কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ঝঞ্চাগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্য: বাংলাদেশের শান্তি বার্তা

মোস্তফা কামাল [প্রকাশ : ইত্তেফাক, ০৬ মার্চ ২০২৬]

ঝঞ্চাগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্য: বাংলাদেশের শান্তি বার্তা

ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধের রেশে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিই পড়ে গেছে হুমকিতে। উপকারভোগী হিসেবে এ হুমকির শরিক বাংলাদেশও। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ঝঞ্চায় কেবল স্বজন-পরিবার নয়, সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য উদ্বিগ্ন সরকারও।

 

 


পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, পররাষ্ট্রসচিবসহ সরকারের দায়িত্ববানরা নিয়মিত কথা বলছেন তেহরানে বাংলাদেশ মিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। মিশনের স্থাপনা, কূটনীতিক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ইরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে চেষ্টাও করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সমস্যা কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা ও করণীয় নিয়ে তিনি হাই-প্রোফাইল আলোচনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ তার অ্যাসোসিয়েটের সঙ্গে।

 

 

মধ্যপ্রাচ্য-সংকটে তেলের বাজারের প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না বলে আশাবাদী পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। আশাবাদ শোনা কষ্টকাতরদের জন্য স্বস্তির। কিন্তু, বিশ্ববাস্তবতা হচ্ছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ও বহুমুখী ক্ষতিতে পড়বে। বাংলাদেশের চাহিদার বেশির ভাগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজি। আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি পুরো অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে। আবার প্রবাসীদের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকায় রেমিট্যান্স কমবে। এতে সংকুচিত হবে অর্থনীতি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে তেলের দাম না বেড়ে পারে না। বিশ্বের ৩ শতাংশ তেলের সরবরাহক দেশ ইরান।

 

 


মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য দেশে বাংলাদেশের প্রচুর জনশক্তি রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন দেখা দেবে। সেক্ষেত্রে লাগবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনাও। এ যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। সেখানে বড় অস্থিরতায় প্রবাসী শ্রমিকরা। ভাগ্যিস রুশ-ইউক্রেনে মধ্যপ্রাচ্যের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক ছিল না, কিন্তু, যুদ্ধে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে, তা ঐ যুদ্ধের পূর্বাপরে দেখা গেছে। ২০২২ সালে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ এখনো সইতে হচ্ছে। রুশ-ইউক্রেনের চেয়ে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশি গভীর। ঐ সব দেশ থেকে তেল আনতে হয়। অনেক পণ্য রপ্তানি করতে হয়।

 

 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় সংঘাত শুরুর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পরদিন শনিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টা ক্রুড ও মারবান ক্রুডের দাম ছিল ৭৩ থেকে ৭৪ ডলার। এখন তা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যকে টালমাটাল করে দিতে পারে।

 

 


ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য তুলনামূলক কম হলেও বর্তমান যুদ্ধে পরোক্ষ ক্ষতি অনেক বেশি। তবে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও আগামী জুন পর্যন্ত দেশের জ্বালানি আমদানিতে তাৎক্ষণিক শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। সরকার টু সরকার চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চুক্তি সম্পন্ন রয়েছে। বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে-চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিংগাপুর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে।

 

 

 অপরিশোধিত তেল আসছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অতীতে এসব চালান মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে এলেও এখন বিকল্প সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি রাখা হয়েছে। বছরে বিকল্প রুটে আনার প্রস্তুতি রয়েছে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব হিসাব ও ধারণা পালটে যাবে। আন্তর্জাতিক দামের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ। বিপিসির হাতে ৩০ দিনের কৌশলগত মজুত রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন করা হয়।

 

 

 

আমদানি প্রিমিয়াম আগেই নির্ধারিত থাকায় তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ পড়ছে না। তবে স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে ভবিষ্যৎ চালানে ব্যয় বাড়বে। সংঘাত দীর্ঘ হলে জাহাজ চলাচলে বিমাব্যয় বাড়বে, পরিবহন সময় দীর্ঘ হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। যা সরাসরি দামে প্রভাব ফেলবে। জ্বালানি তেলের আপাতত সংকট না হলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি ব্যাহতের শঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজির প্রায় পুরোটাই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে।

 

 

 ইরান-সংকট দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকেত পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ যে পণ্য রপ্তানি করে, সেগুলোর পরিবহনেও ব্যয় বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা-যাওয়া করা জাহাজের ভাড়া কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব নতুন বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে সেই বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। চলতি বছর দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৬৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।

 


এই জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়। কৃষি, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহন এই তেলের প্রধান ভোক্তা।

 

 

 

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কারখানা পরিচালনার খরচ বাড়বে। আগে লোহিতসাগর-সংকটে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে পণ্য পাঠাতে খরচ এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছিল এবং সময় লেগেছিল দুই থেকে তিন সপ্তাহ বেশি। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। যেখানে আমদানি করেও চাহিদা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বর্তমানে দেশীয় উৎস থেকে আসে দৈনিক ১৭১ কোটি ঘনফুট আর আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ১৮ থেকে ১৯ মিলিয়ন ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যকে টালমাটাল করে দিতে পারে।

 

 

বাংলাদেশ বরাবরই শান্তিকামী, যুদ্ধবিরোধী। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক করে বাংলাদেশ বলেছে, এই শত্রুতা চলতে থাকলে তা কেবল আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করবে। তাই বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং মতপার্থক্য নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ আশা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হবে। পুরো অঞ্চল জুড়ে ফিরবে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা।

 

 

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট