কম শক্তি নিয়েও মনোবল অটুট ইরানের
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৪ মার্চ ২০২৬]

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির কাছে ইরানের শক্তি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তার পরও যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ সময়ের মধ্যে ইরান লড়ে যাচ্ছে সাহসের সঙ্গে। মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়েছিলেন। এবার পাল্টা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এই যুদ্ধ বন্ধে তিনটি শর্তের কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে প্রথম শর্ত হিসেবে রয়েছে ইরানের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি স্বীকৃতি প্রদান; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর হামলা না চালানোর ন্লিয়তা প্রদান।
এর মধ্য দিয়ে এটিই বোঝা যাচ্ছে যে গত বছরের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এটি এক ভিন্ন রূপ নিতে যাচ্ছে। আর যাবেই না কেন, ইরানের বিপ্লবী সরকারকে উত্খাতের জন্য যে নীলনকশা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিলে করেছে, এর মধ্য দিয়ে এটিই বোঝা যায়, কোনোভাবে যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়, তাহলে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এক কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের অপরাজিত ভেবে যুদ্ধের মাঠ থেকে আপাত বিদায় নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কঠোর হামলার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারবে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যুক্তরাষ্ট্র কেন এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইছে? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যদিও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বারবার আরো কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে তিনি এখন উপলব্ধি করতে পারছেন যে ইরান সম্পর্কে তাঁর কাছে যে তথ্য ছিল, তা অসম্পূর্ণ।
অর্থাৎ হয়তো এমন তথ্য ছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা কম শক্তি নিয়েও মনোবল অটুট ইরানেরকরতে পারলে ইরান পিছু হটবে এবং এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র ইসরায়েলের সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতাই থাকবে না। সব তথ্য ও অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ইরানের এই মরণপণ লড়াই এটিই জানান দিচ্ছে যে তারা মৃত্যুকে তোয়াক্কা করে না। একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো দেশটির অভ্যন্তরে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ হতে সময় লাগে না এবং এই আদর্শকে ধারণ করেই তারা সমান তালে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তুলনামূলক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে ইরানের কয়েক শ মানুষ নিহতের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নিহতের সংখ্যা মাত্র সাত হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো এখন প্রতি মুহূর্তে ইরানের নিশানায় রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইরান নির্ভুলভাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এখন নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি যে তাদের তুলনায় গোয়েন্দা সক্ষমতায় পিছিয়ে থেকেও ইরান কিভাবে তাদের বিষয়ে কিছু নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিষয়ে একটিই উত্তর রয়েছে, আর তা হলো রাশিয়া ও চীন নিয়মিতভাবে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে ইরানের হয়ে কাজ করছে। রাশিয়া কেন তার দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানের সহায়তায় এই যুদ্ধে এগিয়ে আসছে না, এটি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা যখন চলছিল, ইরানের পক্ষ থেকে জানান দেওয়া হলো যে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রয়েছে। এই বার্তাটি অন্য রকম অর্থ বহন করে। আর এর মধ্য দিয়ে ইরান যখন সফলভাবে তার নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিল, বৈশ্বিক তেল, গ্যাস, খাদ্যসহ সরবরাহ চ্যানেল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এটি স্পষ্ট হলো, এর মধ্য দিয়ে প্লিমা দেশগুলোও ক্ষতির বাইরে রইল না।
মুদ্রার অপর পিঠও এখন স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আপাতত ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোও রাশিয়ার ওপর এই নিষেধাজ্ঞার কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না এখন। ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটাতে গিয়ে তেল বিক্রির ওপর মূলত নির্ভরশীল রাশিয়া যখন বিভিন্ন দেশে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ধুঁকছিল, এমন সময় ইরান যুদ্ধ তার জন্য একটি বড় আর্থিক লাভের সুযোগ করে দিল। আর সেই সঙ্গে ইরানকে পরোক্ষভাবে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ছাড়াও আরো কিছু কৌশলগত সহায়তা করে যাচ্ছে। তবে সেগুলো কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যেই এই যুদ্ধ এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তিকে এখন সমান তালে লড়তে হচ্ছে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গেও। হিজবুল্লাহ ও হুতিরাও ইরানের মতো করেই অসংখ্য মিসাইল হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে যে পরিমাণ মিসাইল রয়েছে তার অর্ধেক এখনো ফুরায়নি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে যে সংখ্যায় অ্যান্টিমিসাইল রয়েছে, তার মজুদ দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। এর কারণ হচ্ছে, একটি মিসাইলকে ধ্বংস করতে অনেকগুলো অ্যান্টিমিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর বাইরেও রয়েছে এই যুদ্ধের খরচ মেটানোর বিষয়টি। ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ইরান নিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য সফল করতে পারবেন। সম্প্রতি মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের খরচের খসড়া হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে, এই পর্যন্ত এই অর্থ খরচের পরিমাণটা যদিও প্রকাশ করা হয়নি। তবে যা অনুমান করা যায়, তা হলো কোনোভাবেই তা ২০ বিলিয়ন ডলারের কম হবে না। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দিনের খরচ মেটাতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে আরো ৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থছাড়ের জন্য আবেদন করবে, তবে তা অনুমোদিত হবে কি না স্পষ্ট নয়। এই যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেস ও সিনেটের অনেক সদস্য এরই মধ্যে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো অভিযান চালানোর কর্তৃত্ব নেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের। ট্রাম্প এর আগে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে অভিযান করেছেন, এবার করলেন ইরানে। সুতরাং অভ্যন্তরীণভাবে তিনি খুব একটা ভালো অবস্থায় আছেন, সেটা বলার উপায় নেই। অনেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞাতার কথাও স্মরণ করছেন।
ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প যে খরুচে আরেকটি যুদ্ধের সূচনা করেছেন, দিনশেষে তা মার্কিন স্বার্থের জন্য কতটা সহায়ক হবে, সেই বিষয়ে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন। এর আগের প্রতিটি মার্কিন প্রশাসন ইরান নিয়ে অশ্বস্তিতে থাকলেও এ ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটানোর বিষয়ে ভাবেনি। জাতিসংঘের মতো সংস্থাকেও ভীষণ রকম বিতর্কের মধ্যে পড়তে হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের যেখানে বৈশ্বিক সংকটে অভিভাবকের ভূমিকা পালনের কথা, সেখানে একের পর এক অযাচিত যুদ্ধ এবং এর মধ্য দিয়ে অসংখ্য বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বৈশ্বিক কাঠামোকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ২ অনুচ্ছেদের ১-৪ উপ-অনুচ্ছেদসমূহ, যেখানে অপর রাষ্ট্রের সার্বভৌম সত্তা এবং রাজনৈতিক অধিকারকে সম্মান জানানোর কথা উল্লেখ রয়েছে, এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটেছে। এর বাইরে যদিও ইরান কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলা হচ্ছে, সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের আলোকে আক্রান্ত দেশকে আত্মরক্ষায় পাল্টা হামলা চালানোর বৈধতা দেয়, যতক্ষণ না নিরাপত্তা পরিষদ এই লক্ষ্যে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে।
তা ছাড়া যেকোনো আন্তর্জাতিক অভিযানের আগে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি না নেওয়ার ক্ষেত্রেও সনদের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে। ইরানে সরাসরি হামলা এবং পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের গৃহবিবাদের সূচনা করতে চাচ্ছে, যেন মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ মিলে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুক। ফলত যুদ্ধটি আরো ব্যাপকতা লাভ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধে অংশীদারের সংখ্যাও আরো বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এক ধরনের নতুন বৈধতা অর্জন সম্ভব হবে। বাস্তবে এসব উদ্দেশ্য খুব একটা কাজে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত আফগানিস্তান নিয়ে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞাতার কথাও ভুলে গেছে। তারা ইরানে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আফগান অভিজ্ঞাতার পুনরুত্থান ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়