কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইরানে হামলার প্রভাব কী হতে পারে

আবিদ আজাদ [সূত্র : কালবেলা, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

ইরানে হামলার প্রভাব কী হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দুই দেশকে এমন এক বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে সামান্য একটি ঘটনাই বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ সামরিক শক্তি জড়ো করা এবং সমস্যার সমাধানে শক্তি প্রদর্শন বা ‘গানবোট কূটনীতি’র ওপর নির্ভরতা যুদ্ধের ঝুঁকি স্পষ্টভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ধরনের কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চল গ্রাস করতে পারে এবং এর প্রভাব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, এখন সময় এসেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার। এর পরপরই তার প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করে। এর অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের একটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী, এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়।

 

 

এ সামরিক মোতায়েনের মধ্যে ছিল অতিরিক্ত থাড (THAAD) ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা মূলত আকাশপথে আসা হামলা প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এসব পদক্ষেপ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বেড়ে যায়।

 

 

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে সম্মত না হয়, তাহলে ‘পরবর্তী হামলা হবে গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো মার্কিন হামলার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ’। এ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অনুকূল বা কাঙ্ক্ষিত চুক্তির অর্থ হলো, ইরানকে সম্পূর্ণভাবে তার পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ধ্বংস করতে হবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পরিত্যাগ করতে হবে এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তার আঞ্চলিক প্রভাব ও তৎপরতা কমিয়ে আনতে হবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর দাবি, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের গভীর অবিশ্বাস—এ দুই মিলিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 
 
 

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি গত সোমবার স্পষ্ট করে জানান, বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা, পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি—এ বিষয়গুলো ইরানের জন্য ‘রেড লাইন’, অর্থাৎ এমন সীমা, যা কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাবে না। এসব বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।

 
 

তবে এর অর্থ এই নয় যে, কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বা চিরস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ দাবিগুলোকে দেখে সম্ভাব্য ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। এ ধারণা বারবার তুলে ধরেছেন ট্রাম্প নিজে, পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কট্টরপন্থি নীতিনির্ধারকরাও।

 

 

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়, তাহলে তেহরান সেটিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখবে। এমন পরিস্থিতিতে সংযম দেখানোর বা উত্তেজনা কমিয়ে রাখার জন্য ইরানের আর কোনো বাস্তব অবস্থা থাকবে না, যা পুরো অঞ্চলকে আরও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

 

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব মূলত নির্ভর করবে সেই হামলার ধরন, ব্যাপ্তি এবং কোন কোন লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করা হচ্ছে তার ওপর। এ ধরনের হামলা ইরানের ভেতরে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এবং এমনকি বৈশ্বিক পর্যায়েও একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

 

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত সীমিত, নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযানের পক্ষে। এমন অভিযান ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা (লিডারশিপ ডিক্যাপিটেশন) এবং একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সামরিক ঘাঁটি, বাসিজ বাহিনীর ইউনিট (আইআরজিসির অধীনে থাকা একটি আধাসামরিক বাহিনী) এবং পুলিশ স্টেশনগুলোতে বড় ধরনের ক্ষতিসাধনের উদ্যোগ থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এসব বাহিনীকেই বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর জন্য দায়ী বলে মনে করে।

 

 

সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে কোনো প্রচেষ্টা দেশটির অভ্যন্তরে ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনবে। ইরানের ভেতরে এমন হামলা ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে এটি আইআরজিসির পূর্ণক্ষমতা দখলের পথ খুলে দিতে পারে। এমনকি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সূচনাও ঘটাতে পারে।

 

 

গত বছরের মতো হামলা হলে অনেক ক্ষেত্রেই ইরানি জনগণ জাতীয় পতাকার নিচে একত্রিত হতে পারে এবং শাসন পরিবর্তনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইরানি জনগণ সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার দৃশ্য নিয়ে গভীরভাবে আতঙ্কিত। দ্বিতীয়ত, ইরানে এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য মধ্যপন্থিবিরোধী শক্তি নেই যারা বাস্তবসম্মতভাবে নেতৃত্ব দিয়ে পরিবর্তন আনতে পারে। তৃতীয়ত, দেশটিতে এখনো শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি বিদ্যমান।

 

 

যদি কোনো হামলায় ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তাহলে উত্তরাধিকার সংকট তৈরি হতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে শূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। যেহেতু কঠোর সামরিক শক্তির বড় অংশ আইআরজিসির হাতে কেন্দ্রীভূত, তাই সামরিক শাসনকেন্দ্রিক একটি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য দেশটিতে গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা, যেমন টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ, ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানান। এ প্রবণতা সহজেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দিকেও গড়াতে পারে। ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে এমন একাধিক গোষ্ঠীর দিকে যুক্তরাষ্ট্র হাত বাড়াতে পারে।

 

 

এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে), যাকে একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল; কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (পিজাক), একটি সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠী যারা ইরানের পশ্চিম কুর্দিস্তান প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়; আল-আহওয়াজিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমের তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশ আলাদা করার পক্ষে থাকা একটি আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন; জাইশ আল-আদল (বা জুন্দাল্লাহ), যা দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে সক্রিয় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্যান-তুর্কিক গোষ্ঠীগুলো, যারা তুরস্ক, আজারবাইজান ও ইরানের তুর্কি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জোট গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

 

 

ওয়াশিংটনের ক্রমাগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং অতীতে বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) রেকর্ডের মুখে ইরান একটি তথাকথিত ‘ম্যাডম্যান স্ট্র্যাটেজি’ বা অনিশ্চিত কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক দুই ধরনের বার্তা দেওয়া। একদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার একটি কাঠামো তৈরিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি সোমবারের এক ভাষণে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা হলে তা একটি ‘আঞ্চলিক যুদ্ধে’ রূপ নেবে। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যে কোনো মূল্যে সরকার টিকিয়ে রাখাই ইরানের প্রধান লক্ষ্য।

 

 

ইরান পরিষ্কার করে জানিয়েছে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দেবে। এ জবাব শুধু সরাসরি নাও হতে পারে, বরং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের মিত্র ও সহযোগী শক্তিগুলোর মাধ্যমেও হতে পারে। এতে করে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোও একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যাবে এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা আরও গভীর হবে। এর ফল হিসেবে বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ব্যাপকভাবে পুঁজি বা বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপের দিকে শরণার্থী ও অভিবাসীর প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

 

 

আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা চালায় বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এতে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে এবং বিশেষ করে দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো আরও চাপে পড়বে। এসব অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত অভিবাসন ও শরণার্থী সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

 

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখায়, একবার কোনো সংঘাত শুরু হলে তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের মতো পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করে ফেলে। এ ধরনের সংঘাতের ফল সাধারণত অনিশ্চিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যার প্রভাব বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতেও পড়ে।

 

লেখক: আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ