মো. জসিম উদ্দিন
[প্রকাশ: সময়ের আলো, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬]
গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের চলমান চুক্তি। সেই চুক্তি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি সংকটে পড়ে এবং জনগণের আস্থা ভেঙে যেতে শুরু করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আস্থার সংকট নতুন নয়। ভোট, অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গস্খহণ সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন জমেছে বছরের পর বছর। এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে সম্ভাব্য গণভোটের আলোচনা নিছক একটি সাংবিধানিক আয়োজন নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি সুযোগ। প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও ভেতরে গভীর গণভোট কি সত্যিই জনগণের কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দেবে, নাকি এটি নতুন করে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করবে? জনগণ কি বলবে হ্যাঁ, নাকি সংশয় আর অনিশ্চয়তায় বলবে না? এই জটিল সমীকরণের উত্তর খুঁজতে হলে গণভোটের নেপথ্যে থাকা সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।
গণভোট হলো সরাসরি গণতন্ত্রের এমন একটি রূপ, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ভোটার নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। এটি সাধারণত সংবিধান সংশোধন বা মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হয়, যা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা দূর করে জনগণের ইচ্ছা নিশ্চিত করে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের ‘ব্রেক্সিট’ গণভোট যেমন ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে, তেমনি সুইজারল্যান্ডে নাগরিকরা নিয়মিত গণভোটের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করে সফল গণতন্ত্রের মডেল তৈরি করেছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে সরাসরি জনমত বড় সংকটে সমাধানের পথ দেখাতে পারে। যখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত জনগণের রায়ে নির্ধারিত হয়, তখন সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি সরাসরি জনগণের কাছে নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গণভোট কোনো নতুন ধারণা নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইতিপূর্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনবার এই প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন ও নীতির ওপর জনসমর্থন যাচাইয়ে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা ও নীতির বৈধতা নিশ্চিতে দ্বিতীয়বার গণভোটের আয়োজন করা হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের গণভোট, যা ছিল মূলত একটি নীতিনির্ধারণী ভোট; এর মাধ্যমেই দেশের জনগণ রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয়।
পরবর্তী সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালের গণভোটের যে আলোচনা, তা কেবল একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি সংবিধানের ওপর জনগণের নিরঙ্কুশ মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি আইনি ও নৈতিক প্রক্রিয়া। সংবিধান যদি হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল, তবে সেই দলিলের যেকোনো বড় পরিবর্তনে জনগণের সরাসরি সায় থাকাটাই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য।
গণভোটের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো এটি জনগণকে ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে। পাঁচ বছর পরপর কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করলেই নাগরিকের ভূমিকা শেষ হয়ে যায় না; গণভোট সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে স্বচ্ছ করে এবং গোপন সমঝোতার অভিযোগ কমিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। বাংলাদেশে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রায়ই রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে গণভোট একটি আস্থার সেতু তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের গণভোটের প্রধান নিয়ন্ত্রক হবে জেন-জি বা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। তারা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নপ্রবণ। নতুন প্রজন্মের কাছে ভোট মানে কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, বরং নীতিগত সিদ্ধান্তে অংশীদারত্ব।
যেকোনো দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। অনিশ্চয়তা বাজারকে অস্থির করে এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। একটি সফল গণভোট দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই গণভোট আয়োজনে রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি কোনো বড় অর্থনৈতিক বোঝা চাপবে না। কারণ ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই যদি এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তবে একই প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জনবল ব্যবহার করে অত্যন্ত সাশ্রয়ীভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের কারণে দেশে যে পরিমাণ বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার তুলনায় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে একটি সুষ্ঠু গণভোট আয়োজন করা অনেক বেশি লাভজনক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্কারগুলো জনগণের সরাসরি সম্মতিতে গৃহীত, যা ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখেও অটুট থাকবে।
গণভোটের বিপক্ষে যুক্তিগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রথমত গণভোট জটিল বিষয়কে অত্যন্ত সরল হ্যাঁ বা না-এর মধ্যে আটকে ফেলে। অনেক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বহুস্তরবিশিষ্ট, যেখানে বিকল্প ও শর্তের প্রশ্ন থাকে। গণভোটে সেই জটিলতা প্রতিফলিত নাও হতে পারে। দ্বিতীয়ত গণভোটে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। শক্তিশালী প্রচার, ভয় বা আশার রাজনীতি জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা না হয়, তা হলে গণভোট বাস্তব সিদ্ধান্তের বদলে সাময়িক আবেগের প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত সমাজে গণভোট বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। হ্যাঁ ও না দলের মধ্যে সংঘাত বাড়তে পারে, যদি প্রক্রিয়াটি সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়। এই আশঙ্কাগুলো বাস্তব, তবে এগুলো গণভোট বাতিলের যুক্তি নয়, বরং গণভোট সঠিকভাবে আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বর্তমান সরকার বা রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে জড়িতরা বারবার একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলছেন ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার চাবি আপনার হাতে’। এই বাক্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণের প্রতি একটি সুগভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। এই চাবি হলো নাগরিকের ভোটাধিকার এবং মৌলিক সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার ক্ষমতা। ২০২৬ সালের গণভোট হতে পারে সেই চাবি ঘোরানোর শ্রেষ্ঠ সুযোগ। আমরা কি কেবল একটি সাময়িক সংস্কারের পক্ষে থাকব, নাকি একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় হ্যাঁ বলব সেই সিদ্ধান্তটিই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে। সরকার যখন জনগণের হাতে চাবি তুলে দেওয়ার কথা বলে, তখন এর অর্থ দাঁড়ায় রাষ্ট্রের মালিকানা আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের হাতে বন্দি নয়, বরং তা সরাসরি সাধারণ নাগরিকের কাছে ফিরে এসেছে। এখন সময় এসেছে সেই চাবি দিয়ে সম্ভাবনার নতুন দরজা খোলার এবং একটি স্থিতিশীল আগামীর ভিত্তি স্থাপন করার।
একটি গণভোট কতটা সফল বা অর্থবহ হবে, তা শুধু প্রশ্নের ধরনের ওপর নয়, বরং গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। একটি গ্রহণযোগ্য গণভোটের পূর্বশর্ত হলো নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থা, হালনাগাদ ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা এবং সব পক্ষের জন্য সমান প্রচারের সুযোগ। রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব কেবল ভোটগ্রহণ নয়, বরং ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা। এ ক্ষেত্রে মিডিয়া, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জোরালো ভূমিকা থাকা জরুরি, যাতে সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয় এবং অপপ্রচার রোধ করা সম্ভব হয়। যদি এই প্রক্রিয়াগত সততা নিশ্চিত না হয়, তবে ফলাফল যাই হোক তা দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। কিন্তু একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসা রায়, তা পক্ষেই যাক বা বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই সুসংহত করে।
গণভোট ২০২৬-এর মূল প্রশ্ন হলো আমরা কি জনগণের ওপর আস্থা রাখি? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে গণভোটের পক্ষে থাকা যৌক্তিক; কারণ এটি কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাসের ঘোষণা। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে গণভোট হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, তবে এটি হতে পারে নাগরিককে রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার করার একটি নতুন শুরু। ২০২৬ সালে জনগণ কী বলবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে, কিন্তু জনগণকে প্রশ্ন করার সাহস দেখানোই হতে পারে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ
লক্ষ্মীপুর