কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চাপ সামলাতে জরুরি কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা

এম কবির হাসান [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ১০ মার্চ ২০২৬]

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চাপ সামলাতে জরুরি কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের জন্য এখন আর কোনো কূটনৈতিক নাটক নয়; এটি সরাসরি অর্থনীতির ওপর আঘাত হানার মতো এক বহুমাত্রিক ঝুঁকিও বটে।

 

 

 

এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে গোটা বিশ্বে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একদিকে রফতানি ব্যয় বাড়ছে আবার মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বাড়তি চাপ পড়েছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধের নেতিবাচক অভিঘাত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও নানা সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে। চলতি মাসেই বিশ্বের জ্বালানি তেল বাজারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে পরিস্থিতির ভার বোঝা যাবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনো অস্থির। হরমুজ প্রণালি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল ব্যাহত এবং কাতার থেকে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলেও এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সরাসরি বাজারে অনুভূত হচ্ছে।

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

ঝুঁকিমুক্ত নয় আমাদের শিল্প খাতও। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের মেরুদণ্ড তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু এ খাত আমদানি করে তুলা, সুতা ও কাপড়, রঙ ও রাসায়নিক দ্রব্য, আনুষঙ্গিক উপকরণ, যন্ত্রপাতি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ ও জ্বালানি মূল্য বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ডেলিভারিতে বিলম্ব ও বাজার অনিশ্চয়তার কারণে মূল্যছাড় দাবি করবেন। ফলে রফতানিকারকদের লাভের মার্জিন সংকুচিত হবে। শুধু পোশাক শিল্পই এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবে এমন নয়। ওষুধ শিল্প, সিরামিক, ইস্পাত, প্লাস্টিক, বিমান পরিবহন ও লজিস্টিকস—সব খাতই জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের কারণে ব্যয়চাপে পড়বে। বাংলাদেশের মতো প্রতিযোগিতামূলক রফতানি অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যয় সামান্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। পোশাক খাতের পরিসর বিবেচনায় হয়তো এ ব্যয়ভার বহন সম্ভব। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতগুলোর পক্ষে অনেক সময় বাড়তি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। এগুলো সবই পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব।

 

 

 

ঝুঁকি বেড়েছে প্রবাসী আয়প্রবাহেও। আমাদের দেশের বিরাট একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম বিনিয়োগ করে অর্থ উপার্জন করেন। প্রবাসী নাগরিক বলে পরিচিত এ অংশের নিরাপত্তা ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যে বেড়েছে। স্বল্পমেয়াদে তেলের উচ্চমূল্য উপসাগরীয় অর্থনীতিকে কিছুটা শক্তিশালী রাখতে পারে, ফলে কর্মসংস্থান স্থিতিশীল থাকতে পারে। অনেক প্রবাসী অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বেশি অর্থ দেশে পাঠাতেও পারেন। তবে এটা সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদের বিবেচনা এটিকে ইতিবাচক ভাবা যাবে না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়া মানেই জীবনযাপনের জটিলতা বাড়া। তখন প্রবাসীদের উপার্জনের উপায় কম থাকলে তাদের নিজেদের জীবনযাপনের মানও অনুন্নত হবে। আবার নিরাপত্তা ঘাটতি থাকলে তারা উপার্জনক্ষমতাও হারাতে পারেন। এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ভিন্ন চিত্র তৈরি করতে পারে। যেমন নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস, বেতন পরিশোধে বিলম্ব, ব্যাংকিং ও মানি ট্রান্সফারে বিঘ্ন, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ও শ্রমিক প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা। এ পরিস্থিতি তৈরি হলে আমদানি বিল বৃদ্ধির সময়ই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাবে যা চলতি হিসাব ও রিজার্ভের ওপর দ্বৈত চাপ সৃষ্টি করবে।

 

 

 

অর্থনীতির সঙ্গে যে কূটনৈতিক ভারসাম্যের সরাসরি সংযোগ আছে, এ বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এ সংকট কেবল বাজার বিশ্লেষণের বিষয় নয়; এটি কৌশলগত কূটনীতির পরীক্ষাও। বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে (বাণিজ্য ও কূটনীতি); মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে (রাজনৈতিক ও সামাজিক সংযোগ); সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে (জ্বালানি ও শ্রমবাজার) এবং ইরানের সঙ্গে (আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য)। আমাদের কূটনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য, আমরা সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চাই। কিন্তু ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কোনো না কোনো পক্ষে ঝুঁকে পড়তেই হয়। তার পরও যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে আমাদের স্বার্থ আদায় করে নিতে হবে। ভাবতে হবে, একপক্ষীয় অবস্থান অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বাস্তববাদী নিরপেক্ষতা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক অবস্থান এবং প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।

 

 

 

সবার মনেই প্রশ্ন এখন কী করা জরুরি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় ভাবা যেতে পারে। উদ্যোগগুলো হতে পারে—১. অর্থনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা সেল: অর্থ, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রবাসীকল্যাণ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয়ে জরুরি টাস্কফোর্স গঠন ২. জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা: বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, এলএনজি মজুদ বৃদ্ধি, মূল্যঝুঁকি হেজিং ৩. খাদ্য ও সার আমদানির আগাম পরিকল্পনা: বিলম্বিত আমদানি এড়িয়ে আগাম চুক্তি ৪. বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা: জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ডলার চাহিদা বাড়বে—কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রস্তুত থাকতে হবে ৫. রফতানি সহায়তা প্যাকেজ: কার্যকরী মূলধন সহায়তা, দ্রুত কাস্টমস সেবা, লজিস্টিকস সুবিধা ৬. প্রবাসী সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স চ্যানেল সচল রাখা: দূতাবাসভিত্তিক সহায়তা, জরুরি প্রত্যাবাসন প্রস্তুতি।

 

 

 

বাংলাদেশ অতীতে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে উঠেছে—মহামারী, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট। কিন্তু সহনশীলতা মানেই অরক্ষিত থাকা নয়। স্বল্পমেয়াদি সংঘাত সামাল দেয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। হরমুজ প্রণালি অস্থিতিশীল থাকলে, জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে, এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে এবং উপসাগরীয় শ্রমবাজার সংকুচিত হলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। এ যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স, রফতানি প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন। প্রস্তুতির সময় এখনই। দেরি হলে মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে।

 

 

এম কবির হাসান: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক