খাল বা নদী খনন বা পুনর্খনন নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিধেয়
[সূত্র : সমকাল, ২ মার্চ ২০২৬]

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র ‘বেত্রাবতী নদী’ এবং পৌরাণিক চরিত্র ‘ব্রহ্মপুত্র নদ’ পুনর্খননের মধ্য দিয়ে সত্তরের দশকের শেষার্ধে যে কর্মসূচি সূচিত হয়েছিল, সেটা পরবর্তী সময়ে কীভাবে ‘খাল খনন’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, এক রহস্য বটে!
এক. ইতিহাসের ইতিকথা
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যখন যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় ‘বেতনা নদী’ পুনর্খনন কাজ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি সূচনা করেন, তখনও তিনি সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। এমনকি ওই বছর ১৭ ডিসেম্বর যখন এ ধরনের দ্বিতীয় কর্মসূচি হিসেবে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদ পুনর্খনন কাজ উদ্বোধন করেন, তখনও দেশের রাষ্ট্রপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম। দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে জিয়াউর রহমান ২০ আগস্ট দেশের প্রতিটি থানায় ‘উলশী ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ’ দিচ্ছেন (মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের তারিখ, মওলা ব্রাদার্স, ফেব্রুয়ারি ২০০১)।
বলা বাহুল্য, জিয়াউর রহমানের শাসনামলজুড়ে ‘খাল খনন কর্মসূচি’ বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ পরবর্তী সময়ে লিখেছেন, ‘১৯৭৯ সালের শেষের দিকে জিয়া দেশব্যাপী এক খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। এটা ছিল ক্ষেত-খামারের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তাঁর একটা বৈপ্লবিক কর্মসূচির অংশ। এ উপলক্ষে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সফর করে খাল খনন বা পুনর্খননের কাজে অংশ নেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজেই কোদাল হাতে করে কাজে নেমে যান। অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খননে অংশ নেয়া নিছক একটা প্রচারণা বলে মনে হলেও এই পরিকল্পনা হাজার হাজার গ্রামবাসীকে গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে এবং জিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ভূমিকায় জনমনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে’ (গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সামরিক শাসন, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৫)।
সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ‘উন্নয়নের প্রশ্নে খাল কাটা প্রকল্প একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। অনেকেই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে এনে মানুষ জড়ো করে তারপর তাঁকে দিয়ে লোক দেখানো খাল কাটার উদ্বোধন করিয়েছেন। সেটা ভিন্ন কথা। এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু উদ্দেশ্যটা ছিল মহৎ, সেটা স্বীকার করা উচিত। আমি নিজে দেখেছি, খাল কাটার ফলে মানুষের কতটা সুবিধা হয়েছে’ (গভর্নরের স্মৃতিকথা, বণিক বার্তা, ২০১৯)।
দুই. প্রতিশ্রুতি বনাম প্রয়োগ
যা হোক, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েই বিএনপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিমতো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘খাল খনন’ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার শপথ গ্রহণের এক দিন পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই যে দুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার একটি হচ্ছে ‘নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন’। ইতোমধ্যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদকে সভাপতি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিনকে সদস্য সচিব করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি ‘সেল’ গঠনে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন ভূমি, কৃষি, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক। সেলটির কর্মপরিধির মধ্যে রয়েছে বছরভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, চলমান ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প ও কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও দিকনির্দেশনা, জনসম্পৃক্তির জন্য প্রচারণা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকেও গত ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ‘খাল খনন সংক্রান্ত তথ্যাদি প্রেরণ’ করতে বলা হয়েছে। আগামী ৪ মার্চের মধ্যে সকল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে আওতাভুক্ত পৌরসভাগুলো থেকে যেসব তথ্য পাঠাতে হবে, এর মধ্যে রয়েছে– ১. ইতোমধ্যে কোনো খাল খনন করা হয়েছে কিনা; হয়ে থাকলে সেটার দৈর্ঘ্য; ২. আরও যেসব খাল খনন করা প্রয়োজন, সেগুলোর বিবরণ; ৩. আগামী ১৮০ দিনে কত কিলোমিটার খাল খনন করা হবে; ৪. পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কত কিলোমিটার খাল খনন করা প্রয়োজন।
যদিও চিঠি দেখিনি, অনুমান করছি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মাঠ প্রশাসনে একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, কয়েকটি উপজেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেজে ইতোমধ্যে ‘খাল খনন ও পুনর্খনন’ কর্মসূচির আওতায় ‘সর্বাধিক জনগুরুত্বপূর্ণ ও উপযোগী খালের নাম’ প্রস্তাব করার জন্য নাগরিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে কিংবা প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে খাল বা নদী পুনর্খনন নিয়ে লক্ষণীয়, সরকারি ভাষ্যের মধ্যেই ইতোমধ্যে ‘নদী’ এবং ‘খাল’ নিয়ে ‘প্যাঁচ’ লেগে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় যদিও ‘নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন’ বলছে; স্থানীয় সরকার বিভাগ বলছে ‘খাল খনন’। আবার উপজেলা প্রশাসন বলছে ‘খাল খনন ও পুনর্খনন’।
তিন. বিভ্রান্তি ও বিধেয়
খাল, না নদী; খনন, না পুনর্খনন– এই বিভ্রান্তির ব্যাপারে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণাকালেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ফেসবুকে আমার বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম এভাবে–
প্রথমত, ২০ হাজার কিলোমিটার খনন করা হবে খাল, না নদী? নাকি উভয়টি মিলে ২০ হাজার কিমি? নতুন করে খনন করা হবে, না বিদ্যমান খাল পুনর্খনন বা পুনরুদ্ধার করা হবে? পাঁচ বছরে বা ১৮২৫ দিনে ২০ হাজার কিলোমিটার হলে প্রতিদিন প্রায় ১১ কিলোমিটার খনন করা সম্ভব কিনা– এই প্রশ্ন যারা তুলছেন, তারা কূটতর্ক করছেন। এটা তো একটি টিম একটি মাত্র এলাকায় খনন করবে না। একাধিক টিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে খনন কাজ চালালে প্রতিদিন এর কয়েক গুণ এলাকা খনন সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, মনে রাখা জরুরি, ১৯৭৭-৮১ সালের এবং এখনকার প্রতিবেশগত ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি এক নয়। যতদূর জানা যায়, আড়াই শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, তখন কেবলমাত্র গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়েছে। তিস্তা, গোমতী, মুহুরী, খোয়াই, সোমেশ্বরী, পিয়াইন, ডাহুক প্রভৃতি নদীর উজানে তখনও ভারতীয় ড্যাম বা ব্যরাজ ছিল না। ব্রহ্মপুত্রের উজানেও চীন ড্যাম বা ব্রহ্মপুত্রের উপনদীগুলোতে ভারতীয় ড্যাম ছিল না। ফলে ঠিক সত্তর দশকের মতো পরিস্থিতি নেই। সেখানে সত্তর দশকের মাত্রা ও পদ্ধতিতে খাল খনন কাজে নাও দিতে পারে; নতুন বাস্তবতায় নতুন করে ভাবতে হবে।
তৃতীয়ত, বর্তমানে খাল ও নদীগুলোর প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হলে উজানে নানাভাবে বিঘ্নিত বা আটকে থাকা প্রবাহের ব্যাপারে ভারত, চীন, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে অববাহিকাভিত্তিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উজান থেকে পানির নিশ্চয়তা আদায় করতে না পারলে সারাবছর ধরে বিশেষত শুকনো মৌসুমে খালগুলো সচল রাখা কঠিন হবে; যদিও বর্ষাকালে সে সমস্যা হবে না।
চতুর্থত, এই বিপুল কর্মযজ্ঞের কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবতে হবে। এ জন্য আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, আওয়ামী লীগ আমলেও নদী ও ক্ষেত্রবিশেষে খাল খননে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে ১৪ বছরে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার নৌপথ পুনরুদ্ধারের দাবি করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২০ সালে ১৭৮টি নদীতে আরও ১০ হাজার কিলোমিটার পুনর্খননের জন্য ‘ড্রেজিং মাস্টারপ্ল্যান’ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সাফল্য স্পষ্ট নয় মূলত সুশাসনের অভাবে। অনেক নদী পুনর্খনন করতে গিয়ে একদিকে নদীর ঐতিহাসিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনার অভাবে নদীর সঙ্গে জলাভূমি ও জমির সংযোগ বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যগত ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া খননের নামে নদীর মাটি যেনতেনভাবে তুলে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। বিএনপি ঘোষিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল বা নদী খনন বা পুনর্খননে এই চিত্রের যে পুনরাবৃত্তি হবে না– সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
ষষ্ঠত, এ ধরনের ‘মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাগত যথার্থতা, কারিগরি উৎকর্ষ, অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বলা বাহুল্য, এই বক্তব্য এখনও প্রাসঙ্গিক।
চার. সংখ্যা ও সংজ্ঞা
তার মানে, কেবল এই খনন বা পুনর্খনন কর্মসূচিতে নদী বা খালের স্পষ্টীকরণই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে দুই প্রকার জলধারার আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞার প্রশ্নও সামনে চলে আসে। নদীর আইনি সংজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি বেশ কয়েক বছর ধরে লিখে আসছি। যেমন, ‘বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও বিধিমালার মধ্যে নদী, পানি ও পরিবেশ-সংশ্নিষ্ট প্রথম দলিল ‘দ্য ক্যানেল অ্যাক্ট, ১৮৬৪’। আর ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ পানি আইন। কমবেশি দেড়শ বছরে আরও ৩১টি আইন ও বিধিমালা প্রণীত হয়েছে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু কোথাও নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি (নদীর আইনি সংজ্ঞা হলো না দেড়শ বছরেও, সমকাল, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০)।
অবশ্য ২০২৩ সালে নদনদীর সংখ্যা নির্ধারণ করতে গিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি ‘ওয়ার্কিং ডেফিনেশন’ নির্ধারণ করেছিল। ওই সংজ্ঞায় বলা হয়েছে– ‘নদ বা নদী বলিতে পাহাড়, পর্বত, হিমবাহ, হ্রদ, ঝরনা, ছড়া, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলধারা হইতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হইয়া যে জলধারা সারা বছর বা বছরের কোনো কোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়া প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হইয়া সমুদ্র, মহাসমুদ্র, হ্রদ, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলাশয়ে পতিত হয়, তাহাকে বোঝায়। উপর্যুক্ত সংজ্ঞায় যাহাই থাকুক না কেন, ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে, রিভিশনাল সার্ভে ও বাংলাদেশে রিভিশনাল সার্ভে রেকর্ডে নদ বা নদী হিসেবে যাহা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা নদ বা নদী হিসবে গণ্য হইবে’ (শেখ রোকন, নদনদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও শঙ্কা, সমকাল, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।
লক্ষণীয়, নদী রক্ষা কমিশনের সংজ্ঞাতেও নদীর প্রতিশব্দগুলো গণ্য হয়নি। ফলে বিভ্রান্তি থাকে। যেমন দক্ষিণবঙ্গে বা উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক নদী খাল বা খালী নামে পরিচিত। ‘দোন’ হলো নদীর প্রতিশব্দ, যেমন বরগুনায় আছে ‘খাকদোন’। আবার সুন্দরবনে আছে ‘ভারানি’। ওই সংজ্ঞায় নদীর প্রাকৃতিক প্রতিবেশ বিষয়টিও নেই।
নদীর দৈর্ঘ্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রাচীন সব অভিধান ও দলিলে ন্যূনতম দৈর্ঘ্যের বিষয়টি রয়েছে। যেমন ‘বাচস্পত্য অভিধান’ বলছে– ‘যে অকৃত্রিম জলপ্রবাহ ৯ মাইল ১৬০ গজ প্রবাহিত হয় নাই, তা গর্ত্ত শব্দবাচ্য।’ যেমন, বাংলা একাডেমি অভিধানে রয়েছে, ‘নদী হলো চার ক্রোশের অধিক বাহিনী জলনালি’।
আমার পর্যবেক্ষণ, তিন কিলোমিটারের কম দৈর্ঘ্যের নদী হলে এর আলাদা অববাহিকা চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ সেটা উৎসনদী ও পতনের নদীর অববাহিকার সঙ্গে ‘ওভারল্যাপ’ করে। তিন কিলোমিটারের কম দৈর্ঘ্যের নদীর ক্ষেত্রে অববাহিকা ও প্রতিবেশ যে কারণে চিহ্নিত করা যায় না। এ ছাড়া যদি কোনো ধারা একটি নদী থেকে বের হয়ে আবার সেই নদীতে পড়ে, তাহলে সেটার মাঝের অংশ চর মাত্র। যমুনা, পদ্মা, মেঘনায় এমন অনেক ধারা আছে। এর বেশি হলে নদী হতে পারে; যেমন দিনাজপুরের কাকড়ি নদী আত্রাই থেকে বের হয়ে আবার আত্রাইয়ে পড়েছে। যেমন চাঁদপুরের ধনাগোদা নদী মেঘনা থেকে বের হয়ে আবার মেঘনায় পড়েছে। এ ছাড়া নদী ও খালের প্রশ্নটি সংজ্ঞায় স্পষ্ট করতেই হবে। কারণ নেপাল, ভুটান, আসাম, বাংলায় খলা, খাল, খালী নদীর প্রতিশব্দ। এটা স্পষ্ট না থাকায় খাল ডেকে অনেক নদীকে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।
আমার মতে, নদীর সংজ্ঞা হওয়া উচিত এমন– ‘হিমবাহ বা হ্রদ বা ঝরণা বা অন্য কোনো জলাশয় বা জলধারা থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন বা যুক্ত এবং প্রাকৃতিক প্রতিবেশসম্পন্ন বা মনুষ্যসৃষ্ট হলেও ২০ বছর প্রাচীন ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশপ্রাপ্ত বা উচ্চতম আদালতে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং তিন কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের জলধারাকে নদী বলে। নদী বারোমাসিক বা মৌসুমি হতে পারে এবং সমুদ্র, মহাসমুদ্র, হ্রদ বা অন্য কোনো জলাশয়ে পতিত হতে পারে। বাংলায় নদীর প্রতিশব্দ নদ, খাল, খালী, ঝোরা, ছড়া, ভাড়ানি, দোন, গাঙ, ডাঙরা, দহ, তটিনী, তরঙ্গিণী, স্রোতস্বিনী, কল্লোলিনী, বেণী।
একই কথা বলা চলে খালের ক্ষেত্রে; যদি তর্কের খাতিরে আলোচ্য কর্মসূচিকে ‘খাল খনন’ মেনেও নিই, প্রশ্ন উঠবে ‘খাল’ কোনটি? প্রাকৃতিক জলধারা, না মনুষ্যসৃজিত? মনে রাখতে হবে, নদীর অন্যতম প্রতিশব্দ ‘খাল’। আবার কিছু খাল মানুষ খনন করলেও পরে নিজস্ব প্রতিবেশ তৈরি হয়ে নদী হয়েছে। যেমন, রূপসাহার খাল থেকে রূপসা নদী।
নদী খনন বা পুনর্খনন করতে গিয়ে ‘খাল’ আখ্যায়িত হওয়ার বিপদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সত্তর দশকে জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিতে হুজুগে অনেক নদীও পরবর্তী সময়ে ‘খাল’ আখ্যা পেয়েছে। এবারও এর লক্ষণ স্পষ্ট। যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তাঁর এলাকার ১৫টি খাল খননের জন্য ‘ডিও লেটার’ দিয়েছেন। দেখতে পাচ্ছি, সেখানেও কুদালিয়া ও লাখৌ নদীকে তিনি ‘খাল’ তালিকায় যুক্ত করেছেন।
যেমন, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা প্রশাসন ফেসবুকে ‘খাল খনন ও পুনর্খনন’ কর্মসূচির আওতায় নাম প্রস্তাবের জন্য নাগরিকদের আহ্বান জানালে বেশির ভাগ কমেন্টকারীই সেখানকার দুটি সুপরিচিত নদী জিঞ্জিরাম ও সোনাভরির কথা বলেছেন।
অনেকের মনে থাকার কথা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি ২০২৩ সালে বিভাগওয়ারি ‘খাল, পুকুর, বিল ও পাহাড়ি ছড়া ইত্যাদির তালিকা’ প্রকাশ করেছিল। রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম– ৮টি বিভাগ থেকে ১০ হাজার ৬৪২টি ‘খাল’ সেখানে স্থান পেয়েছিল; যদিও খাল ও নদীর মিশ্রণ সেখানেও দেখেছি।
পাঁচ. উপযুক্ত উপসংহার
সন্দেহাতীতভাবেই বিদ্যমান ব্যবস্থায় দেশের ছোট-ছোট নদী ও খালের পুনরুজ্জীবনের বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা সহজ হবে। কৃষি সেচ, মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় নৌ চলাচল, এমনকি চিত্তবিনোদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্ষাকালে পানির ধারণ ক্ষমতা এবং এবং বছরভর ব্যবহারের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে। তার আগে স্পষ্ট করতে হবে– খাল, না নদী; খনন, না পুর্নখনন। আর সেটা স্পষ্ট করতে গেলে নদী ও খালের আইনি সংজ্ঞার বিকল্প নেই।
খাল ও নদীর সংজ্ঞা চূড়ান্ত হলে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের জন্য একটি বড় কাজ হবে খালের তালিকা চূড়ান্ত করা। এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের করা খালের অ-চূড়ান্ত তালিকা বা এলজিইডির ‘মিশ্রিত’ তালিকাটি হালনাগাদ করা যেতে পারে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক