মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি : এখনই প্রয়োজন রোডম্যাপ
সম্পাদকীয় [প্রকাশ : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, প্রতিদিনের বাংলাদেশ]

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি মনে করেন, বর্তমানে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত ইইউর বাজারে অব্যাহতভাবে প্রবেশাধিকার পায়, সেজন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনার কথাও বলেন। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্সে (ইউরোচেম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সময় বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্ক আরও মসৃণ করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ জোরদারে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় সুযোগ পেতে পারে। দক্ষ শ্রমশক্তি ও তুলনামূলক কম ব্যয় বাংলাদেশের বড় শক্তি। তিনি জানান, সরকার একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করা। আলোচনায় ইউরোচেমের চেয়ারপারসনও মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা হারাতে পারে। তাই এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরু করা জরুরি। তার মতে, এ ধরনের চুক্তি হলে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উন্নত পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও জোরদার হবে।
এ কথা সত্য, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প। আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে এই খাত থেকেÑ যার প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এমন বাস্তবতায় ইইউর বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখা শুধু বাণিজ্যিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবেশাধিকার বজায় রাখার আহ্বান সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশ সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পন্ন করেছে, যার ফলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩০০-এর বেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় সরকার। আমরা মনে করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ হলে আমাদের বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইইউর ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। ফলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকছে।
প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানের মূল তাৎপর্য এখানেইÑ ইইউ যেন উত্তরণ-পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ট্রানজিশন সুবিধা দেয়। এটি কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন বাস্তবতা, শ্রমনির্ভর অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি। কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শুধু দেশের কোটি মানুষের জীবিকার উৎস নয়, ইউরোপীয় ভোক্তাদের জন্যও সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য পণ্যের জোগানদাতা।
আমরা মনে করি, শুধু আহ্বানেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ইইউ বারবার শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন ও মানবাধিকার বিষয়ে অগ্রগতির ওপর জোর দিয়ে আসছে। বাংলাদেশকে এই ক্ষেত্রগুলোতে বাস্তব ও দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে এখন থেকেই সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এসব ইইউকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়, দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখা কেবল একটি বাণিজ্যিক ইস্যু নয়; এটি দেশের উন্নয়ন যাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন এই আহ্বানকে বাস্তব কৌশল ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। কেননা লক্ষ্য অর্জনের এখনই রোডম্যাপ প্রয়োজন।