পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর : পানিবণ্টনে সুরাহা কাম্য
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন [প্রকাশ : যুগান্তর, ০৮ এপ্রিল ২০২৬]

আগামী ডিসেম্বরের ফারাক্কা চুক্তি নবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর শুধু একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি হতে পারে একটি পুনর্নির্ধারণমূলক মুহূর্ত-যেখানে ইতিহাস, বাস্তবতা এবং জনমতের নতুন চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের শিকড় নিহিত রয়েছে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে। ১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয় এবং ভারত সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, যা ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দুই দেশের সম্পর্ককে একটি বিশেষ মাত্রা দিলেও পরবর্তী দশকগুলোয় সম্পর্কের মধ্যে উত্থান-পতন অব্যাহত থাকে।
সীমান্ত বাস্তবতা নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার, যা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি। এ সীমান্তে বহু অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সহিংসতা ঘটে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, গত দুই দশকে শত শত বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন, যার বেশির ভাগ ঘটনায় বিএসএফ-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং এটি জনমনে ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের উৎস।
পানি কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর একটি। গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য ফারাক্কা চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির আওতায় শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) পানির ভাগ নির্ধারণ করা হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে পানির প্রবাহ প্রায়ই চুক্তির প্রতিশ্রুতির তুলনায় কম থাকে। ফারাক্কা বাঁধ, যা ১৯৭৫ সালে চালু হয়, সেটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যা। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে এক দশকেরও বেশি আলোচনা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। তিস্তা অববাহিকায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করে, যাদের জীবিকা কৃষিনির্ভর। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলে মারাত্মক সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। ২০১১ সালে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আপত্তির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫-১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে এ বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি যেখানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে আমদানি ১২-১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ভারত বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিলেও অ-শুল্ক বাধা এবং সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকে সীমিত করে রেখেছে।
নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ইস্যুটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল মাত্রা, যা শুধু রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সরাসরি জনমত, আস্থার পরিবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কার্যক্রম নিয়ে যে অভিযোগ, সন্দেহ এবং জনমানসে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতের জন্য বাংলাদেশ একটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী-ভৌগোলিক সংযোগ, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম দমন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এ কার্যক্রমগুলোকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসাবে দেখা হয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা বিদ্যমান যে, কিছু ক্ষেত্রে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে নির্বাচনি প্রক্রিয়া, সরকার গঠন বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে। যদিও এ অভিযোগগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ প্রমাণ জনসমক্ষে উপস্থাপিত হয়নি, তবুও জনমনে এ ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে, যা বাস্তবতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ আন্দোলনের অন্যতম মূল সুর ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ফলে জনগণের একটি বড় অংশ এখন যে কোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপকে অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখছে। এ পরিবর্তিত মনোভাবের কারণে গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্ন উঠছে এবং রাজনৈতিকভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ‘ধারণা বনাম বাস্তবতার’ প্রশ্ন। অনেক সময় গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম স্বাভাবিক কৌশলগত নজরদারি বা নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হলেও তা জনমনে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। যখন স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তখন গুজব, সন্দেহ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য এই শূন্যস্থান পূরণ করে। ফলে বাস্তবতার চেয়ে ধারণাই বেশি প্রভাব বিস্তার করে। দ্বিতীয়ত, আস্থার ঘাটতি। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা অতীতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনেছে, বিশেষ করে উগ্রপন্থা দমন, সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপের ক্ষেত্রে। কিন্তু যখন এ সহযোগিতা একপাক্ষিক বা গোপন প্রভাব হিসাবে বিবেচিত হয়, তখন তা আস্থার সংকট তৈরি করে।
এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সম্পর্ককেও দুর্বল করতে পারে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রতিফলন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় এ ইস্যুটিকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করে। ফলে গোয়েন্দাসংক্রান্ত অভিযোগ শুধু নিরাপত্তা আলোচনার বিষয় থাকে না, বরং এটি একটি রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়, যা জনমতকে আরও প্রভাবিত করে। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যযুদ্ধ। বর্তমান যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রচারিত হয়। বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ, গোয়েন্দা তৎপরতার গুজব বা অতিরঞ্জিত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়, যা জনমনে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তোলে। এ তথ্যযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ বাস্তবতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো নতুনভাবে আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশ হয়তো জোর দেবে পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপের নীতি এবং স্বচ্ছতার ওপর। একই সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে গোয়েন্দা সহযোগিতাকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করার প্রস্তাবও আসতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে যে, তাদের কার্যক্রম শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনের স্বার্থেই সীমাবদ্ধ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ ধরনের আশ্বাস এবং বাস্তব পদক্ষেপ আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ইস্যুতে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আস্থার ঘাটতি দূর করা। এটি শুধু কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং ধারাবাহিক আচরণ, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। অন্যথায়, এ ইস্যুটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি স্থায়ী দুর্বলতা হিসাবে রয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলবে। এছাড়া আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বেড়েছে, যেমন : পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্য বড় প্রকল্প। এতে ভারত তার কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে, আর বাংলাদেশ চেষ্টা করছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চলতি ভারত সফরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে-ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন, তিস্তা সমস্যার সমাধান, সীমান্তে সহিংসতা হ্রাস, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে আস্থা বাড়ানো। সম্ভাব্য ফলাফল হিসাবে বলা যায়, এ সফরে সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না হলেও কিছু কাঠামোগত অগ্রগতি হতে পারে। যেমন : পানিবণ্টন নিয়ে একটি যৌথ রোডম্যাপ, সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে নতুন প্রটোকল, অথবা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন উদ্যোগ।
সবশেষে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির ওপর। ইতিহাসের বন্ধন যেমন এই সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে, তেমনই অমীমাংসিত ইস্যুগুলো তা দুর্বল করেছে। এখন প্রয়োজন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উভয় দেশ একে অপরকে সমান মর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করবে এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে। তাহলেই এ সম্পর্ক একটি স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক