লেবানন থেকে হিজবুল্লাহও দ্বিতীয় একটি ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ অভিযান ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ চলতে পারে। কিন্তু প্রায় ৫০ জন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এখন আর পরিষ্কার নয়, আলোচনার টেবিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার মতো অবস্থানে কে আছেন।
ট্রাম্প হয়তো একটি সীমিত, স্থানীয় সংঘাত চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে। তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি—পরিবহনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি এখন ন্যূনতম সক্ষমতায় চলছে।
শিগগিরই যদি আবার জাহাজে জ্বালানি তোলা শুরু করা না যায়, তবে সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশে উৎপাদন কমাতে বাধ্য করবে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ আরো সংকুচিত হবে এবং অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর বাড়তি ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির ভেতর হাইড্রোকার্বনের প্রভাব এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও ইরান—দেশগুলো এমন সরবরাহশৃঙ্খলের ভিত্তি, যা এশিয়ার শিল্প, ইউরোপের উৎপাদন এবং বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখে।
পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে এ সত্য যে এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি এখনো চোখে পড়ছে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক গুরুত্বের এক বিরাট বিচ্ছেদচিহ্ন। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা মানেই শাসন ব্যবস্থার পতন নয়। বরং ইতিহাস বলে এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ার মতোই আবার আরো শক্তভাবে সংহতও হতে পারে। ইরানের শাসনপ্রতিষ্ঠান ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর—দুটোই এখনো অটুট আছে। তাদের হাতে এমন ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারও রয়েছে, যা দিয়ে তারা আরো কয়েক সপ্তাহ একই মাত্রার হামলা চালিয়ে যেতে পারে। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে শাসন ব্যবস্থার সক্ষমতা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
জ্বালানি বাজারের জন্য সময়ই এখন নির্ধারক ভেরিয়েবল। স্বল্পমেয়াদি সংঘাত বাজারে দোলাচল তৈরি করে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বাণিজ্যপথ, অবকাঠামোগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিনিয়োগ আচরণ—সবকিছুকেই নতুনভাবে গড়ে দেয়। এখন মূল প্রশ্ন শুধু এই নয় যে হরমুজ প্রণালি আবার কবে খুলবে; বরং প্রশ্ন হলো ইরান জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরো কতটা ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
এখানে শুধু চলাচল ঝুঁকি নয়, সরবরাহ ঝুঁকিও একে অন্যের ওপর চেপে বসছে। ইরাক এরই মধ্যে তেল উৎপাদন কমিয়েছে। ড্রোন হামলার পর কাতার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে। সৌদি আরবও তাদের অবকাঠামোর ওপর নতুন হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে রাস তানুরা কমপ্লেক্সে হামলার পর সেই শঙ্কা আরো বেড়েছে। এ কমপ্লেক্সেই সৌদি আরবের বৃহত্তম শোধনাগার অবস্থিত, যেখানে দৈনিক প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং এটি অপরিশোধিত তেল রফতানিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখন উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো স্পষ্টভাবেই ‘উত্তেজনা বিস্তারের পরিধি’র মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে উৎপাদকরা ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, আর তাদের এ সতর্কতামূলক সমন্বয় পুরো ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এ কারণেই তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়েছে—২০২৬ সালের শুরু থেকে ২০ শতাংশেরও বেশি। বাজার শুধু সরবরাহ হারানোর প্রতিক্রিয়াই দিচ্ছে না; একই সঙ্গে হিসাব করছে, কত দিন ধরে জ্বালানি অবকাঠামো এভাবে ঝুঁকির মুখে থাকবে। গ্যাসের বাজারে চাপ আরো তীব্র। তেলের মতো এলএনজি বাণিজ্যে অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হয়, তবে সীমিত কার্গোর জন্য ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে।
ইউরোপ এখানে বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শীতল এক শীতকাল পার করার পর এখন সংরক্ষণাগারের মজুদ অনেক কম, অথচ সামনে আবার মজুদ পুনরায় ভরার মৌসুম। হরমুজ দিয়ে যাওয়া অধিকাংশ এলএনজি যদিও এশিয়ার জন্য নির্ধারিত, তবু বৈশ্বিক গ্যাসবাজার আন্তঃসংযুক্ত। উপসাগরীয় সরবরাহ কমলে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়। ফলে ইউরোপের জন্য গ্যাস মজুদ পুনর্গঠন আরো ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে আরো সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। এলএনজি প্রবাহ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত থাকে, তবে আগামী শীতের আগে ইউরোপকে আরো অনিশ্চিত ভারসাম্যের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে।
অবশ্য ঘাটতির অভিঘাত শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীন স্থলভাগে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুদ হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেল তেল জমা করেছে, যা বর্তমান আমদানি মাত্রা ধরে ১০০ দিনেরও বেশি সময়ের চাহিদা মেটাতে পারে। এ মজুদ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ একটি সুরক্ষা দেয়। কিন্তু কৌশলগত তেলভাণ্ডার আসলে শুধু সময় কিনে দেয়। অস্থিরতা দীর্ঘ হলে সেই মজুদ পুনরায় পূরণ করা আরো ব্যয়বহুল হবে, শোধন মুনাফা কমবে, আর শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল ব্যয় বাড়বে।
বৈশ্বিক দামের ঊর্ধ্বগতি ছাড়ের দামে বিক্রি হওয়া রুশ হাইড্রোকার্বনকেও তুলনামূলকভাবে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। বাজার যখন টানটান, তখন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অপরিশোধিত তেলও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে, যা ক্রেমলিনের জ্বালানি আয়ে নতুন জোর দিতে পারে। অর্থাৎ উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু সরবরাহশৃঙ্খলই বদলাবে না, ভূরাজনৈতিক প্রভাববলয়ও নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে।
উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ঝুঁকি আরো গভীর। তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য কার্যত একটি বৈশ্বিক করের মতো কাজ করে, যার অভিঘাত খাদ্য, পরিবহন এবং বিদ্যুতের দামে গিয়ে পড়ে। যেসব দেশ আগে থেকেই মূল্যস্ফীতি ও ঋণসংকটে জর্জরিত, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী এ অস্থিরতা মুদ্রা ও রাজস্ব ভারসাম্য—উভয়কেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইরান যুদ্ধকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো কোনো একক বিপর্যয়কর বিদ্যুৎ বা জ্বালানি বিভ্রাটের আশঙ্কা নয়; বরং যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবে এখন জ্বালানি অবকাঠামো নিজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় তেল-গ্যাস সম্পদকে অর্থনৈতিকভাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো যে সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হবে না—এমন এক নীরব সংযম কার্যকর ছিল। কিন্তু সেই অলিখিত সংযম এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও সতর্কতামূলক উৎপাদন বন্ধ—দুটোই দেখিয়ে দিচ্ছে, জ্বালানি অবকাঠামো এখন সরাসরি গুলির রেখার মধ্যে।
সবশেষে, বাজার প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে দ্রুত ঘনীভূত হওয়া অনিশ্চয়তার প্রতিও। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বার্তা কখনো কূটনীতি, কখনো প্রতিরোধ, কখনো আবার উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকে দুলছে—যেন এক অদ্ভুত দোলক। এতে জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য সংঘাতের গতিপথ ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ সংঘাতকে বহু মানুষ এড়ানো সম্ভব ছিল, অপরিহার্য ছিল না—এমন একটি যুদ্ধ হিসেবেই দেখেছেন। যদি এটি প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়, কিংবা অনুমানের চেয়ে বেশি বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এর ফল হবে গুরুতর। জ্বালানি সরবরাহে আঘাত ছড়িয়ে পড়বে বীমাবাজার, পণ্য পরিবহন ব্যয়, মজুদ চক্র, শিল্প সরবরাহশৃঙ্খল এবং বিশ্বজুড়ে সাধারণ পরিবারের জ্বালানি খরচে। মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলো বাস্তবে দেখা দিতে শুরু করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আজকের দোলাচল কাল কাঠামোগত চাপে রূপ নেবে—তেল ও গ্যাসবাজারের জন্য যা বর্তমান অনিশ্চয়তার চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ক্যারোলিন কিসেইন: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব প্রফেশনাল স্টাডিজ সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও ক্লিনিক্যাল প্রফেসর এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘এনার্জি, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
