কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইরান যুদ্ধের খেসারত দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক দিন

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৫ মে ২০২৬]

ইরান যুদ্ধের খেসারত দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক দিন

গত বছরের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কয়েক দফা আলোচনা, পুনরালোচনা অসমাপ্ত রেখেই নতুন করে ইরানে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ৪০ দিন যুদ্ধের পর আবারও যুদ্ধবিরতি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করছে মার্কিন প্রশাসন—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কী অর্জন করতে চাচ্ছে, তা খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এই ৪০ দিনের যুদ্ধ শুরুর সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। যুদ্ধের মাঝপথে যখন দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির তুলনায় যথেষ্ট দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইরান তাদের লড়াকু মনোভাব, যুদ্ধকৌশল এবং সুসমন্বয়ের মধ্য দিয়ে পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ থেকে তখন শোনা গেল, তাঁরা ইরানের আকাশ ও নৌ সক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলেছেন এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডারদের হত্যার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনে তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।

 

 

এ ধরনের কথার মধ্য দিয়ে কার্যত একজন পরাজিত মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিকটিই ফুটে ওঠে। অবশ্য এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, বিরতিতে রয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় এর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার মতো অবস্থাও সৃষ্টি হয়নি। তবে ট্রাম্পের অস্থিরতা, মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, অন্যায়ভাবে হুমকির পর হুমকি এবং আলোচনার মাঝপথে শর্ত বেঁধে দেওয়া—এই সবকিছুই এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে যথেষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 

ট্রাম্প যে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাপর প্রেসিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি ইসরায়েলপন্থী—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 
 
 
 

 

ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বারবার হুমকি বলে এলেও ইসরায়েলের কোনো অপকর্মই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অপকর্ম বলে মনে হচ্ছে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁর সমর্থন একচুলও নড়চড় হয়নি।

 
 

 

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং এই সময়ের মধ্যেও কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় এর মেয়াদ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে একটি চুক্তির মাধ্যমে মুখ রক্ষা করে এই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার প্রবণতাই ফুটে উঠছে। ইরান এ ক্ষেত্রে অনেকটা কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় আর বিশ্বাস করতে চায় না। অতীতে আলোচনার নাম করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে তারা হামলা চালিয়েছে, ইসরায়েলের পরামর্শই প্রাধান্য দিয়েছে। সে জন্য তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের ঘাঁটিগুলোকে তুলে নিতে হবে; যুদ্ধের ফলে ইরানে যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে—এ রকম আরো কিছু শর্ত রয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুদ নিজেদের কাছে নিতে চায়, যা ইরান কোনোভাবেও মানতে চায় না।

 

এমন অবস্থায় এই আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে কী দাঁড়াতে পারে এমন শঙ্কা থেকেই যায়। তবে এখানে আশার কথা হচ্ছে, প্রথম দফার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের অনুরোধে (যুক্তরাষ্ট্র এমনটাই বলছে) একটি চুক্তি স্বাক্ষরের স্বার্থে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে এটি নিয়ে এককথায় ইসরায়েলের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। গত ২৪ এপ্রিল দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও আক্রমণ করতে প্রস্তুত ইসরায়েল, তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবুজ সংকেত’-এর জন্য অপেক্ষা করছে। এই সবুজ সংকেত বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এটিই বোঝানো হচ্ছে যে ইসরায়েল এযাবৎকালে মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু করেছে, এর সবকিছুর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছিল।

 

 

ইরান যুদ্ধের পরিণতি কী হবে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তাঁর নিজের পরিণতিকে নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন। কেবল নিজের জন্যই নয়, দল এবং দেশের জন্যও তিনি নতুন কলঙ্ক যুক্ত করেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে সে দেশের তেলসম্পদের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের অবস্থানকে অনেকটা মজবুত করে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন এবং ধারণা করেছিলেন যে নেতানিয়াহুর পরামর্শে ইরানে সরকার হটিয়ে নিজেদের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে চমকে দেবেন। তিনি ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে যতটা দুর্বল ভেবেছিলেন, তারা যে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বরং দেশের মানুষের কাছে এই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বৃদ্ধি পাবে—এটি ছিল তাঁর কল্পনার অতীত।

 

 

এ বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি কার্যত তাঁর ভাগ্যের লিখন লিখে ফেলেছেন। এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নিয়ে তিনি কার্যত ন্যাটো থেকেও অনেকটা সরে এসেছেন। ইরান যুদ্ধে ন্যাটোর নিষ্ক্রিয়তা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের সমর্থনহীনতা এবং সর্বোপরি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিপক্ষে সমর্থন আদায়ে ব্যর্থতা তাঁকে কার্যত নেতানিয়াহুর মতোই একজন যুদ্ধাপরাধীতে পরিণত করেছে। সামনের দিনে তাঁর বিরুদ্ধেও যদি আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা এই যুদ্ধে তিনিও ইরানে অনেক বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন এবং কথায় কথায় ইরানের সভ্যতাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

 

একটি সভ্যতাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া বলতে ট্রাম্প প্রকারান্তরে পারমাণবিক বোমার ব্যবহারের বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করেছেন, যদিও পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কার কথা তিনি নাকচ করেছেন। আগামী দিনে তিনি আর প্রেসিডেন্ট থাকবেন না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে এই ইমেজ সংকটের দায় বহন করতে হবে অনেক দিন পর্যন্ত।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়