রূপপুর প্রকল্প উদ্বোধন আজ, পরমাণু যুগে বাংলাদেশ
জাহাঙ্গীর হোসেন, ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি [প্রকাশ : খবরের কাগজ, ২৮ এপ্রিল ২০২৬]

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর ২টায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম রূপপুর প্রকল্পের অভ্যন্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এ সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাশিয়ার মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে রি-অ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন ও পরবর্তী সময় ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এর আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং লাইসেন্স বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুর দিকেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সেই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানান, রি-অ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি লোড করার পর আমরা চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ রিপোর্ট তৈরির জন্য বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাব। এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং পর্যায়।’
তিনি বলেন, ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরুর ৩ মাসের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পরবর্তী সময় ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম সম্পন্ন করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাত্রা শুরু ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে তথা পাকিস্তান আমলে এ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন কোনো অগ্রগতি ছিল না। সেই সময়ে এ প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় পর্যায়ক্রমে আরও দেড় হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ এ জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অ্যাক্ট পাস করা হয়। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ পরমাণু ক্লাবের ৩৩তম সদস্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণকাজ শুরুর (ফার্স্ট কংক্রিট পৌরিং বা এফসিপি) জন্য ‘ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স’ পায় আণবিক শক্তি কমিশন (বিএইসি)। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ‘বিশ্ব পরমাণু ক্লাব’ (নিউক্লিয়ার নেশন)-এ যুক্ত হয়। বাংলাদেশ এই ক্লাবের ৩৩তম সদস্য। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) শর্তসাপেক্ষে এই লাইসেন্স দেয়।
নিরাপত্তাবলয়
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাবলয়ে ও রাশিয়ায় নির্মিত প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েই তৈরি করা হচ্ছে এই পারমাণবিক রি-অ্যাক্টর। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ মানুষের সংস্পর্শে যাবে না। এ প্ল্যান্ট থেকে ধোঁয়া নির্গত ও শব্দও হবে না। প্রকল্প এলাকার নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ নিরাপত্তা দল তৈরি করা হয়েছে। তাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আবাসিক ভবন গ্রিনসিটি
এ প্রকল্পের জন্য আগেই ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা ছিল। পর্যাপ্ত না হওয়ায় আরও দেড় হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রকল্প এলাকার বাইরে তৈরি করা হয়েছে গ্রিনসিটি আবাসনপল্লি। এটি বাস্তবায়ন করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ ও ১৬ তলার ২২টি সুউচ্চ ভবন তৈরি করা হয়েছে।
নৌপথ নির্মাণ
প্রকল্পের জন্য ভারী মালপত্র নদীপথে আনা হবে। মোংলা থেকে চাঁদপুর, মাওয়া, গোয়ালন্দ হয়ে পাকশী পর্যন্ত নৌপথ খনন করে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচলের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এই পথ দিয়ে ভারী যন্ত্রাংশ আনা-নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
রেলপথ নির্মাণ
রেলপথেও যন্ত্রপাতি আনা হবে। এ জন্য ঈশ্বরদী থেকে প্রকল্প পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রডগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা রেলপথ ১৭ দশমিক ৫২ কিলোমিটার। এ ছাড়া সাড়ে ৪ কিলোমিটার লুপলাইন, রূপপুর স্টেশন নামে রেলওয়ে স্টেশন, ৭টি কালভার্ট, ১৩টি লেভেলক্রসিং গেট ও সিগনাল নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তিন বছর আগে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি রেলপথের কার্যক্রম।
দুই ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
উপজেলার পাকশীর রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে নির্মিত রূপপুর প্রকল্পে ৩+প্রজন্মের দুটি ভিভিইআর রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পাওয়ার ইউনিট থাকছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে। রূপপুর প্রকল্পের জেনারেল ডিজাইনার এবং মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে রাশিয়ার রাষ্টীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম। বাস্তবায়ন ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি এবং গ্যাস, তেল ও কয়লার মতো জ্বালানি খরচ না থাকায় তুলনামূলক সস্তা হবে এই বিদ্যুৎ। এ প্রকল্পের ‘লাইফ’ বা জীবনীশক্তি হবে ৫০ বছর। তবে সংস্কার করে তা ৮০ বছর পর্যন্ত চলমান রাখা যাবে।
প্রকল্পের ব্যয়
রূপপুর প্রকল্পে নির্মিত হচ্ছে দুই ইউনিটের দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) ও ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রত্যেকটি ধাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই প্রকল্পে রাশিয়ার দেওয়া প্রকল্প ব্যয়ের ৯০ শতাংশ সরবরাহ ঋণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেগা প্রকল্প এটি। ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। ঋণ হিসাবে রাশিয়া দেবে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় হবে।