হরমুজ প্রণালি থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক
এম এ হোসাইন [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৪ মার্চ ২০২৬]

ভূ-রাজনীতি কখনো অনুগত নয়, যতটা মনে হয়। মার্কিন রাষ্ট্রনীতিতে এক অদ্ভুত কৌশলের প্রলোভন রয়েছে। তাদের বিশ্বাস, নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র যা করতে পারে, ধৈর্যশীল রাজনীতি তা পারে না। স্বৈরশাসককে সরিয়ে দাও, শাসনব্যবস্থার উচ্ছেদ করো, তারপর ভরসা রাখো দীর্ঘদিন দমিত নাগরিক সমাজ ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্সের মতো উঠে দাঁড়াবে এবং কৃতজ্ঞ অশ্রুতে উদার গণতন্ত্রকে আলিঙ্গন করবে। এটি একটি তত্ত্ব। কিন্তু অধিকাংশ সময় বাস্তবতার নিরিখে এটি কাল্পনিক অস্তিত্ব।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনো নৈতিক নাটক নয়, যেখানে খলনায়ক মঞ্চ ত্যাগ করে আর নায়ক পর্দার আড়াল থেকে এগিয়ে আসে। এটি শক্তি, ভয়, স্বার্থ এবং গতিশীলতার অঙ্গন। যখন কোনো রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বিশেষত গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসমৃদ্ধ, কঠোর নিরাপত্তা যন্ত্রে সজ্জিত এবং শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তিসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র ধ্বংস করা হয়, তখন সেখানে দেবদূতেরা ছুটে এসে শূন্যতা পূরণ করে না। বরং সেই শূন্যতা দখলে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিলিশিয়া, সামরিক গোষ্ঠী এবং নির্মম শক্তিগুলো। এমন দৃশ্যপট আমরা আগেও দেখেছি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনকে আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা উন্মুক্ত করেছিল সাম্প্রদায়িক রক্তপাতের দ্বার এবং সীমান্ত অতিক্রম করে জিহাদি আন্দোলনের উত্থান।
লিবিয়ায় মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে অপসারণ মানবিক হস্তক্ষেপের ভাষণে মোড়ানো ছিল। কিন্তু ফেলে গিয়েছিল বিভক্ত রাষ্ট্র, প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার এবং প্রকাশ্য দাসবাজারের এক করুণ বাস্তবতা। সিরিয়ায় শাসন পরিবর্তন একটি অভ্যন্তরীণ গণআন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী দহনক্ষেত্রে রূপ দিয়েছিল, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো সমানভাবে জড়িয়ে পড়ে।
তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বিবেচনা করা যাক। হরমুজ প্রণালি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডর, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার একটি সংকীর্ণ করিডর। যখন সংঘাত সেই করিডরকে হুমকির মুখে ফেলে, ট্যাংকারগুলো দ্বিধাগ্রস্ত হয়, বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, নৌপথ শূন্য হয়ে পড়ে তখন তার অভিঘাত পারস্য উপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পৌঁছে যায়। জ্বালানি বাজার ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন কেবল আঞ্চলিক অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি তেলের উচ্চ মূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সীমিত সম্পদে সংসার চালানো পরিবারগুলোর জন্য অর্থনৈতিক কষ্টের কারণ হবে। যে বৃহৎ কৌশল এমন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্রভাবকে উপেক্ষা করে, তা আদৌ কোনো কৌশল নয়। এটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছদ্মবেশে সাজানো ইচ্ছাপূরণ মাত্র। এরপর আসে প্রতিশোধের প্রশ্ন। ইরান কেবল একটি প্রচলিত রাষ্ট্র নয়; এটি এক নেটওয়ার্কভিত্তিক শক্তি। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কয়েক দশক ধরে লেবানন, ইরাক, ইয়েমেনসহ বিস্তৃত অঞ্চলে অংশীদারদের সশস্ত্র ও অর্থায়ন করে প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে।
শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান মুছে দেয় না। আর অস্তিত্বসংকটে আবদ্ধ কোনো শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার যুক্তিকেও তা নিভিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্র খুব কমই আত্মহত্যা করে। তারা পাল্টা আঘাত হানে। এমন পরিস্থিতিতে, ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়, প্রক্সিদের মাধ্যমে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে হামলা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা হবে না; বরং এগুলো হবে পুরোপুরি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। আর একবার এই সর্পিল গতি শুরু হলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে ঝোঁক’ নেওয়ার কথা বলে আসছেন। যুক্তিটা সরল : যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রকৃত সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন। শিল্পক্ষমতার ব্যাপ্তি, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা এবং জনমিতিক শক্তিতে সে এমন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, যা কোনো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মনোযোগ, অস্ত্রভাণ্ডার, গোয়েন্দা সম্পদ এবং রাজনৈতিক পুঁজি গ্রাস করবে। উপসাগরে মোতায়েন করা প্রতিটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিটি বিমানবাহী রণতরী বহর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপস্থিত রয়ে যাবে। ওয়াশিংটনের মনোযোগ সরে গেলে বেইজিংকে লাভবান হতে একটি গুলিও ছুড়তে হবে না।
সময় ও মনোযোগই হবে তার নীরব মিত্র। ইরাক আক্রমণের আগে, মার্কিন জনগণকে অস্ত্র কর্মসূচির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আজ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক সময়সীমা সম্পর্কে অভিযোগগুলোর প্রশংসাসূচক বক্তব্য নয়, কঠোর যাচাই প্রয়োজন। যখন নেতারা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণের বাইরে গিয়ে হুমকিকে ফুলিয়ে- ফোঁপিয়ে উপস্থাপন করেন, তখন তারা দেশের অভ্যন্তরে আস্থা এবং বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেন। প্রজাতন্ত্রকে এর মূল্য দিতে হয় দুবার। প্রথমে রক্ত ও সম্পদে, তারপর গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ক্ষয়ের মাধ্যমে। বিচক্ষণতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। এটি হলো উপায় ও লক্ষ্যের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সমন্বয়। যদি উদ্দেশ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হয়, তাহলে একজনকে দখলদারিত্ব, পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
যদি উদ্দেশ্য প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে। বিপদটি হলো একটি কৌশলগত সাফল্যকে কৌশলগত সমাধান হিসেবে ভুল করা। শীর্ষনেতাদের হত্যা কমান্ড কাঠামোকে বিপর্যস্ত করতে পারে, সমন্বয় নষ্ট ও দৃঢ় সংকল্পের বার্তা দিতে পারে কিন্তু নিজে থেকে ক্ষমতার অন্তর্নিহিত ভারসাম্যের সমাধান করে না। উচ্চপর্যায়ের মহলে আজকের উল্লাস, ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। আঘাতের পরই কিন্তু শুরু হয় কঠিন প্রতিক্রিয়া। এখন বিশ্ববাজার স্থিতিশীল রাখা, মিত্রদের আশ^স্ত করা, প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা এবং উত্তেজনা বিস্তার রোধ করা যদি সংযম ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে না করা হয়, তবে প্রাথমিক বিজয়োল্লাস দ্রুতই বিবর্ণ হয়ে উঠবে।
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক