‘লুক ইস্ট’ পররাষ্ট্রনীতির এখনই সময়
মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকনউদ্দিন (অব.) [প্রকাশ : যুগান্তর, ১১ মার্চ ২০২৬]

বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট’ নীতি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংহতি এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন বাজার, বিনিয়োগের সুযোগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে। এশিয়ার দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতাকে বাড়াতে পারে এবং একক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সংযোগ স্থাপন ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি এবং সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘লুক ইস্ট’ নীতি এ কারণেই সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য।
‘লুক ইস্ট’ পররাষ্ট্রনীতি একটি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, যা বহু দেশ গ্রহণ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য। এই নীতিমালা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ অঞ্চলটির অর্থনৈতিক গতিশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট সংযোগকারী কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ‘লুক ইস্ট’ নীতি কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা নয় বরং একটি প্রয়োজন, কারণ এটি মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে, প্রতিবেশী অঞ্চলের দ্রুত বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
‘লুক ইস্ট’ নীতির ধারণা ছিল মূলত কৌশলগত দূরদর্শিতার ফল, একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একমুখী নির্ভরতার বাইরে এনে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন, তা কেবল একটি ভৌগোলিক দিকনির্দেশনা ছিল না; এটি ছিল একটি বৃহত্তর কৌশলগত চিন্তা-বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি রূপরেখা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকাংশে আঞ্চলিক বাস্তবতা ও কয়েকটি বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের দরকার নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ উৎস এবং নতুন কৌশলগত অংশীদার। পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং পরে চীনের দ্রুত উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
তার দৃষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং একই সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করা ছিল পরস্পর-সম্পূরক কৌশল। এ প্রেক্ষাপটে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন তথা সার্কের প্রতিষ্ঠা ছিল একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। সার্কের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ এশিয়াকে একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন, যাতে পারস্পরিক বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়ে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল জটিল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং ভারতের আঞ্চলিক প্রাধান্য বজায় রাখার প্রবণতা সার্কের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এবং দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো সার্ককে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক জোটে পরিণত হতে দেয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি জিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
‘লুক ইস্ট’ নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক বাস্তববাদ। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তখন রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত উন্নতির পথে ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়া বুঝেছিলেন যে, বাংলাদেশ যদি তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে-বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে। এটি ছিল এক ধরনের কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ, যাতে বাংলাদেশ কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর অতি নির্ভরশীল না থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাষ্ট্রপতি জিয়ার আকস্মিক ও অকাল মৃত্যু এই নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে। নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কূটনৈতিক উদ্যোগ, সক্রিয় আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা এবং বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শিথিল হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার শাসনামলে ‘লুক ইস্ট’ নীতি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার সম্ভাব্য সুবিধা স্বীকার করে, তার প্রশাসন বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ অনুসন্ধান করেছিল। তবে, এ প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়েছিল, যার পেছনে মূল কারণ ছিল দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সুসংহত কৌশলের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব। এ ছাড়াও, ভারতের প্রতিরোধমূলক মনোভাব এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে বাধা প্রদান নীতির উন্নয়নে আরও বাধা সৃষ্টি করেছিল। গত ষোল বছরে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে, বাংলাদেশের ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে, যা বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্র সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তাকে আগের চেয়ে বেশি জরুরি করে তুলেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া রক্তাক্ত বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে এবং স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক রাজনৈতিক এবং কৌশলগত চিন্তাবিদ এখন যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশ আর ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চালিয়ে যেতে পারবে না। কারণ ভারত ঐতিহাসিকভাবে তার ছোট প্রতিবেশীদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার জন্য নীতি অনুসরণ করেছে। এই অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রায়ই বাংলাদেশের স্বার্থ স্বাধীনভাবে পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করেছে। এই বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য তাদের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করার এবং বৈচিত্র্যময় অংশীদারত্ব ও আরও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক ভূমিকা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করা কেবল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে না বরং একটি একক আঞ্চলিক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে, এর মাধ্যমে স্থিতিস্থাপকতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রবেশদ্বার হিসাবে একটি অনন্য সুবিধা প্রদান করে। আঞ্চলিক সংযোগের ওপর পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব বাংলাদেশের বাণিজ্য ও পরিবহণের কেন্দ্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর এবং বিমসটেকের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জন্য তার অবকাঠামো, যেমন মহাসড়ক, রেলপথ এবং বন্দর উন্নয়নের প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে। চট্টগ্রাম এবং পায়রা বন্দর আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের একীকরণ সক্ষম করে। এ সুযোগগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করে।
অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ‘লুক ইস্ট’ নীতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মূল্য বহন করে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলটি বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং জাপানের মতো প্রধান খেলোয়াড়রা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে এবং তার কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে। এই সক্রিয় সম্পৃক্ততা বাংলাদেশকে একটি নিরপেক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসাবে অবস্থান করতে সক্ষম করে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম।
পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব গ্রহণের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অঞ্চলের একটি উদীয়মান শক্তি হিসাবে তার স্থান সুরক্ষিত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বিকশিত প্রেক্ষাপটে, ‘লুক ইস্ট’ নীতি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রাধান্যের একটি কৌশলগত পথ প্রদান করে। পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করে এবং প্রচলিত মিত্রদের ওপর নির্ভরতাকে হ্রাস করে, বাংলাদেশ একটি আরও স্বাধীন এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। এখনই সময় এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার, পূর্ব এশিয়া প্রদত্ত সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.) : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক