কৃষিতে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ড. রাধেশ্যাম সরকার [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ২২ জানুয়ারি ২০২৬]

২০২৬ সালে দেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তন এবং গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্প ও সেবা খাতের বিস্তার, আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ফলে জাতীয় আয়ে কৃষি খাতের অংশ তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। তবে এই পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন মোটেও কৃষির মৌলিক গুরুত্বকে হ্রাস করতে পারেনি। বাস্তবতা হলো, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান রক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় করতে, কৃষি এখনো অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে অটুট অবস্থানে রয়েছে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবিকা, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা সরাসরি এই খাতের সঙ্গে জড়িত। এটি দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বিশেষভাবে বলা যায়, কৃষি কেবল উৎপাদনশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনমান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কৃষি উৎপাদনশীলতার সঙ্গে দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তা ২০২৬ সালেও সমানভাবে কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক। কৃষিতে যখন উৎপাদন ভালো হয়, তখন খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায়, বাজারে দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং এর সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। এতে দারিদ্র্যের চাপ কিছুটা হলেও হ্রাস পায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল থাকে। বিপরীতে, কৃষি উৎপাদনে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই তার প্রভাব দ্রুত খাদ্যবাজারে ছড়িয়ে পড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে। সুতরাং কৃষি কেবল একটি উৎপাদন খাত নয়, বরং এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিল্প ও সেবা খাতের অগ্রগতির পাশাপাশি কৃষিকে শক্তিশালী ও টেকসই রাখা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে কৃষির ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীর, তাৎপর্যপূর্ণ এবং কৌশলগত হয়ে উঠেছে।
সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২৪ সময়কালে সবজি উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২৪২ লাখ টনে পৌঁছেছে। বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান, চীন ও ভারতের পর তৃতীয়। বাজার মূল্য ভালো থাকা ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ায়
কৃষকরা সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, এমনকি শিক্ষিত তরুণরাও আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় সবজি চাষে যুক্ত হচ্ছেন। ফল উৎপাদন খাতেও গত দুই দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দেশে ফলের মোট উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন, যা বিশ্বে বাংলাদেশকে শীর্ষ দশ উৎপাদনকারী দেশের কাতারে স্থাপন করেছে। অর্থকরী ফসল পাটের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও আবাদি এলাকা কিছুটা কমেছে, তবে একরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। ২০১০ সালে পাটের জিন রহস্য উন্মোচনের পর উন্নত জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধিকে আরও সহজ করেছে। মৎস্য খাতও দেশের কৃষি খাতের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে মাছের উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন, সেখানে বর্তমানে তা প্রায় ৫০ লাখ টনে পৌঁছেছে। বিশেষ করে, ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। মাংস, ডিম ও দুধ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাংস ও ডিম উৎপাদনে দেশ স্বয়ম্ভর হলেও দুধ উৎপাদনে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে, যা বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে শিগগিরই পূরণ করা সম্ভব। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এসব পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি, যা নীতিগত সংস্কারের দাবি রাখে।
দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালে, কৃষি খাত গভীর ও নীরব সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এটি ক্রমেই জটিল রূপ নিচ্ছে। বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনের ওপর। অনিয়মিত ও অসময়ে বৃষ্টিপাত, কখনো অতিবৃষ্টি আবার কখনো দীর্ঘ খরা, পাশাপাশি ঘন ঘন বন্যার ঘটনা ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে। উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস করছে এবং বহু এলাকায় প্রচলিত ফসল উৎপাদন ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। এসব পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যা কৃষকের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ। এই জলবায়ুজনিত চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমির সংকট, যা কৃষির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং সড়ক, আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবাদযোগ্য কৃষিজমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যার চাপ ও উন্নয়ন চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত পথগুলো আর কার্যকর থাকছে না। এই বাস্তবতায় কৃষি উন্নয়নের মূল কৌশল হতে হবে সীমিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, অর্থাৎ কম জমিতে অধিক ফলন অর্জন করা এবং সেই উৎপাদন যেন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হয় তা নিশ্চিত করা। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল উৎপাদন পদ্ধতির সমন্বয় ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, আর এ সত্য উপলব্ধি করেই ভবিষ্যতের কৃষি নীতিকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে, যা সরাসরি তাদের উৎপাদন সিদ্ধান্ত ও জীবিকার নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। সার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পশুখাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য কৃষি উৎপাদনের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষককে শুরু থেকেই অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়, অথচ ফসল বিক্রির সময় সেই ব্যয় আদৌ উঠবে কিনা তা অনিশ্চিত থেকে যায়। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কৃষক বাড়তি ঝুঁকি বহন করেন, যা তাদের মানসিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে আবহাওয়া ও বাজার উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা থাকায় কৃষকের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
এই সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে কারণ দেশের অধিকাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, যাদের জমির পরিমাণ সীমিত এবং সঞ্চয় খুবই কম। দুর্বল আর্থিক সক্ষমতার কারণে তারা বাজার দরের ওঠানামার সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। একদিকে উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়ে, অন্যদিকে ফসলের বাজারমূল্য অনেক সময় প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় না। স্বল্প সুদের সহজলভ্য ঋণের অভাব এবং আনুষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থায় প্রবেশের জটিলতা অনেক কৃষককে মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, ফলে লাভের অংশ আরও সংকুচিত হয়। বাস্তবতা হলো, কৃষক উৎপাদনের সব ঝুঁকি বহন করলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, দুর্বল বাজারব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মূল্য ভোক্তা পর্যায়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এর ফলে কৃষকের শ্রম ও বিনিয়োগের ন্যায্য স্বীকৃতি মিলছে না এবং কৃষিতে টিকে থাকার প্রেরণাও ক্ষুন্ন হচ্ছে, যা সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
তবু বাংলাদেশের কৃষি খাতে সম্ভাবনার পরিসর মোটেও সীমিত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যন্ত্র কেনার পরিবর্তে ভাড়াভিত্তিক ব্যবহারের প্রবণতা কৃষকদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকছে এবং শ্রম সংকটের চাপও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্যসেবা, আবহাওয়া পূর্বাভাস, রোগবালাই সংক্রান্ত পরামর্শ এবং বাজার দরের হালনাগাদ তথ্য কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও তথ্যভিত্তিক ও সময়োপযোগী করে তুলছে। এসব প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ কৃষিকে ধীরে ধীরে একটি অনিশ্চয়তানির্ভর পেশা থেকে পরিকল্পনাভিত্তিক ও আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করছে। এর পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন শিল্পের বিকাশ কৃষির সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। ফসল কাটার পর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়লে ফসলের অপচয় কমবে এবং কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। আলু, সবজি, ফল ও দুধভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে কৃষিকে শিল্প খাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পথ তৈরি করছে।
টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারায় অগ্রসর হওয়ার ফলে কৃষি খাত ক্রমে আরও মানবিক ও সমাজবান্ধব রূপ ধারণ করছে। পুষ্টিকেন্দ্রিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরের আঙিনা, বসতভিটা কিংবা ক্ষুদ্র পরিসরের কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নারীরা এখন উৎপাদন ও পুষ্টি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা একদিকে পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার করছে, অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজে নারীর অর্থনৈতিক ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন সংস্থান নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে বাজারমূল্যের ওঠানামা ও চরম আবহাওয়ার অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলা। যদিও টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথে স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল হবে বহুমাত্রিক। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত শক্ত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই রূপান্তর একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন