কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

মেধাসম্পদ ও খেলাধুলা: প্রস্তুতি নিন, উদ্ভাবন করুন

মনজুরুর রহমান [প্রকাশ : খবরের কাগজ, ২৬ এপ্রিল ২০২৬]

মেধাসম্পদ ও খেলাধুলা: প্রস্তুতি নিন, উদ্ভাবন করুন

বিশ্বের সবকিছুরই পেছনে কোনো না কোনোভাবে কাজ করছে IT ও IP। যদি বলি বর্তমান যুগ IT ও IP-এর যুগ; তা হলে হয়তো অত্যুক্তি হবে না! কারণ, একালের আমরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এক শ থেকে দেড় শ আইপি বা মেধাসম্পদ ব্যবহার করছি, নিচ্ছি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা।...

 

 


একবিংশ শতাব্দীর অস্থির যুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ এই পৃথিবীর দিকে যখন তাকাই; উন্নয়ন ও ধ্বংসের খতিয়ান মেলাতে বসি, তখন অনুভব করি বর্তমান বিশ্বের সবকিছুরই পেছনে কোনো না কোনোভাবে কাজ করছে IT ও IP। যদি বলি বর্তমান যুগ IT ও IP-এর যুগ; তা হলে হয়তো অত্যুক্তি হবে না! কারণ, একালের আমরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এক শ থেকে দেড় শ আইপি বা মেধাসম্পদ ব্যবহার করছি, নিচ্ছি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা। সর্বজন স্বীকৃত সত্য এই যে, আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তিও মূলত আইপি বা মেধাসম্পদ বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদেরই অন্তর্গত।

 

 

দুই
পৃথিবীব্যাপী মেধাসম্পদবিষয়ক রীতিনীতি, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, পরিচালনা পদ্ধতি, অর্থনৈতিক বিষয়াদি, বিকাশ, সুরক্ষা এবং সমতা বিষয়ে জাতিসংঘভুক্ত যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে তার নাম WIPO বা আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংস্থা। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত জেনেভাস্থ এ সংস্থাটি শিল্পজাত মেধাসম্পদ এবং সাংস্কৃতিক মেধাসম্পদের দুনিয়াব্যাপী উন্নয়ন ও সুরক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ড দেখভাল, পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকে।

 


মেধাসম্পদ বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সম্পর্কে সচেতনতা এবং দেশে দেশে এর গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে WIPO প্রতি বছর ২৬ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস’ হিসেবে উদ্‌যাপন করছে। পৃথিবীর ১৯৪টি দেশে দিবসটি একই গুরুত্বের সঙ্গে পালনের জন্য WIPO প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। গত বছর সংস্থাটি সাংস্কৃতিক সম্পদ ‘সংগীত’-কে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছিল। এ বছর অর্থাৎ ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘IP and Sports: Ready, Set, Innovate’। আমরা বাংলায় অনুবাদ করেছি ‘মেধাস্বত্ব ও খেলাধুলা: প্রস্তুতি নিন, উদ্ভাবন করুন’।

 

 

তিন
আদিবাসী অরণ্যচারী মানুষ পৃথিবী সৃষ্টির পর কোটি কোটি বছর পার করেছে, যাপন করেছে আরণ্যক যাযাবর জীবন! গাছের ফলমূল খেয়ে, পশু শিকার করে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত জল পান করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তারও বহু বছর পর পত্তন ঘটে কৃষি সভ্যতার, সৃষ্টি হয় শ্রম বিভাজনের। এ পর্যায়ে এসে অবসরের সময় কাটানোর জন্য সংস্কৃতি এবং ক্রীড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় মানুষ। বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া। সে সময় শারীরিক কসরত এবং প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত দ্রব্যসামগ্রী ছিল মানুষের আনন্দদানের উপকরণ। অতঃপর, সভ্যতা যত বিকশিত হয়েছে, কাল পরিক্রমায় ধীরে ধীরে তাতেও এসেছে বিবর্তন ও ঋদ্ধি। এ যুগে এসে সব ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব সাফল্য আমরা দেখছি ক্রীড়া ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তা কল্পনারহিত ও বিস্ময়কর! সৃষ্টিশীল মানবসৃষ্ট এসব কর্মই সচেতন মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘মেধাসম্পদ’ হিসেবে।

 

 

অপরাপর বিচিত্র ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়া ক্ষেত্রের উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতির পেছনেও রয়েছে শিল্পজাত মেধাসম্পদ (Industrial Intellectual Property) এবং সাংস্কৃতিক মেধাসম্পদ (Cultural Property)-এর অনন্য অবদান। বস্তুগত সম্পদের বাইরে এই দুই সম্পদ ‘ক্রীড়াশিল্পের’ উদ্ভাবন, বৈশ্বিক-উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দান করেছে গতিময়তা ও সুরক্ষা। একখণ্ড বনজ কাঠ যখন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হাতে ক্রিকেট ব্যাট বা উইকেটে রূপান্তরিত হয় তখন বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়! ওই ব্যাট বা উইকেটের শরীরে যুক্ত হয় অন্তত তিনটি আইপিজাত অনুষঙ্গ প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক।

 

 

সফটওয়্যার তথা ইন্টারনেটের এ যুগে এসে আমরা ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক মেধাসম্পদের পারস্পরিক নির্ভরতাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারি না। কারণ ফুটবল থেকে টেনিস/ আইস স্কেটিং পর্যন্ত প্রতিটি ক্রীড়া ক্ষেত্রেই উদ্ভাবক ও নির্মাতারা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন ক্রীড়া নৈপুণ্যের সীমা ছড়িয়ে দিতে; দর্শকদের রুচি ও অভিজ্ঞতাকে উন্নত করে ক্রীড়া আয়োজনকে সংস্কৃতিবান মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে।

 

 

মেধাস্বত্ব অধিকার এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত আইনি সুরক্ষা সব স্রষ্টা-উদ্ভাবক ও বাণিজ্যিক লেনদেনে ভারসাম্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। ফলে সৃষ্টি হয় ক্রীড়া জগতের অর্থনৈতিক মূল্য সুরক্ষার সম্মানজনক কৌশল; এগিয়ে যায় বাধাহীন সংশ্লিষ্ট শিল্প। শিল্পের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে ক্রীড়া সংস্থাগুলো উচ্চপর্যায়ের ক্রীড়া আয়োজনে অর্থ লগ্নী করতে সক্ষম হয়। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বাইরে পারে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া উন্নয়নে সহায়তা করতে। ক্রীড়াশিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশে দেশে সরকারি/ বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতেও অবদান রাখে নিশ্চিতরূপে।

 

 

চার
মেধাসম্পদের সব স্রষ্টা, ভোক্তা ও বাণিজ্যিক কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য WIPO যেমন নীতিমালা, বিধিবিধান ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে, তেমনি ক্রীড়া বা Sports-এর জন্যও সংস্থাটি প্রণয়ন করেছে ‘Reference guide to Sustaining Sport and it’s Develoment Through Intellectual Property Rights’ শীর্ষক নির্দেশিকা। মেধাস্বত্ব অধিকারের মাধ্যমে ক্রীড়ার স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন বিষয়ক এ নির্দেশিকায় প্রদত্ত একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করি। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বহুল পরিচিত অলিম্পিকের সম্পদ সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছে ‘নাইরোবি ট্রিটি’ যার পূর্ণ নাম ‘Protection of The Olympic Properties and The Olympic Symbol’। ওই ট্রিটিতে অলিম্পিক প্রতীকের প্রকৃত অবয়ব বর্ণিত হয়েছে। তা হলো ‘The Olympic Symborl consists of five interlaced rings: blue, yeallow, black, green and red, arranged in that order from left to right. It consists of the Olympic rings alone, whether delineated in a single color in different colors’। বিভিন্ন কারণে বর্ণিত প্রতীকের ভুল উপস্থাপনা নৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে বিধায় অনুরূপ বিধান রাখা হয়েছে।

 

 

ওই নির্দেশনার বাইরে যেকোনো জাতিক ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ১. ট্রেডমার্ক আইন, ২. ডিজাইন অ্যাক্ট, ৩. কপিরাইট ও আনুষঙ্গিক অধিকার আইন, ৪. ইমেজ অধিকার আইন এবং ৫. অসম প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে আইনের বিধানাবলি প্রতিপালন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ‘নাইরোবি ট্রিটিতে’। পৃথিবীব্যাপী অভিন্ন নীতিমালা মান্য করলে যে স্বচ্ছতার সৃষ্টি হয় তার জন্য এ নির্দেশনা সবার জন্য অনুসরণীয়। উল্লেখ্য, অলিম্পিক প্রতীকটি মেধাসম্পদ আইনে ‘সার্ভিস মার্ক’ হিসেবে স্বীকৃত।

 

 

পাঁচ
স্পোর্টস বা খেলাধুলা কেবল বিনোদন বা সময় ক্ষেপণের পদ্ধতি নয়, শারীরিক-মানসিক বিকাশের উপকরণ নয়; বরং জাতিক এবং আন্তর্জাতিক সমাজ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং পণ্য বিনিময়ের অনন্য এক নন্দিত পদ্ধতি; সৌহার্দ্য বৃদ্ধির অনন্য উপায়। কূটনীতির ভিন্নতর কৌশল।

 

 

তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ পৃথিবীর অন্য ভূখণ্ডের চলমান ক্রীড়ার সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। আর এর সবকিছুই সম্ভব হচ্ছে ক্রীড়া বা খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্কিত মেধাসম্পদের ভূমিকার কারণে। খেলাধুলার জগৎ যেমন বিস্তৃত ও বিশাল, তেমনি খেলাধুলার জন্য উপায়-উপকরণের নির্মাণ বা বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও বিপুল। মেধা দিয়ে, প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞতা দিয়ে, শ্রম দিয়ে সেসব মানুষ আমাদের নিরন্তর ঋণী করে চলেছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অবদানকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে সুস্পষ্ট অবহেলার কারণে, সচেতনতার অভাবে।

 

 

ছয়
পৃথিবীব্যাপী মানুষ বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রের সাফল্যের বিষয়ে অবগত। সীমিত সংখ্যক ক্ষেত্র ছাড়া এখনো আমরা ক্রীড়ার সব ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ উন্নয়ন ও বিকাশ অর্জনে পিছিয়ে আছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের মেধাবী সম্পদ সৃষ্টিকারীদের অবদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমাদের নবীন প্রজন্মকেও অবহিত করতে হবে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পেশা হিসেবে যোগ্য ক্রীড়াবিদ হওয়ার বর্ণিল কাহিনি। মেধাবী স্বপ্নভুক সন্তানদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে উপায়-উপকরণ এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের গুঢ় রহস্য। পরিপূর্ণ সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করার জন্য অনেক দেশের মতো এখনো চলছে আমাদের প্রস্তুতিকাল। একনিষ্ঠ সাধনা এবং সুদৃঢ় শৃঙ্খলার অনুশীলন ও চর্চার মধ্যদিয়েই কেবল তা সম্ভব অর্জন করা।

 

 

তাই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করে আসুন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মিলিত নিষ্ঠা, সংগ্রাম ও সাধনায় ব্রতী হই; অঙ্গীকারাবদ্ধ হই; নেমে পড়ি দেশ ও জাতির কল্যাণে; উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করি বাংলাদেশের ক্রীড়া জগৎকে। অসংখ্য মানুষের মণিকোঠায় স্বপ্নকে জাগিয়ে তুলে উচ্চারণ করি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

 

 

জয় হোক মেধাসম্পদ সৃষ্টিকারী সব মানুষের।

 

 

লেখক: সদস্য, কপিরাইট বোর্ড