কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইসরায়েলের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের পাশে কে

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০২ মার্চ ২০২৬]

ইসরায়েলের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের পাশে কে

মাত্র কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তিতে দ্রুত সম্মত হতে ইরানকে দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনাকে আশাব্যঞ্জক জানিয়ে দ্রুতই দুই পক্ষ একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন। তবে একই সময়ে ইরান সত্বর কোনো চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে সেখানে সীমিত পরিসরে হামলা চালানো হতে পারে এবং সেই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরানের পক্ষ থেকেও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পথে তাঁরা অনেকটাই এগিয়ে গেছেন বলে জানানোর পর হঠাৎ ইসরায়েলের দিক থেকে ইরানে হামলা এবং সেই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানোর পর একটি সিদ্ধান্তেই আসা যায়, আর তা হচ্ছে ইরানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসলে যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইসরায়েলের পক্ষ থেকেই নেওয়া হয় এবং এই বিষয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

সীমিত পরিসরের নয়, বৃহত্তর পরিসরেই হামলা চালানো হলো ইরানে, আর সেই হামলাটি পরিচালিত হয়েছে ইসরায়েলের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে এটিই প্রমাণিত হয়, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এত দিন ধরে আলোচনার নামে এক ধরনের নাটক মঞ্চায়ন করে গেছে। ইসরায়েলের দিক থেকে এই আলোচনায় তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার হুমকি শূন্য করার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আসছে না, বরং একটি সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে কেবল ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে সম্মত এবং তা কোনোভাবেই ভবিষ্যতে ইরানকে পরমাণু শক্তিতে পরিণত হওয়া থেকে একেবারে নিষ্ক্রিয় রাখতে সক্ষম নয়, এমনটি দৃশ্যমান হওয়ার পরই এই হামলা। যুক্তরাষ্ট্র যেন এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ক্রীড়নকে পরিণত হলো! ইসরায়েলের ভয় ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা গত বছর জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় নিখুঁতভাবে আক্রমণ চালিয়েছিল।

 

 

 

 
 

 

এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, ইরানে বর্তমান শাসনকাঠামো, যা বরাবরই ব্যাপকভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী। এই শাসনকাঠামোর অবসানের লক্ষ্যেই গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল এবং ধারণা করা যায় যে সে সময়ে তাদের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। এবার অনেকটাই রাখঢাক না করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি সমাবেশ এবং এর আগে-পরে ইরানের ভেতরে শাসনব্যবস্থাবিরোধী জন-আক্রোশকে উসকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে একটি সফল হামলা পরিচালনার জন্য ছক কষা হয়।

 

 

 

 
 

 

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইরানের শত্রুরা ইরানের ভেতরেই রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সক্ষমতার মধ্য দিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়েই তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

 

 

 
 

 

ইরানে হামলাকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন লায়ন’স রোর’ বা ‘সিংহের গর্জন’। নামটির মধ্যেই এক ধরনের ভীতি রয়েছে। যেভাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে এই হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে তাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত করে ইরানে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের জুন মাসের যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে, একইভাবে ইসরায়েলের ভেতরও অনেক দিন ধরেই নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ চলমান। এই হামলা তাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। উভয় দেশই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবার সফল হতে না পারলে দেশের ভেতর তাদের সরকারের সক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে প্রশ্নের মধ্যে পড়বে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকজন সিনেটর ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সময়ে ‘জনগণের নিরাপত্তা’ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা এটিকে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার পাওয়ারস’ অ্যাক্ট লঙ্ঘিত হচ্ছে জানিয়ে তাঁরা এটিও বলেছেন যে যুদ্ধ ঘোষণা এবং যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে সরকারের অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

 

 

ট্রাম্প জনগণের নিরাপত্তার কথা বলছেন, অথচ একের পর এক জন-আকাঙ্ক্ষাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নামক স্লোগানকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তিনি সাংঘাতিকভাবে আমেরিকাবিরোধী করে তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিমত্তাকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা কারো নেই এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক বিরাজ করছে জানার পরও তাঁর একতরফাভাবে, ন্যক্কারজনকভাবে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন যেন তাঁকে এক স্বেচ্ছাচারী শাসকের প্রতীকে পরিণত করেছে।

 

 

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বলতে এখন পর্যন্ত চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এই হামলা চালানোর বিষয়ে নিন্দা জানানো হয়েছে। বাস্তবিক অর্থে ইউক্রেনকে সমর্থন দান থেকে নিজেদের বিরত রেখে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সেখানে ভূখণ্ড বিস্তারে ব্যস্ত রেখেছে, আর চীন বরাবরই অন্য কোনো দেশের স্বার্থে যুদ্ধে জড়িত হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে তুরস্ক এই হামলার নিন্দা জানালেও এটি রোধ করার মতো সামর্থ্য তার নেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার ঐক্য বযরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্মিলিত এবং একতরফাভাবে যে হামলা পরিচালনা করছে, সেটি রোধ করে উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্য এই মুহূর্তে ইরানের নেই।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়