খাল খনন : স্বনির্ভরতা ও সবুজ বিপ্লবের হাতছানি
মোস্তফা কামাল [প্রকাশ : ইত্তেফাক, ১৪ মার্চ ২০২৬]

ক্ষণ গণনায় আর ঘণ্টা কয়েক বাকি। ঈদের ১৬ খাল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুরুটা করবেন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় সাহাপাড়া খাল দিয়ে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুরুটা করেছিলেন ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে যশোরের শার্শায় উলাশী-যদুনাথপুর খাল খনন দিয়ে। পরে পর্যায়ক্রমে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে কাশাদহ খাল, নেত্রকোনায় তিলকখালী খাল, বাগেরহাটের বড়বাড়িয়া খালসহ সারা দেশের আনাচে কানাচে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন ছিল সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন ও তাৎক্ষণিকতার সিদ্ধান্ত। আর তারেক রহমানেরটি নির্বাচনি ওয়াদা। নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার কাজটি এত দ্রুত শুরু করা বিস্ময়কর। যেমন বিস্ময়কর তার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ।
জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের খাল খননের উদ্দেশ্য-বিধেয় প্রায় একই। সময়ের ব্যবধানে তফাত টেকনোলজিতে। গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন এখানে কমন উদ্দেশ্য। জিয়াউর রহমানের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সারা দেশে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন করে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বোরো আবাদ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি; খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়ে। স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা ও করানো সহজ কাজ নয়। স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে এবং স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া বা ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখননকাজে তিনি এক আশ্চর্য আলোড়ন তৈরি করেছিলেন। শুকনা মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে এবং বোরো আবাদ বাড়াতে খালগুলো পানির আধার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণ এবং জলাবদ্ধতা দূর করার মাধ্যমে কৃষিজমি ও জনবসতি রক্ষা করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে হয়েছে কর্মসংস্থান। এসেছে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা।
খাল মানবসৃষ্ট উন্মুক্ত জলপ্রবাহ খাত। খাল দুই ধরনের হয়ে থাকে বহন খাল ও নৌপরিবহন খাল। সেচ, জল নিষ্কাশন অথবা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বহন খাল খনন করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, নৌযোগাযোগের উদ্দেশ্যে খনন করা হয় নৌপরিবহন খাল। তবে উভয় প্রকার খালই নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে বলে উভয় ক্ষেত্রে নৌযোগাযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। খালের মাধ্যমে কখনো কখনো দুটি প্রাকৃতিক জলরাশিকেও সংযুক্ত করা হয়। বর্তমান বিশ্বে খালের ধারণা পালটে গেছে। খালগুলো কেবল জলপথই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাল খননের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো, যার শুরুটা মূলত সেচ, নৌপরিবহন এবং বাণিজ্যের সুবিধার্থে। প্রাচীন মিশরীয়, মেসোপটেমীয় ও চীনারা নদীর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য খাল নির্মাণ করে। ১৮৫৯-১৮৬৯ সালের মধ্যে নির্মিত সুয়েজ খাল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করে। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে আসিরীয় রাজা সেনাচেরিব ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাথর বাঁধানো খাল তৈরি করেছিলেন। নীল নদের অববাহিকায় সেচের জন্য ব্যাপক খাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। মধ্য ও শিল্পবিপ্লবের যুগে ব্যবসার জন্য খাল খনন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যার অন্যতম উদাহরণ ফ্রান্সের 'ক্যানাল ডু মিডি'। ১৮শ ও ১৯শ শতকে শিল্প বিপ্লবের সময় বাণিজ্যের প্রয়োজনে দ্রুত খাল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়। মিশরের সিনাই উপদ্বীপের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই খালটি ভূমধ্যসাগর ও লোহিতসাগরকে যুক্ত করে, যা বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ সমুদ্র বাণিজ্য পরিচালনা করে। ফরাসি প্রকৌশলী ফার্দিনান্দ দে লেসেপস এটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত সুয়েজ খাল মনুষ্যনির্মিত একটি কৃত্রিম খাল।
এই খালটি ভূমধ্যসাগর ও লোহিতসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। বিস্তীর্ণ বালুর মরুভূমি খনন করে তৈরি করা হয়েছে বর্তমান বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি। ধারণা করা হয়, সমুদ্রবাণিজ্যর প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয় এই খাল দিয়ে। এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ সহজতর করার জন্যই খনন করা হয় সুয়েজ খাল। একসময় ইউরোপ থেকে এশিয়া যাওয়ার জন্য আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হতো। এতে করে সমুদ্রপথে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পথ বেশি পাড়ি দিতে হয় জাহাজগুলোতে। সুতরাং, বুঝাই যাচ্ছে এই খাল যাতায়াতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনেও বিপুল পরিমাণ অর্থের সঞ্চয় হয় এই পথ দিয়ে যাতায়াতের কারণে। লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় অবস্থিত পানামা খাল কয়েক দশক ধরে মাঝেমধ্যেই আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত এ খালটি ১৯১৪ সালে চালু করা হয়। এরপর ১৯৭৭ সালে দেশটি পানামার সঙ্গে একটি চুক্তি করে খালটি তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য। তবে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দুই দেশ যৌথভাবে পানামা খাল নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলার ইতিহাস বলছে, এখানে খাল খননের প্রথমত উদ্দেশ্য ছিল সেচ এবং নিষ্কাশন। পরে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প, তিস্তা প্রকল্প, মুহুরী সেচ প্রকল্প হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। কিছু খালে রেগুলেটর, জলকপাট, মাছ যাতায়াতের পথ তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে যেখানে সায়েন্টিফিক মডেল গ্রহণযোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি, সেখানে জিয়াউর রহমান তার দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী মডেল গড়েন। মডেলটির বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে দেন আলাদা পরিচিতি। গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে শুরু করা খাল খনন কর্মসূচির তাৎক্ষণিকতায় বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। ঐ কর্মসূচিটি কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিখা) মাধ্যমে পরিচালিত হলেও প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরে চলেছিল কাজটি। যেখানে স্থানীয় পুলিশ, বয়স্ক ও যুবকরা স্বেচ্ছায় খাল খননে অংশগ্রহণ করতেন।
স্থানীয় জনগণ সরাসরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয় এবং তাদের মধ্যে সহানুভূতি, আন্তরিকতা ও অংশগ্রহণের মনোভাব বৃদ্ধি পায়; বর্তমানে যেটিকে সায়েন্স এবং কমিউনিটি-বেইসড মডেল হিসেবে ধরা হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরের (সম্ভবত ১৯৭৯-১৯৮০) মধ্যে ১ হাজার ৫০০টির বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। বিআইআইএসএস জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭৯-১৯৮১ সালের মধ্যে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিএনপি কয়েক দফায় ক্ষমতায় থাকলেও খাল খননের দিকে যায়নি।
এবার খুব গুরুত্ব ও দ্রুততার সঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে খাল খননের কাজ। খাল, জলাশয় দখলমুক্ত রাখতে তা মহৌষধ হবে বলে বিশ্বাস অনেকের, যা গ্রামীণ অর্থনীতির বড় জোগানদার হতে পারে। পুনরুজ্জীবন দেবে সবুজ বিপ্লব, দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিকে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে, যা শীতকালে সাধারণ মানুষ হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং নদীগুলোর নাব্য কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে বর্ষাকালে তীব্র বন্যা দেখা দেয় এবং শীতে পানির সংকট তৈরি হয়। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে। খাল খননের মাধ্যমে সেখানেও একটি নতুন বাতাবরণ আশা করা যাচ্ছে। কারণ বন্যা ও খরা প্রতিরোধে খাল ও নদীর খনন ও পুনঃখনন ছিল সময়ের দাবি। ক্ষমতায় আসার আগেই তারেক রহমানের বিষয়টি উপলব্ধি এবং একে নির্বাচনি অঙ্গীকারে নিয়ে আসা, ক্ষমতায় বসার এক মাসের মধ্যে কাজ শুরুর মধ্যে আশাব্যঞ্জক বার্তা মিলছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট