কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইরান যুদ্ধে অভাবনীয় ক্ষতি হবে বাংলাদেশের

ড. মো. আইনুল ইসলাম [সূত্র : ইত্তেফাক, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

ইরান যুদ্ধে অভাবনীয় ক্ষতি হবে বাংলাদেশের

wek^ রাজনীতির মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য একটি চিরজ্বলন্ত অগ্নিগর্ত অঞ্চল হিসেবেই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যকার কোনো প্রত্যক্ষ বা সর্বাত্মক সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে, তার আঁচ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গায়ে অভ্যন্ত প্রবলভাবে লাগবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভ-রপ্তানি, আমদানি প্রবাসী আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রত্যেকটিই কোনো না কোনোভাবে মধ্যপ্রাচ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত বর্তমান সময়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা এলএনজির প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর এক প্রকার জীবনমরণ নির্ভরতায় রয়েছে পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড ১০৯টি এলএনজি কার্পে আমলনি করেছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় .৮৭৭.৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এই বিশাল জোগানের সিংহভাগ এসেছে কাতার ওমান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যদি কোনো যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এর প্রথম আঘাতটি আসবে সরবরাহ-শৃঙ্খলের ওপর, যা বাংলাদেশের শিল্প বিদ্যুৎ খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে বিশেষ করে হরমুজ প্রশালি যদি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যাবে, যা আমাদের দেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি পদ্ধতিগত ঝুঁকি বা' 'সিস্টেমিক রিস্ত' হিসেবে আবির্ভূত হবে

 

 

 

হরমুজ প্রণালিকে আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির 'ক্যারোটিড ধমনি' বলা যেতে পারে, কারণ বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়েই পরিবাহিত হয় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের আমদানিকৃত এলএনজির প্রায় ৭৫ শতাংশ কাতার ওমানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি দি চুক্তির আওতায় ভাসে এবং এই পুরো পরিবহন ব্যবসাই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ২০২৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী বংলাদেশ আরো বেশি এলএনজি কার্গো আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় . শতাংশ বেশি এই বর্ধিত চাহিদার মুখে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সংঘাত কেবল সরবরাহকেই বিঘ্নিত করবে না, বরং সামুদ্রিক বিমা এবং জাহাজ ভাড়ার খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, শুধু এক মাসেই কাঁচা তেল আমদানিতে হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে যুদ্ধের ফলে এই খরচ যদি দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়ে যায়, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে অসহনীয় চাপ তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া সাধারণ অর্থনৈতিক কৌশলে সম্ভব হবে না জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব দেশের কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে

 

 

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী স্তন্ত-তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর একটি মরণকামড় দিতে পারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে, যার প্রধান গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ কেবল আমাদের উৎপাদন খরচই বাড়াবে না, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও সংকুচিত করবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাবে, যা সরাসরি আমাদের রপ্তানি আয়ে ধস নামাতে পারে ২০২৫ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় গড়ে . টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে, যার ফলে বছর শেষে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭০ বিলিয়ন টাকায় একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে এই ভর্তুকির ভার অসহনীয় হয়ে উঠবে, যা সরকারকে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতগুলো থেকে বাজেট কাটছাট করতে বাধ্য করবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি করবে, যেখানে উৎপাদন খরচ বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং দেশীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হবে

 

 

অর্থনীতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে এই সংকটকে বিশ্লেষণ করলে রবার্ট কিওছেন এবং জোসেফ নাইয়ের 'আন্তঃনির্ভরশীলতা তত্ত্ব' অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এই তত্ত্ব অনুসারে-বিশ্বায়িত বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো একে অন্যের ওপর এতটই নির্ভরশীল যে, এক প্রান্তের অস্থিরতা অন্য প্রস্তুকে অনিবার্যভাবে স্পর্শ করে বাংলাদেশের জ্বালানি-নিরাপত্তা এখন আর কেবল আমাদের অভ্যন্তরীণ নীতির বিষয় নয়, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে অন্যদিকে, 'জিওপলিটিকস অব এনার্জি ধারণাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেল গ্যাস সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারের একটি দীর্ঘমেয়াদি লড়াই বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যার নিজস্ব শক্তির উৎস সীমিত, এই মহাশক্তির দ্বন্দ্বে খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হলেও এর পরোক্ষ শিকারে পরিণত হয় এই সম্ভাব্য যুদ্ধের সবচেয়ে মানবিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়টি হতে পারে আমাদের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী-আয়ের খাতে

 

 

 

বর্তমানে প্রায় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন, যাদের কষ্টার্জিত অর্থ আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রাপ্ত মোট ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ওমানের মতো দেশগুলো থেকে যুদ্ধের দামামা বাজলে এই দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পরেন বিদেশফেরত এই বিশাল জনশক্তিকে পুনর্বাসন করা এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা একটি জনবহুল দেশের সরকারের জন্য হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে

 

 

সংকট কেবল বৈদেশিক আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা দেশের অভ্যন্তরীণ দারিদ্র্য বিমোচনের গতিকেও থমকে দেবে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাস করে, যাদের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে চাল, ডাল, তেলসহ মৌলিক পণ্যের মূল্য যদি যুদ্ধের প্রভাবে ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত মানুষ চরম খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়বে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এলএনজি তেলের দামের সামান্য ওঠানামায় দেশের মূল্যস্ফীতি ভাবল ডিজিটের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এই হা' নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা অসন্তোষের জন্ম জন্ম দিতে পারে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এই সামাজিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে

 

 

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে এখন থেকেই অত্যন্ত সুদুরপ্রসারী কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এক্ষেত্রে চীনের জ্বালানি নীতি আমাদের জন্য একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে চীন তার বিশাল অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া, আফ্রিকা মধ্য এশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে বাংলাদেশকেও অদূর ভবিষ্যতে কাতারের বাইরে বিকল্প উৎস যেমন রাশিয়া বা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি চুক্তিতে যাওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে ভিয়েতনাম ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো যেভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌর বায়ুবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশকে সেই পথে হাঁটতে হবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৭. বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এলএনজি আমদানিতে, অথচ এই অর্থের একটি অংশ যদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলনে বাপেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যয় করা হতো, তবে আমাদের পরনির্ভরশীলতা অনেক কম হতো স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান জোরদার করা এবং গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করা এখন আর কেবল বিকল্প নয়, বরং সময়ের দাবি

 

 

পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্ভাব্য যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি 'ব্ল্যাক সোয়ান' ইভেন্ট বা অভাবনীয় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিতে পারে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এবং নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারই পারে বিশ্ব রাজনীতির এই অনিশ্চিত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিবেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জাহাজকে নিরাপদে তীরে পৌঁছে দিতে আমরা যদি এখন থেকে সাবধান না হই, তবে দূরদেশের যুদ্ধের অনলে আমাদের সাজানো অর্থনৈতিক বাগানটি ভস্মীভূত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়