‘ইরান যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য দুর্বল হচ্ছে
ড. আশেক মাহমুদ [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ২০ এপ্রিল ২০২৬]

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ ছিল চল্লিশ দিন ধরে। বর্তমানে আপাতত যুদ্ধবিরতি। আমেরিকা-ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ মিশন বাস্তবায়ন করা। ১৯৭৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাহ শাসনের পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ইরানের নতুন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার হামলা চালান। কোনো কাজ হয়নি। এরপর ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেন।
সেই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করেন পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। ৮ বছর ধরে যুদ্ধ চলে। তারপরও যখন কাজ হয়নি, তখন অর্থনৈতিক অবরোধের পথ বেছে নেন যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্ট। প্রায় ৪৫ বছর ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে। তবুও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেনি। আপন সত্তাকে বিকিয়ে দেয়নি। পারমাণবিক হামলার শিকার হয়ে, জাপান যেভাবে রাজনৈতিক স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, ইরান সেই পথে অগ্রসর হয়নি। বরং ইরান নিজস্ব উৎপাদন, প্রযুক্তি আর পদ্ধতির যুদ্ধসরঞ্জাম অর্জনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি ও স্বকীয় রাজনীতির পথ অবলম্বন করেছে। এতে করে আমেরিকার মিশন পরাস্ত হয়।
উল্টো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার মিশনে ইরান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আরব দেশগুলো পেট্রো-ডলার অর্থনীতির ছকে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ফিলিস্তিন ছাড়িয়ে সিরিয়া, লেবাননের দিকে যাত্রা করে। এর বিপরীতে ইরান কতগুলো আঞ্চলিক ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করে। গাজায় হামাস, সিরিয়ায় প্রতিরোধ গোষ্ঠী, ইয়েমেনে হুতি, ইরাকে মিলিশিয়া, লেবাননে হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন বাহিনী ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শক্তিশালী হলে মধ্যপ্রাচ্য দখলদারিত্ব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য জটিল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, অতর্কিত হামলা করে ইরানের সরকার পরিবর্তন করা এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অনুগত শাসক ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
এই রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি হলো কোনো দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে না পারে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি আজ্ঞাবহ ও নির্ভরশীল সত্তা হিসেবে অনুগত থাকে। এই নীতিকে যখন নিয়তি হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে এক একটি দেশ, তখন ইরান পুরো বিশ্বকে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। ইরানের প্রধান নেতাকে (রাহবার) সপরিবারে হত্যাসহ, বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ইরানের মিনাব স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ১৬০-এর অধিক কন্যাশিশু হত্যা করা হয়। তবু ইরান দমে যায়নি।
ইরান শুধু ইসরায়েলে মিসাইল হামলা করেনি। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করেছিল। কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্দানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দেয়। এতে করে ইসরায়েলে ইরানের হামলা সহজতর হয়। এ ছাড়াও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের রাডার সিস্টেমে হামলা করেছিল, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীতে। তারা কোনো হুমকির পরোয়া করেনি। ট্রাম্পের কোনো হুমকিকে আমলে নেয়নি। বরং ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দেশগুলোর জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে পুরো বিশ্বের জ্বালানি-বাণিজ্য বাধাপ্রাপ্ত হলো।
আরব দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের তেল বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ল। প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্র স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কারণ আরব দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের হাব। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে আনার জন্য ইউরোপসহ ন্যাটোর সহযোগিতা চাইল ট্রাম্প প্রশাসন। কেউ তাতে সাড়া দেয়নি। উল্টো রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ফ্রান্স জাতিসংঘে হরমুজ প্রণালি প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ভেটো প্রদান করে। এ ছাড়া ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, স্পেন, সুইজারল্যান্ড অসহযোগিতার বার্তা দিয়েছে। স্পেন বলেছে, আমেরিকাকে ঘাঁটি ও আকাশপথ ব্যবহার করতে দেবে না। এদিকে ইয়েমেন সীমায় অবস্থিত বাবেল মান্ডেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে হুতি।
এই পথ বন্ধ হলে গোটা বিশ্বের তেল বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বয়ংক্রিয় নেতৃত্ব কাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট হবে। এক সময় যেখানে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তই ছিল সমষ্টিগত পশ্চিমা অবস্থান, এখন সেখানে স্পষ্ট দ্বিধা, বিভেদ ও দূরত্ব স্পষ্ট। ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আর বাবেল মান্ডেব প্রণালি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী। হরমুজ প্রণালির চেয়ে বড় অস্ত্র হলো, জনগণের মধ্যকার সক্রিয় ঐক্য। ইরানের শাসনব্যবস্থা বিরোধী একটি অংশ বলছে, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে তারা নিজ দেশের পক্ষে স্থলযুদ্ধে অংশ নিতে প্রস্তুত। ইরানের জনগণের মধ্যে বিরাজমান এমন স্পিরিচুয়াল ঐক্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসী শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। এর কারণ ছিল, কোরিয়া দুভাগে বিভক্ত। রাশিয়াপন্থি উত্তর কোরিয়া আর মার্কিনপন্থি দক্ষিণ কোরিয়া। জনগণের মধ্যে আদর্শিক বিভক্তি হলে বিদেশি শক্তি একটি রাষ্ট্রকে ভেঙে দিতে পারে। ভিয়েতনামের জনগণ দুভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তর ভিয়েতনাম ছিল অনেকটা সমাজতান্ত্রিক আর দক্ষিণ ভিয়েতনাম মার্কিনপন্থি।
ভিয়েতনামের জনগণ ২০ বছর আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। জনশক্তির কাছে হার মেনেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ইরানের মধ্যে উত্তর ইরান, দক্ষিণ ইরান নামে কোনো বিভাজন নেই, রাশিয়াপন্থি-মার্কিনপন্থি ভাগ নেই, আরবপন্থি-ইরানপন্থি ভাগ নেই। ফলে ইরানের জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ়। তাদের ঐক্যকে আরও দৃঢ় করেছে, জাতীয় সংস্কৃতি। মহৎ লক্ষ্য এবং দেশরক্ষার জন্য জীবন দেওয়াকে এতটাই গৌরবের মনে করে যে, আত্মসমর্পণকে তারা অপমানজনক মনে করে। সে জন্য কেউ পালিয়ে থাকে না। বরং অনেক প্রবাসী নিজ দেশে চলে আসে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য। এ ধরনের সংস্কৃতি যে জাতির মধ্যে রয়েছে, সেই জাতিকে যে হারানো সম্ভব না, তা আমেরিকা বুঝেছে। এমন ঐক্যের পাশাপাশি ইরান আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, কৌশলগত জোট এবং ভৌগোলিক প্রভাব ব্যবহার করে পশ্চিমা প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা চাপ তৈরি করেছে। সেই চাপ থেকে ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফার আলোকে পাকিস্তানকে দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছে। যদিও সময় বলে দেবে, এটি সমঝোতার চেষ্টা নাকি বড় আকারে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি-কৌশল। অনেকে ভাবত, কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজে হামলা করা অসম্ভব। এমন দম্ভ চূর্ণ হয়েছে এবারের যুদ্ধে। ‘নিমেষেই ইরানকে পরাস্ত করা হবে’, ‘এক রাতেই ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করা হবে’ এসব হুমকির যেকোনো মূল্য নেই, তা বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছে।
ইরান উল্টো উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত সরকারের পতন ঘটানোর হুমকি দিচ্ছে। এতে আরবের দেশগুলো ভীত হয়ে পড়েছে। আরবের রাজতান্ত্রিক সরকারের পতন হলে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি এজেন্ডা পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। এই চিন্তায় অস্থির হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এমন অস্থিরতা ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পরাজয়ের মুখে। তা ছাড়া ইরানের প্রস্তাবিত দফার ভিত্তিতে যুদ্ধ বন্ধের যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ এই বার্তা দেয়, আমেরিকা-ইসরায়েল কোনো অপ্রতিরোধ্য শক্তি নয়। চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি, ইউরোপের ভেতরে নীতি বিভাজন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস সব মিলিয়ে এক ধরনের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিরোধী ভূ-রাজনৈতিক জোট গঠনের। ইরান, রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ভেনেজুয়েলা, জাপান, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ মিলে নতুন বিশ্বরাজনৈতিক ফ্রন্ট খোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ সেই নতুন মেরুকরণের দিগন্ত উন্মোচিত করছে। এই যুদ্ধ বলছে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-ন্যাটোর কর্র্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। আমরা আশা করব, বাংলাদেশ সরকার বিশ্ববাস্তবতার আলোকে পররাষ্ট্রনীতি সংস্কারে মনোযোগী হবে। আগামী দিনে বিশ্ব ভারসাম্যের পথে অগ্রসর হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়