ইরান নিয়ে নেতানিয়াহুর ফাঁদে ট্রাম্প
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২১ জানুয়ারি ২০২৬]

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংঘাত চলছেই। নিহতের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। বলার অপেক্ষা রাখে না ইরানে অনেক দিন ধরেই একধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন চলে আসছিল। তার পরও দেশটির সরকার, সেনাবাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইসলামী বিপ্লবের চেতনাই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান, আর তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
গত ডিসেম্বর মাসে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা লিরার ব্যাপক দরপতনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন দানা বাঁধে, তা এক পর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে—এমন হুঁশিয়ারির পর আন্দোলন আরো গতি পায়।
ইরানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক খুব একটা সুখকর নয়। তার পরও তেহরানে হামলার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন অনেকটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন, এমন অবস্থায় এসে সৌদি আরব, কাতার, ওমানের মতো দেশগুলো ইরানে হামলা না চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করে। এই অনুরোধের মূল কারণ কী তা স্পষ্ট না হলেও এটা ধারণা করা স্বাভাবিক যে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এ ধরনের হস্তক্ষেপের ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সরকার পরিবর্তনের সময় হয়ে এসেছে। খামেনি সরকারকে উত্খাতে তিনি এক ধরনের শপথ নিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি, ভেনেজুয়েলায় সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসে তিনি সব কিছুকেই অনেক সহজ মনে করছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে ভেনেজুয়েলা আর মধ্যপ্রাচ্য এক নয়। তা ছাড়া মাদুরোর বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে, যিনি জোর করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। ইরানের পরিস্থিতি সে রকম নয়। সেখানে একটি আদর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সরকারের বিরুদ্ধে যতটা বিক্ষোভ, এই বিক্ষোভের পারদে সব সময়ই ঘি ঢেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
আজকের ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যখন ইরানে বিক্ষোভ দমনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, পশ্চিমা শক্তিগুলো নীরব। একটিবারের জন্যও তারা প্রশ্ন করছে না যে গত ২৭ মাস ধরে ইসরায়েল গাজায় কী করছে? ৭৪ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আজকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানের বিক্ষোভকারীদের শাস্তি দিলে সে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার হুমকি দিচ্ছে। অথচ যখন গাজায় হত্যাযজ্ঞ হচ্ছে, এমনকি একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরও যখন ইসরায়েল প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, যুক্তরাষ্ট্র টুঁ শব্দটি করছে না। আন্তর্জাতিক আইন, রীতিনীতি—সব কিছুকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি তো কদিন আগে বলেই ফেলেছেন যে তিনি কোনো আন্তর্জাতিক আইন মানেন না।
কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানে হামলা পরিচালনার মতো সিদ্ধান্তে আসা খুব সহজ হবে না, এটা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের কিছুটা পেছনে তাকাতে হবে। গত জুন মাসে যখন ইরানের নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান পরমাণু কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা পরিচালনা করেছিল। একই সময়ে ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। শক্তির বিচারে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে যৌথ শক্তির তুলনায় ইরান দুর্বল, তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানোর সামর্থ্য ইরানের রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে হুমকিতে ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ট্রাম্পকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইরানে হামলা পরিচালনার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলোতে হামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলা মানেই সেখানে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা থাকবে এবং দেশটিও ইরানের লক্ষ্যবস্তু হবে। তা ছাড়া সৌদি আরবসহ অপরাপর দেশগুলো এটাও মনে করছে যে আজ ইসরায়েলের উসকানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে হামলার পরিকল্পনা করতে চাচ্ছে, ভবিষ্যতে ইরানে তাদের কর্ম সমাধা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও একই কায়দায় পরিচালিত হতে পারে, যা একটি সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রকেই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়ার নামান্তর।
পরিস্থিতি বর্তমানে যেদিকে ধাবিত হচ্ছে তা থেকে এই আলামত স্পষ্ট যে ইসরায়েলকে দমিয়ে রাখতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। সাম্প্রতিক সময়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালাতে প্ররোচনা দিয়ে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে তিনি যদি এমন হামলা পরিচালনা করে বসেন, তবে এর মধ্য দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন যদিও ঘটে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং বিপর্যকর পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়