কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইরানে আক্রমণ : বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ভয়ংকর প্রভাব

আহসান রাজীব বুলবুল কানাডা থেকে [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৭ মার্চ ২০২৬]

ইরানে আক্রমণ : বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ভয়ংকর প্রভাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সমর্থন করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা পিয়েরে পলিভিয়ের। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-কেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্ক কার্নি এবং মন্ত্রী আনন্দ বিবৃতি দিয়েছেন। তারা ইরানে অবস্থানরত সব কানাডিয়ান নাগরিককে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর অঞ্চলে বসবাসরত কানাডিয়ানদের স্থানীয় পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের সঙ্গে ক্যানবেরায় একত্রে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্ক কার্নি বলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা যায় না। এর আগে মার্ক কার্নি অবশ্য বলেছিলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। তবে তিনি এ কথাও বলেছিলেন, কানাডা তার মিত্রদের পাশে থাকবে। আমরা সর্বদা কানাডিয়ানদের রক্ষা করব।

 

কানাডার সাধারণ জনগণ মনে করছেন, চলমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সারা বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেভাবে পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে, তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে এটা এক ধরনের সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ। তারা বলছেন, এ সংঘাত যদি চলমান থাকে, তবে বিশ্ববাজারে করোনা মহামারীর পর তৃতীয়বারের মতো পণ্য মূল্যবৃদ্ধির বড় ধরনের ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। আর তা হলে, গোটা বিশ্বকেই ভুগতে হবে।

 

 

 ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ জেমস মিডওয়ের নিবন্ধে বলা হয়েছে ‘ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বায়ন হুমকির মুখে পড়েছে। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বায়নের ওপর ভিত্তি করে যে অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছে, তা বর্তমানের ভেঙে পড়া বিশ্বায়নের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। কারণ, বিশ্ব অর্থনীতি বা বিশ্বায়নের নিবিড়ভাবে বোনা জালের মতো কাঠামোর কারণে কিছু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দুতে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়েছে।’ একে অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘চোক পয়েন্ট’ বা ‘চাপবিন্দু’। এই চাপবিন্দু দিয়ে মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ সরু পথগুলোকে বোঝানো হয়েছে, যেখান দিয়ে অধিকাংশ পণ্য, মানুষ ও কাঁচামাল আনা-নেওয়া করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মালাক্কা প্রণালী, পানামা খাল, ইয়েমেন ও ইরিত্রিয়ার মাঝের বাব এল-মান্দেব প্রণালী এবং হরমুজ প্রণালী। এর মধ্যে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে চীনের আমদানি করা তেলের ৮০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে, এশিয়া ও ইউরোপের আমদানির ৪০ শতাংশের বাণিজ্য পথ বাব এল-মান্দেব প্রণালী। আবার বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের বাণিজ্য পথ হচ্ছে, হরমুজ প্রণালী। ফলে যখন কোনো কারণে এসব সরু পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়, তখন পুরো বিশ্বের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামে। আর বর্তমানে সেটাই হচ্ছে।

 

 

 


ইরান যুদ্ধের কারণে বর্তমানে আরব উপদ্বীপের দুই পাশে অবস্থিত বাব এল-মান্দেব এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ। সামরিক হুমকির পাশাপাশি আর্থিক খাতের ঝুঁকি এ সংকটকে আরও জটিল করেছে। বড় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের উপক্রম। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌবাহিনী ও বীমা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নিবন্ধে আরও বলা হয়, আমরা এখন অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির শুরুর দিকে আছি। এরইমধ্যে ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। আমদানিতে আগের অর্ডার এবং মজুদের কারণে এখন সাধারণ মানুষ কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও আসছে জুলাই মাসে জ্বালানির দাম বিশাল আকারে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ১৫ শতাংশ খাদ্যশস্য পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীতে বর্তমান অবরুদ্ধ।  ফলে শিগগিরই যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোতে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে। এ সংকট থেকে উত্তরণে এখনই দেশগুলোকে আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে চেষ্টা করতে হবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের।

 

 

 


অন্যদিকে,  চলমান সামরিক হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের শিক্ষক এড হির্স। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা তেলের অর্ধেকও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তেলের দাম এক সময় প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে উঠে যেতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করা ট্যাংকারগুলোকে আর পাহারা দিতে না পারায়, এমন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’ হির্স বলেন, ‘এলএনজি বাজারে আমরা এরই মধ্যে প্রভাব পড়তে দেখছি। প্রথম দিনেই দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত সোম ও মঙ্গলবারের মধ্যে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ডিজেলের দামও অস্বাভাবিক বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাসনির্ভর দেশগুলো এখন পেট্রোলিয়াম মজুদ করতে শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্ডারেও প্রভাব ফেলছে।’ হির্স সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে এই পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়বে। এমনটা ঘটলে অভ্যন্তরীণভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে, বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে।’

 

 

সভ্যতা আজতৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কম্পমান। সারা বিশ্বে যুদ্ধবাজদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সাধারণ নিরীহ মানুষদের আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যুদ্ধ এখন জল ও স্থলের সীমানা ছাড়িয়ে আকাশ, গ্রহ ও উপগ্রহে। রাডার ফাঁকি দিয়ে মানুষ এখন উপগ্রহ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গোয়েন্দাগিরি চালায়। দূরপাল্লার মিসাইল, আণবিক যুদ্ধজাহাজ, ভয়ংকর সব যুদ্ধ বিমান প্রস্তুত সভ্যতাকে ধবংসের জন্য। একটি মাত্র সুইচ টিপলে কয়েক হাজার মাইল দূরের একটি সভ্যতা নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।