কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি

মুসা আল হাফিজ [সূত্র : ইনকিলাব, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬]

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্নিহিত দর্শন কী? সেটা হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। সম্পর্ক হবে সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের স্লোগান নয়; বরং এটি এক রাষ্ট্রদর্শন। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে। প্রথমত, বন্ধুত্বকে কূটনৈতিক খোলামেলা মনোভাবের মাধ্যমে উপলব্ধি করা হয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে : ক. বৈরিতার অনুপস্থিতি, যা সংঘাত এড়ানোর বাস্তববাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। খ. শর্তযুক্ত বন্ধুত্ব, যা সার্বভৌমত্বের উপর নির্ভরশীল নৈতিক সীমার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎÑ বন্ধুত্ব কোনো চরম মান (ধনংড়ষঁঃব াধষঁব) নয়; বরং শর্তাধীন মান (পড়হফরঃরড়হধষ াধষঁব)। গ. সেই শর্তগুলো হলো : সম্মান, মর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন অনেক পোস্ট কলোনিয়াল রাষ্ট্রনেতার থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বন্ধুত্বকে নৈতিক দাবি হিসেবে দেখেননি; বরং কৌশলগত চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

 


শহীদ জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল কাঠামো তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথম স্তম্ভ হলো, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। জিয়া স্বাধীনতাকে কেবল ভূগোল বা সীমারেখার দিক থেকে দেখতেন না। তার মূল লক্ষ্য ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সার্বভৌমত্ব। অর্থাৎÑ কেউ আমাদের অভিভাবক হয়ে কথা বলবে না, কেউ আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না। শীতল যুদ্ধের সময়ে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর বড় ঝুঁকি ছিল, স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও অন্যের কণ্ঠে কথা বলা। জিয়া এই বিপদটি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেছিলেন।

 

 

দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো, ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি। জিয়া বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রকে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। কিন্তু কোনো একটির ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মূল ধারণা হলো শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক টানাপড়েনকে কাজে লাগানো এবং নিজেকে কোনো পক্ষের কৌশলগত বোঝা বানানো থেকে বিরত থাকা। এটি মূলত ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম এবং পোস্ট-কলোনিয়াল প্রাগম্যাটিজমের সংমিশ্রণ।

 

 

তৃতীয় স্তম্ভ হলো, আত্মমর্যাদাশীল জাতীয় স্বার্থ। জিয়া জাতীয় স্বার্থকে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখতেন না; বরং তার কাছে এটি ছিলো সমষ্টিগত মর্যাদা ও আত্মসম্মানের বিষয়। এই স্তরে তার কূটনীতি এক ধরনের নৈতিক বাস্তববাদে (বঃযরপধষ ৎবধষরংস) প্রতিষ্ঠিত হয়।

 


শহীদ জিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপলব্ধি ছিল ‘উপগ্রহ রাষ্ট্র’ হওয়ার ঝুঁকি। তিনি দেখেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির ছায়ার নিচে দেশের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা দেয় না; বরং অস্থিরতা ডেকে আনে। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি শীতল যুদ্ধের সময়কালীন বিশ্বরাজনীতির বড় ট্র্যাজেডির সংক্ষিপ্ত রূপ। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, কিউবা হয়ে ওঠে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপগ্রহ, দক্ষিণ ভিয়েতনাম মার্কিন প্রভাবের প্রক্সি। এই উপলব্ধি থেকেই জিয়া বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট মহাশক্তির সঙ্গে অন্ধভাবে যুক্ত করার পথ নেননি। তিনি ব্লক-আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

 


শহীদ জিয়ার কূটনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম স্তর ছিল ব্লক-নিরপেক্ষ কিন্তু ব্লক-বহির্ভূত নয় নীতি, যা মূলত একটি ঝঃৎধঃবমরপ ঘড়হ-অষরমহসবহঃ। তিনি তিনটি জোরালো ‘না’ ব্যবহার করেন।

 

 

প্রথমত, সোভিয়েত-বিরোধিতায় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারসাম্য রক্ষা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা আনুগত্যে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে উন্নয়ন সহায়তা রাজনৈতিক আনুগত্য চাপিয়ে দেয়। এবং মার্কিন সহায়তাকে ষবাবৎধমব হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ংঁনসরংংরড়হ হিসেবে নয়। তৃতীয়ত, চীনপন্থি হলেও একমুখিতায় না। চীন ছিল ভারতের বিপরীতে ভারসাম্য। কিন্তু চীনের প্রক্সি হয়ে যাওয়াটা তিনি পছন্দ করেননি। জিয়া এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্থাপন করেন। সেটি হলোÑ কৌশলগত অংশীদারিত্ব (ঝঃৎধঃবমরপ ঢ়ধৎঃহবৎংযরঢ়) মানে নীতি-সিদ্ধান্তে একমুখী রফবড়ষড়মরপধষ ধষরমহসবহঃ নয়।

 

 

জিয়া একটি ত্রিমাত্রিক ভারসাম্য তৈরি করেন, যা ছিল একটি কৌশলগত মানচিত্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতি দিয়ে ভূমিকা রাখে, চীন সামরিক ভারসাম্য ও কৌশলগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, আর মুসলিম বিশ্ব পরিচয়, শ্রমবাজার এবং রাজনৈতিক সংহতি দেয়। এই ত্রিভূজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশ নিজেই। সে কোনো এক শক্তির অধীনে নয়। শীতল যুদ্ধের সময়কালে এটি ছিল এক অসাধারণ ভারসাম্য।

 


এটি কেন সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল? কারণ, তখন ভারত সোভিয়েত অক্ষ শক্তিশালী ছিল। এই অক্ষের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ায় বিকল্প পথ ছিল সীমিত, এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল তীব্র। এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা মানে, এক সাথে বহু শক্তিকে না বলা; কিন্তু কাউকে শত্রু না বানানো। এটি কেবল সাহস নয়; বরং উচ্চস্তরের কৌশলগত প্রজ্ঞা।

 

 

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির এই দুটি দিক একত্রে দেখলে বোঝা যায়, এই নীতির দর্শন ছিল সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক। কৌশল ছিল ভারসাম্যভিত্তিক। নৈতিকতা ছিল আত্মমর্যাদাশীল। আর বাস্তবতা ছিল কোল্ড ওয়ার সচেতন। শহীদ জিয়ার পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের নীতি মূলত বাস্তববাদী কূটনীতির উদাহরণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ককে দেশীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তার আলোকে সাজিয়েছিলেন।

 

 


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আধুনিকীকরণ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া সামরিক প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেশের নিরাপত্তা ও বৈদেশিক স্বীকৃতিকে শক্তিশালী করেছে। জিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে একনিষ্ঠ নির্ভরশীল শক্তি হিসেবে নয়; বরং দেশের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

 

 

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল সামরিক সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাও ছিল লক্ষ্য। চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। একে নিছক ভারতের বিকল্প হিসেবে নয়; বরং জাতীয় কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার একটি ভারসাম্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।

 

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা হয়নি। পূর্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কিছু অংশ অর্ধেক ছিন্ন রেখে সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছিল। এভাবে দ্বিপাক্ষিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

 

জিয়া মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন। ওআইসিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবদান দৃঢ় করা হয়। দেশের সংবিধানে ইসলামিক সংহতি সংযোজনের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐক্য ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঐক্যের প্রতিফলন ঘটে। এর ফলে সৌদি আরব, কুয়েত, লিবিয়া, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে । প্রবাসী শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ ও রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন হয়। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজার ও প্রবাসী বাংলাদেশির অর্থনৈতিক অবদান মূলত জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক নীতিরই ফল। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল বাস্তববাদী, কৌশলগত স্বাধীনতামূলক এবং অর্থনৈতিক-ধর্মীয় দুই দিকের কূটনৈতিক সমন্বয়মূলক।

 

 


প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে এই পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারসাম্যপন্থি। জিয়ার নীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শত্রুতাপূর্ণ করা হয়নি; বরং একটি কঠোর বাস্তববাদী কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। ফারাক্কা পানি চুক্তি (১৯৭৭) ও যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে নদী ও পানি সম্পদ নিয়ে সঙ্ঘাত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। মোরারজি দেশাই সরকারের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা হয়। তার নীতি ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সমঝোতার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নির্ভরশীলতা এড়ানো।

 

 

মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকট (১৯৭৭-৭৮) মোকাবিলায় জিয়ার নীতি মানবিক সহানুভূতি ও কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখে। তিনি প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেন, আন্তর্জাতিক চাপ (জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন) মোকাবিলা করেন। ৯ জুলাই ১৯৭৮ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হিসেবে বিবেচিত।

 

 

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেও জিয়া বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন এবং মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের যৌথ অবস্থান জোরদার করেন। অতীতের বৈরিতা অস্বীকার না করে ভবিষ্যৎ গঠনের একটি বাস্তববাদী কৌশল হিসেবে একে দেখা হয়। জিয়া দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক দূরত্ব মেনে নিয়েও দূরদৃষ্টি এবং জাতীয় স্বার্থ বজায় রাখা সম্ভব।

 

 

জিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি ও সার্ক নিয়ে নীতি ছিল দক্ষ ও দূরদর্শী। ১৯৭৭-৭৯ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ধারণা উপস্থাপন করেন। এর মূল কথা ছিল প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা। তার দৃষ্টিতে সার্ক কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংস্থা নয়, এটি আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য ও সমন্বয়ের মাধ্যমে শক্তি প্রকাশের একটি মাধ্যম। তার প্রয়াসের ফলে ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশও প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কৌশলগত ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়। সার্ক ছিল জিয়ার ‘ঝড়ঁঃয অংরধহ উবংঃরহু চৎড়লবপঃ’-এর অংশ। এর লক্ষ্য আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংহত করা।

 

 

একই সময়ে জিয়া বহুপাক্ষিক কূটনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ গ্রহণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের উপস্থিতিকে শক্তিশালী করে। তিনি জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। বড় শক্তির প্রভাব থেকে স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করেন এবং উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করেন। এই বহুপাক্ষিক কূটনীতি বাংলাদেশের স্বাধীন কৌশলগত নীতির অংশ ছিল, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং নৈতিক নেতৃত্ব একসাথে নিশ্চিত করার সুযোগ দিয়েছিল। শহীদ জিয়া স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয় যদি দেশের অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র কাঠামো দুর্বল হয়। তাই তার নীতি ছিল অভ্যন্তরীণ শক্তি ও স্থিতিশীলতা তৈরি করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কৌশলকে সমর্থন করা।

 

 

তিনি মূলত চারটি দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন :

 


ক. কৃষি উৎপাদন : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনসংখ্যার জীবনমান উন্নত করা। এতে শুধু মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়নি; বরং রাষ্ট্রকাঠামোর মূল ভিত্তিÑ জনসাধারণের জীবনমানও দৃঢ় হয়েছে।

 


থ. শিল্পায়ন : অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক শক্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের স্বনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করা।

 


গ. প্রশাসনিক শৃঙ্খলা : দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি প্রয়োগে সমন্বয় নিশ্চিত হয়।

 


ঘ. জাতীয় ঐক্য : অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা।

 

 


জিয়ার অভ্যন্তরীণ নীতি পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। অর্থাৎÑ অভ্যন্তরীণ শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং জাতীয় ঐক্য ছাড়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকে তিনি সরাসরি পররাষ্ট্রনীতির সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ।