কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পিছিয়ে নারীরা

সাদ্দাম হোসেন ইমরান সাদ্দাম হোসেন ইমরান [প্রকাশ: যুগান্তর, ০৮ মার্চ ২০২৬]

রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পিছিয়ে নারীরা

শ্রমবাজার, মেধাবৃত্তিক পেশা কিংবা রাজনীতি-সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই কমেছে নারীর অংশগ্রহণ। একসময় নারীশক্তির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা তৈরি পোশাকশিল্পেও এখন নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে উদ্বেগজনক হারে। কৃষি, চা-বাগান, গৃহকর্ম ও নির্মাণ খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। রাজনীতি, শিক্ষকতা বা করপোরেট জগতে নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারায় হতাশায় অনেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর ক্ষমতায়নের এই বিপরীতমুখী যাত্রার নেপথ্যের কারণগুলো উন্মোচন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 
 
 

কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপের তথ্যমতে, বাংলাদেশের নারী শ্রমিক শ্রমের উপযুক্ত মূল্য পান না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৩-এর তথ্যমতে, একই কাজে পুরুষের তুলনায় নারী গড়ে ২১ শতাংশ কম মজুরি পান। কিছু ক্ষেত্রে (যেমন: রাস্তা নির্মাণ বা ইট ভাঙা) এই বৈষম্য ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে এই হার ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ, গত এক দশকে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, তবে সেটি অনানুষ্ঠানিক খাতে। রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। এর পেছনে অনেক কারণের একটি-পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। 

 

 

ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি) হলো বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ এবং ইন্টারেক্টিভ ম্যাপ। এতে সারা দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোর অবস্থান এবং মৌলিক তথ্য (কারখানার নাম, ঠিকানা, কর্মীসংখ্যা, সার্টিফিকেশন) প্রকাশ করা হয়। এই ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, তৈরি পোশাক খাতে ২৯ লাখ ৬৯ হাজার শ্রমিক কাজ করে। যার ৫৭ শতাংশ নারী শ্রমিক। এক দশক আগেও নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৭০ শতাংশের ওপর। গার্মেন্টে নারী শ্রমিক কমার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে একসময় নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ হার কিছুটা কমেছে। এর একটি কারণ হতে পারে শিল্পে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। যার সঙ্গে অনেক নারী শ্রমিক এখনো পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। এছাড়া এই খাতের কিছু নারী শ্রমিক চাকরিজীবনে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে গ্রামে ফিরে গিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছেন।

 

 

তিনি আরও বলেন, কিছু নতুন স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) কারখানায় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে শিল্পে নারী শ্রমিকের সামগ্রিক অংশগ্রহণের হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নারী শ্রমিকদের খাপ খাওয়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। সরকারের সহযোগিতায় আমাদের সদস্য কারখানা ও স্বতন্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ১৪০ জন শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার ৯০ শতাংশই নারী। তৈরি পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকার যদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আরও সহায়তা দেয়, তবে এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ আবারও বাড়বে বলে আমরা মনে করি।

 

 

নারী নেত্রী ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, গার্মেন্ট শিল্পে নারী শ্রমিক কমার পেছনে কেবল অটোমেশন দায়ী নয়। এক্ষেত্রে কর্মপরিবেশটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সারা দিন গালাগালি, কম বেতন, বাসায় রান্নাবান্না, বাচ্চা পালন করতে গিয়ে নারীর মধ্যে ক্লান্তিবোধ কাজ করে। আর এসব কারণেই অনেক নারী কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে গার্মেন্টগুলো শ্রমিক ধরে রাখতে উদ্যোগী হচ্ছে না। ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো সহায়ক পরিবেশ কেবল ‘কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। যৌন হয়রানি তো আছেই। যদিও মালিকরা এটি মানতে চান না। কিন্তু এ কারণেও অনেক শ্রমিক চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, করপোরেটজগতে নারী শীর্ষস্থানে পৌঁছতে না পারার কারণ হচ্ছে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। একজন পুরুষের বাচ্চা হলে অফিসে তাকে যেভাবে দেখা হয়, কাজের ক্ষেত্রে নারীকে ঠিক তার উলটোভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এ কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। 

 

 

 

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্যমতে, কৃষিকাজে জড়িত নারী শ্রমিকরাও পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান। সারা দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী কর্মী আছে ২০ লাখ। তাদের কোনো লিখিত চুক্তি নেই, নেই কোনো নির্ধারিত কাজের সময়। মজুরি ও ছুটি নিয়েও নানা অভিযোগ। চা-বাগান শ্রমিকদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী। তারা দিনে মাত্র ১৭০-১৮৫ টাকা মজুরি পান। নির্মাণশিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কমছে। 

 

 

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, যদি নারী শ্রমিকদের সমান সুযোগ ও মজুরি দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের জিডিপি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে বৈষম্য ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে বছরে লাখ লাখ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেন, যা উৎপাদন ও দক্ষতা-দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি করে। অর্থনীতির মতো রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক হারে কমেছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ৮৫ নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। এর আগে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে এই একই সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

 

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিড মরিয়ম নেসা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। বড় একটি দল রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে না পারায় এটি হতে পারে। আরেকটি কারণ হচ্ছে-সামাজিক প্রেক্ষাপট। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারীকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে রাজনীতি করতে হয়। এর সঙ্গে নতুন করে আবার সাইবার বুলিং যুক্ত হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে নারী প্রার্থীরাই বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। 

 

 

 

 

এদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে ঘরে-বাইরে সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল সম্ভব নয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। নারীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে। বিদ্যমান সমাজে সমতা হোক অঙ্গীকার, মর্যাদা হোক বাস্তবতা, আর ক্ষমতায়ন হোক উন্নয়নের ভিত্তি।