কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি

রায়হান আহমেদ তপাদার  লন্ডন থেকে [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১২ মার্চ ২০২৬]

পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি

সম্প্রতি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়া বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক ফলাফল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইরানে হামলার জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইসরায়েল। সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, যার অনেকগুলোই জায়োনিস্ট রাষ্ট্রের বহুল প্রচারিত ও অহংকারের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাভেদ করে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। ইসরায়েল বহুদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে ধারণা করা হয়। যদিও তারা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি এবং কৌশলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি বা নন-প্রোলিফিরেশন ট্রিটি তথা এনপিটিতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কেন্দ্র বলা হয়, ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্র, যা নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, ইসরায়েলের হাতে ৮০ থেকে ২০০টির মতো পারমাণবিক অস্ত্র আছে। এ স্পর্শকাতর বিষয়টি ইসরায়েল কখনোই স্পষ্টভাবে স্বীকার বা অস্বীকার করে না। অথচ এতটা লুকোচুরি করার পরও, পশ্চিমা কোনো দেশ ইসরায়েল নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে না। উল্টো তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়।

 
 
 

রাশিয়া, চীন, ভারত কিংবা তুরস্ক দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও বর্তমান যুদ্ধে তেহরানের পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় একঘরে হয়ে থাকা ইরান বছরের পর বছর ধরে যাদের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, এখন হামলার মুখে দাঁড়িয়ে তাদের কাছ থেকে কেবল মৌখিক আশ্বাসের বেশি কিছু পাচ্ছে না দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন ইরানের জন্য এক নিঃসঙ্গ যুদ্ধ। চীন ইরানের তেলের বড় ক্রেতা, আবার উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়া সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার মুখে এই অংশীদারদের কেউই তেহরানকে রক্ষায় সরাসরি এগিয়ে আসেনি। উল্টো তুরস্কের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এখন ঝুঁকির মুখে। ন্যাটো বলছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমার দিকে যাওয়ার সময় তারা সেটি গুলি করে ভূপাতিত করেছে। যদিও ইরান এই হামলার কথা অস্বীকার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি মূলত আদর্শিক এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হওয়ায় রাষ্ট্রের পর্যায়ে সত্যিকারের বিপদের বন্ধু গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটি। ফলে মিত্র থাকলেও এই কঠিন সময়ে ইরানকে একাই লড়তে হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও নয়াদিল্লি কৌশলী অবস্থান নিয়েছে।  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং হামলার নিন্দা জানালেও মূলত নিজ দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত।

 

 

 

সিরিয়া বা ইরাকের মতো ইরানের অস্থিতিশীলতা যেন তুরস্কে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটাই এখন আঙ্কারার মূল লক্ষ্য। রাশিয়া গত এক দশক ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দুই দেশ মিলে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছিল এবং ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়া ইরানের ড্রোন ব্যবহার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাদের মধ্যে বড় ধরনের সহযোগিতা চুক্তি হলেও তাতে একে অপরকে সামরিকভাবে রক্ষার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। রাশিয়া বর্তমানে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের পরিস্থিতি জটিল করতে চাচ্ছে না। একইভাবে চীন কেবল ইরানের তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের আগে, বেইজিংয়ের আপাতত সংযমের আহ্বান জানানো ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এই হামলাকে যুদ্ধের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন।
 
 
 
 
ইমানুয়েল মাখোঁ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে চলমান যুদ্ধের ইরানকে আংশিকভাবে দায়ী করলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে বলে সমালোচনা করেছেন। ফ্রান্স ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেনি এবং তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার অংশীদারও নয়। ফ্রান্স এই হামলার সমর্থন করেনি এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে বলে সমালোচনা করেছে। যদিও দেশটির নৌ এবং সেনাবাহিনী কিছু সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করছে। ইমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা করেছেন, তাদের বিমানবাহী রণতরী চার্লস দ্য গলকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য মূলত ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও নৌপরিবহন রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা নেওয়া। বিশেষত হরমুজ প্রণালি, সুয়েজ চ্যানেল ও রেড সি সংলগ্ন পথগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এদিকে ইউরোপীয় কমিশন ও কাউন্সিলের নেতারা সবাইকে উত্তেজনা কমাতে, সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইইউর প্রধান কূটনীতিক কাজা ক্যালাস বলেন, পরিস্থিতি নাড়ি কাঁপানো ও অত্যন্ত বিপজ্জনক।
 
 
 
 
 
 কিন্তু সেই সঙ্গে ইরানের নির্দিষ্ট কর্মসূচির নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই কূটনীতিকই সমাধানের একমাত্র পথ। অপরদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ ইরানো মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সরাসরি কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান বজায় রাখা উচিত। সেই সঙ্গে অচিরেই উত্তেজনা কমানোর জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের সময় স্পেন সরাসরি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও ব্যবহার অনুমোদন করবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির এই ভূমিকার সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, স্পেনের ভূমিকা খারাপ কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অভিযানে ব্যবহার করতে দেয়নি। তিনি কড়া ভাষায় বলেছেন, স্পেন খুব খারাপ সহযোগী এবং আমরা স্পেনের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধ করে দেব। এদিকে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা প্রসঙ্গে ইউরোপের নীতি ও কূটনৈতিক ভূমিকা সংকুচিত হয়ে আসছে। ইইউ ঐক্য কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা নীতির বিকল্প কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারছে না।
 
 
 
 

বিশ^ব্যাপী প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এ হামলাকে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন বলে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে।  বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথভুক্ত চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া ইত্যাদি অনেক দেশ এটিকে সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রতিফলন বলে আখ্যায়িত করেছে, যা কূটনৈতিক সমাধানকে উপেক্ষা করে একটি শক্তির দমনমূলক প্রবণতা প্রদর্শন করছে। ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভাবনার বিষয়ে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে তেল ও জ্বালানি সেক্টরে অস্থিতিশীলতার কারণে। গ্লোবাল সাউথের সমালোচনাও বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায়ে ইউরোপের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা বিশ্ব নজর রাখছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে জড়িত নয়।

 

 

 

 যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে হামলায় যুক্তরাজ্য যোগ দেবে না বলেও জানিয়েছে দেশটি। তবে যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। মর্মান্তিক সত্য হলো, ইসরায়েল এনপিটির বাইরে থাকলেও গোপনভাবে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বজায় রেখেছে এবং কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হয়নি। অন্যদিকে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সহযোগিতা করার পরও শাস্তি ও সামরিক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যদি ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তাহলে এর ওপর হামলা হতো না। পশ্চিমা মোড়লদের এ দ্বিচারিতার কারণে এবং ইরানের পরিণতি দেখে আগামীতে ইরানসহ অনেক দেশই হয়তো নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখার জন্য পারমাণবিক প্রকল্পের দিকে ঝুঁকে যাবে।

 

 

 

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের মূল অজুহাত ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্র। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের দাবি ছিল সাদ্দাম হোসেনের হাতে রয়েছে রাসায়নিক, জৈব ও পরমাণু অস্ত্র; যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশে^র জন্য হুমকি। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, এসব অভিযোগ ছিল মিথ্যা, ভিত্তিহীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এক ভয়াবহ প্রতারণা। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকা ও তার মিত্ররা, আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে কতটা দ্বিচারিতার আশ্রয় নেয়, তা নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমও তাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

 

 

 

 একতরফাভাবে মার্কিন তথ্য প্রচার করে। তাদের কেউ-ই এ তথাকথিত প্রমাণের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেনি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরাক আক্রমণের পক্ষে কোনো প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। তবুও আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য প্রিভেন্টিভ ওয়ার-এর ধুয়ো তুলে জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধ চালায়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এবার ইরানের ক্ষেত্রেও ইসরায়েল একই কাজ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা তা সমর্থনও করছে। কার্যত পশ্চিমারা নিজেদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে দেখা যায়, তারা শুধু নিজেদের স্বার্থেই আইনের ব্যবহার করে। পশ্চিমাদের এ দ্বিচারিতার শিকার হয়ে অনেক দেশ এরই মধ্যে ধ্বংস হয়েছে, এ অপকৌশল অব্যাহত থাকলে, হয়তো আগামীতেও অনেক দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে হবে।

 
 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক