কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে করণীয়

মতিলাল দেব রায় [সূত্র : প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ৬ মে ২০২৬]

হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে করণীয়

দেশে গত মাসাধিক কাল ধরে চলা সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের মিছিল বড় হচ্ছে, যা কোনোভাবেই স্থিতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্দেশ করে না। হামের টিকা, ইপিআই কর্মসূচিতে দায়িত্বহীনতার ছবি স্পষ্ট।

নতুন সরকার যেন কোনোভাবেই এর লাগাম টানতে পারছে না। অতীতের দায়িত্বহীনতা থেকে আজকের এই সংকটের উৎপত্তি এবং দেশের বিপুলসংখ্যক শিশুর জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা সঠিক সময়ে টিকাদানের মাধ্যমে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। প্রশ্ন জাগে, টিকাদান কর্মসূচিতে কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে? কেন হাজার হাজার শিশু টিকার সুরক্ষাবলয় থেকে বাইরে?

 

 

হামসহ বহু সংক্রামক রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হাম-টিকা কার্যক্রম ঘিরে যে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ সামনে আসছে, তা এই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকির ঘাটতি এবং মাঠ পর্যায়ের সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি এর পেছনের কারণ।

 

 

সম্প্রতি সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছিল, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ এখনও হাম সংক্রমণের ‘উচ্চঝুঁকি’তে। সংস্থটি ২৩ এপ্রিল হাম নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, টিকার ঘাটতি এবং মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার তুলে ধরা হয়।

 

 

বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি দেশের আগের অর্জনকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। টিকার সংরক্ষণ, ফরিদাবাদ ঢাকা থেকে জেলা, উপজেলায় এবং তারপর গ্রামের টিকা দান কেন্দ্রে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত কোল্ড চেইন মেইনটেইন করা হয় কি না? টিকার কার্যকারিতা আছে কি না তা কঠিন নজরদারিতে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভ্যাকসিন কার্যকর থাকে ।

 

 

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, ১ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২৭৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২ হাজার ৩১৮ জন চিকিৎসাধীন।

 


প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে। দেশের আট বিভাগে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। কেন বাংলাদেশ উচ্চঝুঁকিতে সে কারণগুলো এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনাই এ ঝুঁকির কারণ। আক্রান্তদের বড় অংশের টিকা নেওয়া ছিল না। কারও কারও প্রথম ডোজ নেওয়া থাকলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া হয়নি। আগের অর্থবছরে দেশে এমআর টিকার ঘাটতি এবং পাঁচ-ছয় বছর ধরে দেশব্যাপী সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি অনিয়মিত হয়ে পড়ায় হামের ঝুঁকি বেড়েছে।

 

হাম সংক্রমণের সার্বিক চিত্র কেবল রোগের বিস্তার নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের প্রতিরোধযোগ্যতা নিশ্চিত করার ব্যর্থতার দলিলও। কারণ প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর মধ্যে হাম অন্যতম। সঠিকভাবে দুই ডোজ টিকা দিলে এ রোগ থেকে ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ বাস্তবতা বাংলাদেশ একসময় বুঝেছিল। ২০০০ সালে হামের প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ। বিভিন্ন সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও, ধনুষ্টংকার নির্মূল করা গেছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। হামও নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল এবং ২০২৫ সাল নাগাদ তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও ছিল। দারিদ্র্য ও জনঘনত্বের বাধা এড়িয়ে এসব সাফল্য দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। অথচ এ অর্জন আজ প্রশ্নের মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন স্পষ্ট বলছে, ২০২৪-২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দুটোরই কাভারেজ নেমে আসে। আমি মনে করি, এ ব্যর্থতার দায় সরকার বা সংস্থার একার নয়। তবে টিকা কেনায় অব্যবস্থাপনা ও পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার সরবরাহ-বিঘ্ন নীতিমালার বিষয়টি বর্তমান সরকার স্বীকার করেছে। কিন্তু দায়িত্ব বণ্টনের এসব আলোচনায় প্রতিদিন ঝরছে শিশুর জীবন।

 

 

এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে প্রশাসনিক উদাসীনতা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাস্থ্য খাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে গতি কমে গেছেÑ এমন অভিযোগ স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর নির্দেশনা না পৌঁছানোÑ এসব সমস্যা ইপিআই কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।

 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তদারকি দুর্বল। টিকাদান কার্যক্রমের সঠিক মনিটরিং, ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে ঘাটতি রয়েছে। কোথায়, কত শিশু টিকা পাচ্ছে, কোথায় ঝুঁকি বেশিÑ এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সম্ভব নয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় কাগজে-কলমে সাফল্যের চিত্র দেখানো হচ্ছে।

 

 

মাঠপর্যায়ে সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের গাফিলতির চিত্র আরও স্পষ্ট। অনেক জায়গায় টিকাদান কেন্দ্র সময়মতো খোলা হচ্ছে না, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সরবরাহে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও কর্মীদের অনুপস্থিতির কারণে শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে টিকার সঠিক সংরক্ষণ না হওয়ায় কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি।

 

 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতার অভাব। অনেক অভিভাবক এখনও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন, আবার কেউ কেউ ভুল তথ্যের কারণে টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই জায়গায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচারণা জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রচেষ্টা যথেষ্ট জোরালো নয়। ফলে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

তবে শুধু সমস্যার কথা বললেই হবে নাÑ সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। প্রথমত, ইপিআই কর্মসূচিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করতে হবে। ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অডিট এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, সিভিল সার্জন ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে, যাতে তারা উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারেন। চতুর্থত, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

 

ইপিআই কর্মসূচি বাংলাদেশের একটি গর্বের অর্জন। কিন্তু এই অর্জন ধরে রাখতে হলে দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। হামের টিকা নিয়ে যে অনিয়ম ও উদাসীনতার চিত্র সামনে আসছে, তা দ্রুত সংশোধন না করা হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য অনেক বড় হতে পারে। এখনই সময় সজাগ হওয়ারÑ নয়তো সাফল্যের গল্প ইতিহাস হয়ে যাবে, আর সামনে আসবে নতুন সংকটের অধ্যায়।

 

 

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে এই মহামারিতুল্য পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করার কথা বলব। বিভাগীয় ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ওষুধের সরবরাহ এবং চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা এখনই প্রয়োজন। অবহেলায় আর কোনো শিশুর প্রাণ ঝরে যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা মানে জাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। এখন সময়Ñ গাফিলতি নয়, শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীলতার।

 

মতিলাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক