কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল

আশরাফুল ইসলাম রানা [প্রকাশ : যুগান্তর, ১১ মার্চ ২০২৬]

জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল

বাংলাদেশ কোনোভাবেই ইরান যুদ্ধের অংশ নয়। তবু যুদ্ধটা এদেশে হচ্ছে। ইতিমধ্যে  দেশে জ্বালানি যুদ্ধে জড়িয়ে পেট্রোল পাম্পে প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকার অভিজাত এলাকা সবখানে তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে জ্বালানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।  এ পরিস্থিতি ২০২২ সালেও হয়েছিল ইউক্রেনে হামলার পর।

 

 

তবে এতো দ্রুত খারাপ হয়নি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংকট ঘনীভূত হয়। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যয় মেটাতে গিয়ে সেবার মোটামুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ খালি হয়ে যায়। জ্বালানির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি চরমে ওঠে। এই ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। এরমধ্যে ফের ইরান যুদ্ধ। ইউক্রেনের চেয়ে এই যুদ্ধের প্রভাব আরও বড় আকারে বাংলাদেশে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

 

কারণ বাংলাদেশ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ইতিমধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ২৩ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতির জন্য যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো খবর। জ্বালানি তেল এমন এক পণ্য এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন জিনিস সম্ভবত বর্তমান দুনিয়ায় বিরল। ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অর্থ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর এর কঠিন মূল্য দেয় সবচেয়ে খারাপভাবে। প্রশ্ন একটাই, আমদানি নির্ভর জ্বালানি আর কতদিন? বিষয়টি এমন নয়, ইউক্রেন কিংবা ইরান যুদ্ধের আগে এ পরিস্থিতি হয়নি। বরং এটি বারবার হচ্ছে। কুয়েত, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনসহ সব সংকটের সময় হয়েছে। অর্থাৎ, বিপদ বারবার এলেও সমাধানে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে দিন দিন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

 

 


বাংলাদেশকে এ অবস্থায় জ্বালানি সার্বভৌম নিশ্চিত করতে জরুরি ও সাহসী সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। দ্রুত স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় কম ঝুঁকিপূর্ণ এমন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ করতে হবে। এর জন্য সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এই শিল্পের বিকাশ বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে এবং দারিদ্র্য হ্রাস ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই শিল্প একই সঙ্গে অত্যন্ত জ্বালানিনির্ভর। গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে আলো, সেলাই মেশিন, ওয়াশিং ইউনিট, ফিনিশিং প্রক্রিয়া এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

 

 

 

যা মূলত জোগান দেওয়া গ্যাস থেকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ব্যাপক গ্যাস সংকট, বাড়তে থাকা বিদ্যুতের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রস্তুতকারকদের জন্য বড় অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাকে বলেছেন, কারখানাগুলোতে গ্যাস সংকট লেগেই আছে। ইরান যুদ্ধের ফলে নতুন প্রভাব না পড়লেও আশঙ্কা আছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ক্রমশ আমদানিকৃত এলএনজি ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যখনই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে, যেমনটি বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প খাতের বিদ্যুতের দামে এবং রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয় বৃৃদ্ধি পায়।

 

 


বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে থাকা গার্মেন্টস প্রস্তুতকারকদের জন্য এই বাড়তি জ্বালানি ব্যয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ইতিমধ্যে দুর্বল করে দিয়েছে। জ্বালানি অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে থাকলে তা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই কারণেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে রুফটপ সোলার এখন একটি জরুরি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে একটি বিশাল কিন্তু এখনো প্রায় অনাবিষ্কৃত সম্পদ রয়েছে গার্মেন্টস কারখানার বিস্তীর্ণ ছাদ।

 

 

 

দেশ জুড়ে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চলে পাঁচ হাজারেরও বেশি বড় ও মাঝারি আকারের গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এছাড়াও শহর ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার ছোট কারখানা। এসব কারখানার অধিকাংশই বড় কংক্রিট কাঠামোর ভবন, যার প্রশস্ত সমতল ছাদ রয়েছে এবং যেগুলো ভারী যন্ত্রপাতি বহন করার মতো শক্তিশালীভাবে নির্মিত।

 

 

 

এই ধরনের ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গড়ে একটি গার্মেন্টস কারখানার ছাদের আয়তন ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ বর্গমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, প্রতি ১০ বর্গমিটার ছাদে প্রায় ১ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এই হিসাবে বড় ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানাগুলোর প্রতিটিতে প্রায় ৩০০ থেকে ১,০০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট কারখানাগুলোকে যুক্ত করলে এই সম্ভাবনা ১০০ কিলোওয়াটের বেশি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের ছাদ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিদ্যুৎ সরাসরি কারখানাতেই উৎপাদিত হবে, ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে। কারখানাগুলোর ছাদে সৌর বিদ্যুতের সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার জন্য একটি তহবিল করতে হবে সরকারকে। স্বল্প সুদে তহবিল পাওয়া গেলে, এটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।  

 

 

  


রুফটপ সোলার গ্রহণের সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক সাশ্রয়। গার্মেন্টস কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন ব্যয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়। কারখানার আকার ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। রুফটপ সৌরব্যবস্থা স্থাপন করলে এই বিদ্যুৎ ব্যয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কারখানা যদি মাসে ১০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল দেয়, তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। বছরে এই সাশ্রয় দঁাঁড়াতে পারে ৩৬ থেকে ৪৮ লাখ টাকার মতো। সাধারণত সৌর প্রকল্পের বিনিয়োগ ফেরত পেতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে।

 

 

 

এরপর প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কারখানাগুলো খুব কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা পায়। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সময়ে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি খরচ স্থিতিশীলতা শিল্পের জন্য বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। যখন কোনো সংঘাতের কারণে তেল বা এলএনজি সরবরাহে বিঘœ ঘটে, তখন বিশ্ববাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর তখন বাড়তি খরচ মেনে নেওয়া ছাড়া তেমন বিকল্প থাকে না। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ এই ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত। সৌর প্যানেল একবার স্থাপন করা হলে সূর্যের আলো থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় যা সম্পূর্ণ স্থানীয় ও বিনামূল্যের একটি সম্পদ। এখানে কোনো জ্বালানি খরচ নেই এবং পরিচালন ব্যয়ও খুব কম। ফলে রুফটপ সৌর ব্যবস্থার মাধ্যমে গার্মেন্টস কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

 

 

 

হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জ্বালানি কৌশল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বাংলাদেশকে দ্রুত জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং স্থানীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।  অন্যদিকে গার্মেন্টস কারখানাগুলোর বিস্তীর্ণ ছাদ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সুযোগগুলোর একটি। পাঁচ হাজারেরও বেশি কারখানা এবং লাখ লাখ বর্গমিটার খালি ছাদকে কাজে লাগাতে পারলে এই খাতেই ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এটি শিল্প খাতের জ্বালানি ব্যয় কমাবে, জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে, কার্বন নিঃসরণ কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে। বর্ধমান জ্বালানি মূল্য ও জলবায়ু সংকটের এই সময়ে রুফটপ সৌর আর কেবল পরিবেশগত উদ্যোগ নয় এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং কৌশলগত অপরিহার্যতা। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পই একটি জাতীয় ‘রুফটপ বিপ্লব’-এর নেতৃত্ব দিতে পারে, যা দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই করে তুলবে।