প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান
অলোক আচার্য [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬]

বিশ্বে এআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে, খুব শিগগিরই এটি মানুষের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে এতে কোনো সন্দেহ নেই। গত কয়েক বছরেই, এআই বিশ্বব্যাপী হিংস্র দানবের মতো রাজত্ব করছে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এআই মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। সত্য হলো যে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছি এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় নেই।
মানুষ একবার বিজ্ঞানের যে কোনো শাখায় প্রবেশ করলে, ফিরে আসার উপায় থাকে না। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে চাকরির বাজার, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খেলার মাঠ, সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার মানুষের জন্য একদিকে আশার আলো, অন্যদিকে হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা কি সত্যিই এ পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত? বর্তমানে এআই সম্পর্কিত বার্ষিক রাজস্ব প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা অ্যাপলের মোট বার্ষিক রাজস্বের এক-অষ্টমাংশ। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এখন মনোযোগ এআই-এর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবের দিকে সরে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এই প্রভাবগুলো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।
বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ ChatGPT ব্যবহার করে। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর মতে, ২৫০ জনেরও বেশি কর্মচারীসহ মাত্র ১০ শতাংশ কোম্পানি তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও সংহত করেছে। জুলাই মাসে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি জরিপে দেখা গেছে, কোম্পানিগুলোতে আরও পরীক্ষামূলক উদ্যোগের ৯৫ শতাংশ কোনো আর্থিক সুবিধা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতে অক্টোবরের শুরুতে, মার্কিন S&P ৫০০ সূচকের মোট বাজার মূল্যের ৪৪ শতাংশ এআই-নির্ভর কোম্পানিগুলোর হাতে ছিল। ভবিষ্যৎ আয়ের তুলনায় এই কোম্পানিগুলোর মূল্য বা মূল্যায়ন সূচক ছিল ৩১, যেখানে সমগ্র সূচকের গড় ছিল ১৯।
আমরা সবাই আজ শিল্পবিপ্লবের ধারণার সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। কারণ শিল্পবিপ্লবের পর্যায় অতিক্রম করার পরেই আজকের যান্ত্রিক সভ্যতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। কৃষিভিত্তিক সমাজে, শিল্প তার স্থান দখল করছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পবিপ্লবের পূর্ববর্তী অর্থনীতির গতিশীলতা এবং শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী অর্থনীতির গতিশীলতা ভিন্ন। বলা যেতে পারে, শিল্পবিপ্লব অর্থনীতির গতিতে এক জাদুকরী পরিবর্তন এনেছে। মানুষের অভ্যাস এবং রুচিতে পরিবর্তন এসেছে। প্রথম শিল্পবিপ্লবের বহু যুগ পর, আজ আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। বাকি শুধু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা।
প্রথম শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। কৃষি ও শিল্পে যান্ত্রিকীকরণ চালু হয়েছিল। প্রথম শিল্পবিপ্লবের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। উৎপাদন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন মানব শিল্পের বিকাশকে বদলে দিয়েছে। কৃষি থেকে কারখানা প্রক্রিয়াকরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত। আমরা প্রধানত বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করি। এবং তৃতীয় শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধনকারী বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহারের পর, ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হলে শিল্পবিপ্লব পূর্ণ গতি লাভ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠছে। এটি বিশ্বের দূরবর্তী দেশগুলোকে আরও কাছে নিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণরূপে যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। বর্তমানে বিশ্ব একটি বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে।
সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের লক্ষ্য, একটি উন্নত জাতি হওয়া। উন্নত জাতি হতে হলে, আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিগত সুবিধার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দারিদ্র্যের হার শূন্যে নামিয়ে আনা, দেশকে ক্ষুধামুক্ত, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বৈষম্য কমিয়ে আনা জরুরি। সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করছে। এর জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল শক্তি আমাদের কর্মসংস্থান খাতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে, মানুষের শ্রমের পরিবর্তে সেই জায়গাগুলোতে রোবট দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই হার আরও বাড়বে। মূলত চাকরির বাজার এবং এর ধরনে পরিবর্তন আসবে।
যদি আমরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারি, তাহলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রথম ধাক্কা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তবে, সম্প্রতি এই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। প্রযুক্তি বিকাশ মানুষের অনেক সময় সাশ্রয় করবে এবং এটি তাদের অন্যান্য কাজ করার সুযোগ দেবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে, যেসব চাকরি হারিয়ে যাবে, তার জায়গায় নতুন চাকরি তৈরি হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোবট এবং অ্যালগরিদমের কারণে বিভিন্ন চাকরির উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তবে এর ফলে নতুন চাকরির সুযোগও তৈরি হবে। অন্য কথায় প্রযুক্তি যদি আমাদের কর্মসংস্থানের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে, তাহলে সমাধান এই প্রযুক্তিতেই নিহিত। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা করার জন্য, প্রয়োজনীয় দক্ষতার একটি তালিকা তৈরি করেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দ্রুততর করবে। শিল্পোন্নত দেশগুলো দ্রুত থেকে দ্রুততর যানবাহন তৈরিতে ব্যস্ত। রাস্তা, আকাশ, সমুদ্র এবং রেলপথ, সব দিকেই গতি বাড়ছে। দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রম সহজ হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার আপনাকে সেই সুবিধা দেবে। কেবল নিজেকে প্রস্তুত করার কাজটি করতে হবে। আমরা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি।
ইতিমধ্যেই আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাসহ তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশের ৪জি ইন্টারনেট প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য, আমরা এখন দেশের মধ্যে প্রথম ৫জি ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। একটি হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে কাজে লাগাতে হলে, সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এজন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা প্রয়োজন। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই কর্মসংস্থান হবে প্রযুক্তিনির্ভর। বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করতে চায় এবং তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। এক সময় বিদেশের প্রযুক্তি পণ্যে ব্যবহৃত হতো। আজ দেশে ব্যবহৃত হওয়ার পরেও দেশীয় পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমরা আমাদের দক্ষতা দিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করব এবং পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য নিজেদের দক্ষ করে তুলব। এর বাইরে আপাতত বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।