ইশতেহারে ভোটার কী চান?
শেখ রফিক প্রকাশ [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬]

আর ২৬ দিন পর নির্বাচন। অথচ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত জনগণের সামনে তাদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেনি। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই কোনো কোনো দল ইশতেহার প্রকাশ করবে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কে কী করবে, কোন নীতিতে দেশ চলবে, জনগণের জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে- এসব বিষয় বিএনপি ছাড়া আর কোনো দলই এখনো স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ১১ কোটিরও বেশি। আর মোট ভোটার, ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও সুযোগের বাইরে।
দেশে প্রায় দেড় ১ কোটি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক, ২ কোটি ৩০ লাখ কৃষিশ্রমিক এবং আরও প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ অন্যান্য পেশাজীবী মানুষ আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এক-চতুর্থাংশ পূর্ণকালীন কাজ পাচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজের প্রায় ৪৭ শতাংশ বেকার। শিল্প-কারখানা বন্ধ, শোষণমূলক অর্থনীতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছে। আবার এই তরুণ ভোটারই সোয়া ৪ কোটি। এই বাস্তবতায় জনগণ এমন নির্বাচনী ইশতেহার চায়- যার মূল ভিত্তি হবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন এবং নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। যেখানে গুম-খুন, ধর্ষণ থাকবে না, যেখানে ভোটের দিন মানুষ আতঙ্ক নয়, আশা নিয়ে কেন্দ্রে যাবে এবং যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভ জনগণের অধিকার ও মর্যাদাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কাজ করবে। শিক্ষা হোক সবার জন্য, স্বাস্থ্যসেবা হোক নাগালের মধ্যে, শ্রমিকের মজুরি হোক ন্যায্য, কৃষকের ফসলের দাম হোক নিশ্চিত।
নদী, খাল ও জলাধারের উদ্ধার, পুনর্বাসন, বিস্তৃত খনন ও পরিচর্যা কর্মসূচি গ্রহণ, যাতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব হয়। দক্ষিণাঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় সম্প্রদায়কে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে সাহায্য করা হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল খাদ্য, ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং পানিদূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা ইশতেহারের বাধ্যতামূলক অঙ্গ হতে হবে। কারণ ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫,০২৪ জনের, আর ২০২৪ সালে প্রায় ৮,৫৪৩ জনের। বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও নৌযানের শ্রমিকরা দিনরাত কাজ করেন, কিন্তু দুর্ঘটনায় মারা গেলে পরিবার ন্যূনতম ক্ষতিপূরণও পায় না। ফিটনেসবিহীন যান, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও মালিকানাভিত্তিক রাজনীতি তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ অনার্স-মাস্টার্স পাস করেও বেকার। সীমিত চাকরি, প্রশ্নফাঁস, ঘুষ ও দলীয়করণের কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে দুর্নীতির চক্রে ঢুকে পড়ছে। জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ২০-২৫ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন।
প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে। সার, বীজ, সেচ ও ন্যায্যমূল্যের সংকটে কৃষক সর্বদা লোকসানে থাকে। জনগণ চায়, কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, কৃষিঋণ হবে সহজ ও সুদমুক্ত, এবং কৃষক আত্মহত্যা নয় মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে কাজ করেন ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক, যার ৮০ শতাংশ নারী। ২০২৩ সালে মজুরি বাড়লেও মজুরি ১৪,৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে শ্রমিকদের দাবি ছিল ২৩-২৫ হাজার টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে এই মজুরি অমানবিক। দেশে ১৬৭টি চা-বাগানে প্রায় ১.৪ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকার নিচে, আবাসন সংকট প্রকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর। নারী চা-শ্রমিক সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স জিডিপির ৭-১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী শ্রমিক প্রায় দেড় কোটি, এর মধ্যে ১৫ লাখ নারী। তারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কম। দেশে নিবন্ধিত নার্স ১,০১,২৭০ জন, অথচ প্রয়োজন ৪,২০,০০০। সংকট ৭৩.৭৪ শতাংশ। ৮৬ শতাংশ নার্স অনুপযুক্ত পরিবেশে কাজ করেন এবং ৭০ শতাংশ পদোন্নতি পান না। নার্সের পাশাপাশি ওয়ার্ডবয়, আয়া, টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব সহকারীরা মহামারী ও সংকটে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত নিম্ন। প্রতিবন্ধীর সংখ্যা এক হিসাবে ৪৬ লাখ, আরেক হিসাবে ২৩ লাখ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতে ৩৩ লাখ। এই বিভ্রান্তিই রাষ্ট্রীয় অবহেলার বড় প্রমাণ।
৯৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী বৈষম্যের শিকার। সারা দেশে ১৮-২০ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে, শুধু ঢাকায়ই ৬.৫-৭ লাখ। পুনর্বাসন প্রকল্প থাকলেও তা অপ্রতুল। দেশের ১২-১৫ লাখ পরিবার কুটিরশিল্পে জীবিকা নির্বাহ করে। কামার, কুমার, তাঁতি, বেতশিল্পী, স্বর্ণকার- এরা সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ধারক। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থার অভাবে তারা পিছিয়ে পড়ছে। দেশে ৩.৫-৪ মিলিয়ন জেলে রয়েছেন, যারা বছরে প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ আহরণ করেন। নদী, হাওর ও সমুদ্র সবখানেই জেলেরা আছেন, কিন্তু নেই সামাজিক নিরাপত্তা।
সরকারি হিসাবে ৫০টির বেশি এবং গবেষকদের মতে ৭০টিরও বেশি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এখানে বসবাস করে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা ৩০-৪০ লাখ। ২০১০ সালের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ ভাষা ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি দেয়নি। চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, ম্রো, রাখাইন, মনিপুরীসহ বহু জনগোষ্ঠী আজও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার। ঢাকা শহরের ৩৬৬টি বাস রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার ভাসমান ফেরিওয়ালা পণ্য বিক্রি করে জীবিকা চালান। তাদের গড় আয় ৮,০০০-২০,০০০ টাকা। কিন্তু তারা নিয়মিত উচ্ছেদ, মারধর ও হয়রানির শিকার। গার্মেন্টস, চা-বাগান, গৃহকর্ম, হকারি ও নার্সিং- সবখানেই নারী শ্রমিক রয়েছেন। কিন্তু মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও পদোন্নতিতে তারা পিছিয়ে। চা-বাগানে মাতৃমৃত্যুর হার বেশি, গার্মেন্টসে যৌন হয়রানি প্রচলিত। জনগণ চায় এমন ইশতেহার, যেখানে নারী শ্রমিক উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত। হাজার হাজার যৌনকর্মীর বাসস্থান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নেই।
ঢাকা শহরেই ৩-৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। শিক্ষা ও সুরক্ষা না পেয়ে তারা অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা কম বেতন ও মর্যাদাহীনতায় ভুগছেন। শিল্পীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পান না। ফলে জনগণ চায় এমন ইশতেহার- যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সবাই সমান মর্যাদা ও সুযোগ পাবে। আজও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার অবস্থা ভয়াবহ। ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত হয়নি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নেই, দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবন বিপন্ন। কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসনের কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। গ্রামীণ শিশু ও যুবক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। জনগণ চায় এমন ইশতেহার, যেখানে এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনা থাকবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক