান্তর নয় বাস্তুচ্যুতির প্রস্তাব

যুক্তরাজ্যের টেলিভিশনে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়, যার নাম ‘এ নিউ লাইফ ইন দ্য সান’। যেসব মানুষ ব্রিটেনের বিষণ্ন আবহাওয়া ছেড়ে উষ্ণ অঞ্চলে বসতি গড়তে চান, তাদের স্থানান্তরিত করে দেন এ অনুষ্ঠানের নির্মাতারা। নতুন বাসস্থানের পাশাপাশি নতুন চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ করে দেন তাদের। এ নতুন জীবনে সন্তুষ্টি আর তৃপ্তি খুঁজে পান ব্রিটিশ অভিবাসীরা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে গাজার বিশ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে অন্যত্র স্থায়ী পুনর্বাসনের কথা বলছেন, তা মোটেও এমন নয়। সেটাকে ‘অভিবাসন’ বলাও চলে না, সেটাকে প্রকৃত অর্থে যা বলা উচিত, তা হলো—জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি।

 

 

জাতিগত নির্মূলকরণের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এটি। যদি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের মাত্রা হবে অদৃষ্টপূর্ব। ২০২৩ এর ৭ অক্টোবরের ঘটনার আগেও তারা কষ্টের জীবনযাপন করে আসছিল, কিন্তু ৭ অক্টোবরের পর থেকে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছে। যুদ্ধের দরুন গাজার ভেতরেই বাস্তুহারা হতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। তদুপরি এ মানুষগুলোকে দেশছাড়া করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

 

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ সপ্তাহে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ সম্মেলনে দেওয়া তার প্রস্তাবগুলোকে অত্যন্ত আপত্তিকর বলে মতপ্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তিনি একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে গেছেন। কিছুদিন আগে তিনি গাজার অধিবাসীদের মিশর ও জর্ডানে স্থানান্তরিত করার কথা বলেছিলেন। এই সম্মেলনে তিনি আবারও একই প্রস্তাব দেন। শুধু যে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করার কথা বলছেন তাই নয়, একই সঙ্গে এ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এক বিলাসবহুল উপকূলীয় আবাসস্থলে পরিণত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন তিনি। তার এ বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষকে স্তব্ধ করে তুলেছে। কেউ পড়েছেন দুশ্চিন্তায়, তো কেউ ফেটে পড়ছেন তীব্র ক্ষোভে।

 

বস্তুত পুনর্বাসন শব্দটির বিধিসম্মত অর্থ হলো, স্থানান্তরিত ব্যক্তিরা হয় স্বেচ্ছায় নতুন ঠিকানার সন্ধান করবে অথবা তাদের সম্মতিতে কেউ তাদের জন্য নতুন ঠিকানা নির্ধারণ করে দেবে। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক তাদের আবাসস্থল থেকে বিতাড়িত করা হলে সেটা বৈধ পুনর্বাসন নয়, বরং সেটা আন্তর্জাতিক অপরাধ। এতে করে শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীই নয়, একই সঙ্গে যে ভূমিতে তাদের স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, সে অঞ্চলের মানুষের জীবন ব্যাহত হয় এবং আশ্রয় প্রদানকারী রাষ্ট্রের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি হয়।

 
 

কতদূর রইল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির কথা, সেই ব্যাপারে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ওরা মেনে নেবে। আমরা ওদের জন্য এ পর্যন্ত অনেক কিছু করেছি। কাজেই ওরা মেনে নিতে বাধ্য।’ তার এ বক্তব্যের পর এসব দেশের সরকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করবে, তা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

 
 

ট্রাম্প তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধান বলে মনে করছেন। কিন্তু এ পরিণতি মূলত ইসরায়েলের কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর দাবি। তারা চায় ফিলিস্তিনিদের চিরতরে এ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করা হোক। আবার ফিলিস্তিনের ভেতরে যে চরমপন্থি সামরিক গোষ্ঠীগুলো রয়েছে, তারাও ট্রাম্পের এ প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হয়ে সমঝোতার রাস্তা ত্যাগ করে দিতে পারে। কারণ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গোটা বিশ্বের কাছে এ বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, কোনো ধরনের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়, বরং এ দ্বন্দ্বে তারা ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ সমর্থন প্রদান করতে ষড়যন্ত্র করছে। ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করতে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব দমন করতে তারা মোটেও সংকোচ বোধ করবে না।

 

 

গাজার অধিবাসীদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা শুধু নৈতিকতার বিচারেই ত্রুটিপূর্ণ নয়, এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্যও ক্ষতিকর এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী। জেনেভা কনভেনশনের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘কোনো অঞ্চলের দখল নিয়ে জোরপূর্বক সেই অঞ্চলে বসবাসকারী সুরক্ষিত নাগরিকদের অন্য দেশে স্থানান্তরিত করা আইনত অপরাধ; তা দখলদার শক্তি যে উদ্দেশ্যেই করুক না কেন।’ কাজেই যারা ট্রাম্পের প্রস্তাবকে সমর্থন দিচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে অবগত যে, ফিলিস্তিনিদের অপসারণ আর তাদের স্বেচ্ছায় প্রস্থান এক কথা নয়। ইতিহাস এ বিষয়ের সাক্ষী যে, কোনো জনগোষ্ঠীকে বলপূর্বক বাস্তুহারা করা হলে তা কখনো তাদের নিরাপত্তা বা তাদের নিজেদের স্বার্থে করা হয় না বরং ক্ষমতালোভী ও আগ্রাসী দখলদারের স্বার্থ রক্ষার্থেই করা হয়।

 

 

এ সুপরিকল্পিত নির্মূলকরণে কট্টর ডানপন্থি ইসরায়েলি মহলের সম্পূর্ণ সমর্থন লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তাদের উল্লাস দেখা যাবে সে বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই। তদুপরি গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার প্রস্তাব জানিয়েছে তারা। এটা তাদের নৈতিক অধঃপতনের দৃষ্টান্ত বৈ আর কিছুই নয়। এ চরমপন্থিদের লক্ষ্য দিনে দিনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর তা হলো, জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইহুদি আধিপত্য বিস্তার করা এবং এ অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করা।

 

 

তবে শঙ্কার বিষয় হলো, এ চিন্তাধারা শুধু কট্টরপন্থিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিকই এমন পরিণতি দেখতে চায়। ‘জিউইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ৮০ শতাংশ ইহুদি নাগরিক মনে করে যে, গাজার অধিবাসীদের অন্য আরব দেশে স্থানান্তরিত হওয়া উচিত। তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করে, যে কোনো মূল্যে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা আবশ্যক, তা যত দুষ্করই হোক না কেন।

 

 

অর্থাৎ ট্রাম্প যদি এ পরিকল্পনা বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হন, তবে ইসরায়েলি নাগরিকদের সিংহভাগ অংশ সেটাকে অন্যায় হিসেবে দেখবে না। তাদের এ মনোভাব প্রমাণ করে যে, দুই-রাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং সহাবস্থানে তাদের তেমন বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব মধ্যপন্থি ইসরায়েলি সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো পূর্বে দুই-রাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তাদের বড় একটা অংশ এখন ট্রাম্পের এ নির্বুদ্ধি উদ্যোগের সমর্থন জানাচ্ছে।

 

 

অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রস্তাবের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বিপরীত। তার বিবৃতির পর গত শনিবার কায়রোতে সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এবং আরব লিগের অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করার সব পরিকল্পনা তারা প্রত্যাখ্যান করবেন। এই যৌথ বিবৃতিতে মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আরও জানান, এ ধরনের চিন্তা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে, বিদ্যমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে নির্মূল করে দেবে।

 

 

১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর জর্ডান দুই দফায় বৃহৎসংখ্যক ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজ দেশে আশ্রয় দেয়। এরপর ইরাকের যুদ্ধ এবং সিরিয়ার সংকটের পর এ দুই দেশের শরণার্থীদেরও তারা নিজ ভূখণ্ডে স্থান দেয়। এখন নতুন করে শরণার্থী গ্রহণ করার মতো অবস্থা তাদের নেই। নতুন শরণার্থী আসলে সেটা তাদের জাতীয় সম্পদের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করবে এবং তা পালাক্রমে শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও অস্থিরতা তৈরি করবে।

 

 

 শরণার্থীদের জায়গা দিতে হলে একই চিত্র মিশরেও দেখতে পাওয়া যাবে। তা ছাড়া এ দুটো দেশকে যদি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে রাজি করানো হয়, তবে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন কার্যত চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে যাবে। মধ্যপন্থি যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবকে সমর্থন দিচ্ছেন, তারা হয় এ বাস্তবতাটা বুঝতে পারছেন না অথবা এ বাস্তবতাটাকে নীরবে মেনে নিয়েছেন। বস্তুত প্রায় আট দশক ধরে চলমান ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের এই ঐতিহাসিক সংঘাতটা ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। সার্বভৌম ও স্বাধীন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাটাই ফিলিস্তিনিদের মৌলিক উদ্দেশ্য।

 

 

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম নিদর্শন হলো তাদের ধৈর্যের অটলতা এবং তাদের সংগ্রামের দৃঢ়তা। সহস্র প্রতিবন্ধকতার পরও তারা নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে রাজি নয়। ১৯৪৮ সালে নিজ ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাকে তারা ‘নাকবা’ নাম দিয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে তাদের জন্য দ্বিতীয় নাকবা। এ পরিকল্পনার নকশা তৈরিতে না ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে কোনোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, না ফিলিস্তিনিদের চাহিদাগুলোর কোনো তোয়াক্কা করা হয়েছে। এ প্রস্তাব গ্রহণ করা তো দূরের কথা, কোনো ফিলিস্তিনি নেতা এ প্রস্তাবের আলোচনায়ও অংশ নিতে রাজি হবে না। গাজায় যেই দুরূহ অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, এ অঞ্চল শাসন করা এখন রীতিমতো অসম্ভব। এর অধিবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে এই অঞ্চলে পুনর্বাসন নয়, পুনর্গঠন প্রয়োজন।

 

 

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং চ্যাথাম হাউস প্রতিষ্ঠানে মেনা প্রকল্পের অ্যাসোসিয়েট ফেলো। নিবন্ধটি আরব নিউজের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ