কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

হরমুজ প্রণালির সংকটে আমাদের করণীয়

নাসিম আল আওয়াল কবির [প্রকাশ : খবরের কাগজ, ০৩ মে ২০২৬]

হরমুজ প্রণালির সংকটে আমাদের করণীয়

আমাদের এই পুরো ডিজিটাল স্বপ্নটি দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের তলদেশের কিছু কাচের তন্তুর ওপর, যা এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থানে অবস্থিত। তেলের দাম বাড়লে হয়তো আমাদের খরচ বাড়বে, কিন্তু হরমুজ প্রণালির তলায় যদি আমাদের সাবমেরিন ক্যাবল কাটা পড়ে, তবে আমাদের পুরো অর্থনীতি থেমে যাবে। আমাদের এখনই চোখ ফেরাতে হবে সমুদ্রের তলদেশের দিকে, কারণ সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ সুতায় ঝুলছে।...

 

সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কয়েক দিন আগেও যে তেলের দাম ছিল ১২০ টাকা, আজ তা ১৪০ টাকা। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের জ্বালানি তেলের বাজারকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। চারদিকে এখন শুধু দ্রব্যমূল্য আর তেলের দাম নিয়ে হাহাকার। কিন্তু তেলের অপেক্ষায় বসে স্ক্রল করতে করতে আমরা কি একবারও ভেবেছি, আমাদের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের সেই ‘ডেটা’ কোথা থেকে আসছে? আমরা যখন দেশি তেলের দুশ্চিন্তায় মগ্ন, ঠিক তখনই নিঃশব্দে আমাদের ডিজিটাল লাইফলাইন বা ইন্টারনেটের সংযোগটি এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে।

 

 

আমি জাপানের এনটিটি কমিউনিকেশনসে (এনটিটি) প্রায় ছয় বছর সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেম নিয়ে কাজ করেছি। বর্তমানে মাইক্রোসফটের ডেটা সেন্টার অপারেশনে কর্মরত। দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আমি বলতে পারি, বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে তেলের সংকটের চেয়েও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে সমুদ্রের তলদেশে। আমাদের ইন্টারনেটের এই অবকাঠামোটি আসলে কতটা ভঙ্গুর, তা আমাদের সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

 

 

আকাশ নয়, সমুদ্রই আমাদের আসল ঠিকানা
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে, ইন্টারনেট মানেই বুঝি আকাশের কোনো ‘ক্লাউড’ বা স্যাটেলাইট থেকে আসা বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইন্টারনেট কোনো জাদুকরী বেতার তরঙ্গ নয়। এটি হাজার হাজার মাইলের এক বিশাল ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক, যা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিছানো। আমাদের একটি বাগানে ব্যবহৃত হোস পাইপের চেয়েও চিকন কিছু কাচের তন্তু বা তার দিয়ে পুরো পৃথিবী একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও কঠোর। আমাদের আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিকের ৯৯ শতাংশই আসে এই সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে। আমরা মূলত সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ‘সি-মি-উই’ (SEA-ME-WE) ৪ এবং ৫ সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই ক্যাবলগুলোই হলো ডিজিটাল হাইওয়ে, যা কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনকে সরাসরি বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু বিপত্তিটা বেঁধেছে এই হাইওয়ের মানচিত্র নিয়ে।

 

 

হরমুজ প্রণালির ‘চোক পয়েন্ট’
আমাদের ইউরোপীয় বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একমাত্র পথ হলো মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমা। বিশেষভাবে বলতে গেলে, হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) এবং লোহিত সাগর। এই অঞ্চলগুলো এখন আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে মাসব্যাপী। ভৌগোলিকভাবে এই এলাকাগুলো খুবই সংকীর্ণ, যাকে আমরা টেকনিক্যাল ভাষায় বলি ‘চোক পয়েন্ট’।

 

 

বর্তমানে বিশ্বের মোট ডেটা ট্রাফিকের প্রায় ৩৭ শতাংশ এই অঞ্চলের সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জাপানের ডেটা হাব সিঙ্গাপুর হয়ে এই পথেই ইউরোপে যায়। এখন এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি একটি ভুল নোঙর বা ইচ্ছাকৃত কোনো সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে মাধ্যমে এই তারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে? আমাদের ক্যাবল ‘ইন্টারনেট স্লো’ হবে না, বরং পুরো বিশ্ব থেকে আমরা আক্ষরিক অর্থেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারি।

 

বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব কেন এত ভয়াবহ?
জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর হাতে প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে বিকল্প পথ আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে সেই বিলাসিতা নেই। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, তার কয়েকটি দিক একটু খোলাসা করে বলা যাক–

 

 

আমাদের ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতের বিপর্যয়
বাংলাদেশে এখন লাখ লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। তাদের কাজ নির্ভর করে ‘ল্যাটেন্সি’ বা গতির ওপর। যদি হরমুজ প্রণালির ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আমাদের ডেটা ট্রাফিককে অনেক লম্বা পথ ঘুরে বিকল্প রুটে পাঠাতে হবে। এতে ইন্টারনেটের গতি এতই কমে যাবে যে, একজন ফ্রিল্যান্সারের পক্ষে ভিডিও কল করা বা লাইভ সার্ভারে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের এক টুকরো যুদ্ধ আমাদের হাজার হাজার তরুণের আয়ের পথ রাতারাতি বন্ধ করে দিতে পারে।

 

তৈরি পোশাকশিল্পের অচলাবস্থা
আমাদের জিডিপির বড় অংশ আসে আরএমজি বা তৈরি পোশাক খাত থেকে। বর্তমান যুগে পোশাক রপ্তানি মানে শুধু জাহাজ চালানো নয়, বরং বায়ারদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে তথ্য আদান-প্রদান করা। লন্ডন বা প্যারিসের বায়াররা যখন আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না বা পেমেন্ট গেটওয়েগুলো কাজ করবে না, তখন পুরো সাপ্লাই চেইন স্থবির হয়ে পড়বে। তেল না থাকলে ট্রাক চলে না, আর ইন্টারনেট না থাকলে রপ্তানি বা বাণিজ্য চলে না।

 

 

মেরামতের সংকট: একটি ভয়াবহ ছয় মাস
এনটিটিতে কাজ করার সময় আমি নিজে দেখেছি সাবমেরিন ক্যাবল মেরামত করা কতটা জটিল কাজ। এটি কোনো রাস্তার তার জোড়া দেওয়ার মতো সহজ নয়। এর জন্য বিশাল ক্যাবল রিপেয়ার জাহাজ প্রয়োজন হয়। এখন ভাবুন, একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে কি কোনো জাহাজ মেরামতের জন্য যেতে চাবে? কোনো বিমা কোম্পানি সেই জাহাজের গ্যারান্টি দেবে না, কোনো ক্রু তাদের জীবন বাজি রেখে মিসাইল হামলার মুখে সাগরের তলায় তার জোড়া দিতে রাজি হবে না। এর মানে হলো, যদি আজ হরমুজ প্রণালিতে একটি ক্যাবল কাটা পড়ে, তবে তা মেরামত করতে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। এই ছয় মাস বাংলাদেশ কি ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে থাকার সামর্থ্য রাখে? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা।

 

স্মার্ট বাংলাদেশ কি কাচের তন্তুর ওপর দাঁড়িয়ে?
আমরা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ‘SEA-ME-WE-6’ আসার অপেক্ষায় আছি। এতে আমাদের ব্যান্ডউইথ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু রুট তো সেই একই থাকছে। একই বিপজ্জনক পথে আরও বেশি তার বিছানো মানেই কিন্তু নিরাপত্তা নয়। আমাদের প্রয়োজন রুটের বৈচিত্র্য বা ডাইভার্সিফিকেশন।

 

আমাদের এখন থেকেই ইন্টারনেটকে বিলাসিতা নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর জন্য আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন–

 

বিকল্প রুট: ভারতের ওপর দিয়ে স্থলপথে বিকল্প ফাইবার অপটিক কানেকশন আরও শক্তিশালী করা, যা সরাসরি ইউরোপের দিকে যেতে পারে।

 

স্যাটেলাইট ব্যাকআপ: যদিও এটি ব্যয়বহুল, তবু জাতীয় জরুরি অবস্থার কথা মাথায় রেখে আমাদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখা উচিত।

 

আঞ্চলিক সহযোগিতা: সার্ক বা বিমসটেক দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে একটি ‘ডিজিটাল ফেইল-ওভার’ পরিকল্পনা করা দরকার।

 

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নটি খুবই চমৎকার এবং সময়োপযোগী। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের এই পুরো ডিজিটাল স্বপ্নটি দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের তলদেশের কিছু কাচের তন্তুর ওপর, যা এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থানে অবস্থিত। পরেরবার যখন পাম্পে তেলের দামের দিকে তাকিয়ে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়বে, তখন একবার আপনার স্মার্টফোনের দিকেও তাকাবেন। তেলের দাম বাড়লে হয়তো আমাদের খরচ বাড়বে, কিন্তু হরমুজ প্রণালির তলায় যদি আমাদের সাবমেরিন ক্যাবল কাটা পড়ে, তবে আমাদের পুরো অর্থনীতি থেমে যাবে। আমাদের এখনই চোখ ফেরাতে হবে সমুদ্রের তলদেশের দিকে, কারণ সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ সুতায় ঝুলছে–বা বলা ভালো, কাচের তন্তুতে ঝুলছে।

 

লেখক: সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ