কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা : মুদ্রার অপর পিঠ

সলিমুল্লাহ খান [প্রকাশ: যুগান্তর, ০৪ মে ২০২৬]

সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা : মুদ্রার অপর পিঠ

বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সংবাদক্ষেত্র’ নামে একটি শব্দ পাওয়া যায়। ইংরেজি সংস্করণে দেখি ইহা ‘প্রেস’ শব্দের বঙ্গানুবাদ বিশেষ। কয়েক দফা বিধিনিষেধের কথা ছাড়িয়া যদি বলি, তো বলিতে হয়, এই দেশে প্রেস ফ্রিডম বা ‘সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা’ আছে, এ কথা বিলকুল সত্য।

 
 
 
 

দুঃখের মধ্যে যে প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার জানা নেই, সে প্রশ্নই আমার মনে হাজিরা দেয়। এ স্বাধীনতা জিনিসটা কী জিনিস, ভাই? কার অধীনতা অতিক্রম করিলেন আপনি আর কার অধীনতাই বা বরণ করিলেন? স্বয়ের বা নিজের অধীনতাই তো স্বাধীনতা, নাকি অন্য কিছু? এই স্ব-টা কে? জাতিসংঘ তো বানানো হইয়াছিল সেই ১৯৪৫ সালে। অথচ তাহারা বিশ্বজোড়া ‘সংবাদক্ষেত্র স্বাধীনতা দিবস’ এই মাত্র ১৯৯৩ সাল হইতেই চালু করিয়াছেন? কিন্তু এত দেরি কেন? কারণ কী?

 

 

জাতিসংঘের হিসাবে ১৯৯৩ সাল হইতে ফিবছর মে মাসের ৩ তারিখ ‘বিশ্বজনীন সংবাদক্ষেত্র দিবস’ (অর্থাৎ দুনিয়াজোড়া সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা দিবস) পালিত হইতেছে। এই দিবসের তিন উদ্দেশ্য বা মতলব : ১. দুনিয়াজোড়া সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা কতটুকু বিরাজ করে তাহার পরিমাপ করা; ২. যাহারা সংবাদ সংস্থার স্বাধীনতার ওপর জবরদস্তি বা হামলা করে তাহাদের ঠেকাইয়া দেওয়া; আর ৩. যে সকল ন্যায়পরায়ণ সাংবাদিক আপনাপন কর্তব্য পালন করিতে গিয়া প্রাণদান করিয়াছেন, তাহাদের নামে স্মরণাঞ্জলি নিবেদন করা।

 

 

মনে রাখিতে হইবে, জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তটা আসমান হইতে নাজেল হয় নাই। ১৯৯১ সালে জাতিসংঘের শিল্প বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি পরিষদ বা ইউনেস্কোর ষড়বিংশ সাধারণ সভার প্রস্তাব অনুসারে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘সংবাদক্ষেত্র দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

 

 

ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল আফ্রিকা মহাদেশের একটি সংবাদ সম্মেলন। ১৯৯১ সালের ৩ মে তারিখে সদ্যস্বাধীন নামিবিয়ার রাজধানীতে গৃহীত এক প্রস্তাবের নাম ‘বিন্ডহেক’ ঘোষণা। এই সম্মেলনে আফ্রিকার গোটা ৩৮ দেশের মোট ৬৩ জন সাংবাদিক শরিক হইয়াছিলেন। আমার ধারণা, এখানেই মুদ্রার অপর পিঠ দেখা যাইবে। বিশ্ব সংবাদক্ষেত্র দিবস যতটা প্রকাশ করিবার তাহা তো করেই, কিন্তু তাহার নয়গুণ যে সে গোপনও করিতেছে, তাহা কে দেখিবে?

 

 

সকলেই জানেন, ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’ (প্রস্তাব ২১৭/ক/৩) নামে যে দলিল গ্রহণ করে, তাহার ১৯ ধারায় বলা আছে : ‘প্রত্যেকেরই মতাবলম্বন এবং আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে; কোনো ধরনের বাধাবিপত্তির মুখোমুখি না হইয়া যে কোনো মতাবলম্বনের এবং যে কোনো মাধ্যমে, সীমান্তের বেড়া না দেখিয়া খবরাখবর আর ধ্যানধারণা সন্ধানের, সংগ্রহের আর প্রচারের স্বাধীনতা এ স্বাধীনতার মধ্যে পড়িবে।’

 

 

১৯৭৭ সালে ইউনেস্কো খবরাখবর আদান-প্রদান বিষয়ে অধিক তদন্ত করার উদ্দেশ্যে এক প্রস্থ বহুজাতিক কমিশন গঠন করে। এ কমিশনের সভাপতি নিযুক্ত হন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজেতা, আয়ারদেশের নাগরিক, ‘শন ম্যাকব্রাইড’। ইউনেস্কোর হাতে জমা পড়ার পর, ১৯৮০ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ, ম্যাকব্রাইড কমিশনের রিপোর্ট ‘বহু আওয়াজ, একই দুনিয়া’ নামে রাষ্ট্র হইয়াছিল।

 

 

এই রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ার সূত্রে ইউনেস্কো ‘খবর আদান-প্রদান কার্যে উন্নতিসাধনের নিমিত্ত আন্তর্জাতিক কর্মসূচি’ গ্রহণ করে। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত উন্নতিশীল দেশে সংবাদক্ষেত্রের উন্নতিবিধান, মানে তাহাদের জনশক্তি ও কারিগরি সাহায্য প্রদান।

 

 

১৯৮৭ সালের নভেম্বর মাসে পারি শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, সংবাদ আদান-প্রদানের জগতে, সংবাদক্ষেত্রে দুনিয়ার দেশে দেশে যে ধরনের বৈষম্য বিরাজমান, তাহা ধীরে ধীরে হইলেও দূর করা চাই। এ বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিলুপ্তির জন্য দরকার ন্যায়বিচারভিত্তিক ‘নয়া একটা বিশ্ব খবরপ্রবাহ ও আদান-প্রদান ব্যবস্থা’।

 

 

জাতিসংঘের আরও অনেক সিদ্ধান্ত আর প্রস্তাবে বিরাজমান ব্যবস্থার এ ভারসাম্যহীন চেহারাটা বদলাইবার প্রয়োজনীয়তা বারবার স্বীকার করা হইলেও কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। বরং শাক দিয়া মাছ ঢাকার অনেক চেষ্টা হইয়াছে। সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা দিবস এই গোছের বোঝার ওপর আরেক আঁটি শাকের অধিক বলিয়া আমার মনে হয় নাই।

 

 

নভেম্বর ১৯৮৭ সালে ফরাসি দেশের পারি নগরে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় ইউনেস্কো ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি আর সে লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে উন্নতিশীল দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করার একটা কর্তব্য আছে। ২০০৪ সালের জুনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।

 

 

শোনা যায়, ইউনেস্কো গৃহীত ম্যাকব্রাইড রিপোর্টের সুপারিশ অনুসারে সংবাদক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক উপস্থিতির গুরুত্ব স্বীকৃত হইয়াছিল। এ পটভূমিতে ইউনেস্কোসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তখন ‘নয়া বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থা’ বা নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্ডারের ন্যায্যতা মানিয়া লয়।

 

 

ইউনেস্কোর শত চেষ্টা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের কর্তৃত্বাধীন একচেটিয়া সংবাদ সংস্থা ও মায়াজালের আধিপত্য হইতে স্বাধীন জাতীয় সংবাদ সংস্থাগুলোর স্বকীয়তা রক্ষা করা যায় নাই; ইউনেস্কোর নতুন বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থা নীতিভাব গ্রহণের প্রতিবাদে ১৯৮৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ১৯৮৫ সালে মহান ব্রিটেন ইউনেস্কো ত্যাগ করে। অর্থাৎ অর্থ সাহায্য বন্ধ করিয়া দেয়। ব্রিটেন ১৯৯৭ নাগাদ অবশেষে আর যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে আবার ইউনেস্কোর দ্বারে ফিরিয়া আসে। তাহারও অনেক কারণ আছে।

 

 

আজিকার সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা দিবস সেসব কারণের একটি। এ দিবসের দাবি আর ‘নয়া বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থার’ দাবি পাশাপাশি তুলনা করিলেই বুঝিবেন কোন সাপের দাঁত নাই, কোন সাপ ফোঁসফাঁস করে না, ঢুসঢাস তো মারেই না।

 

 

মহাবিলেতের আর আমেরিকার প্রত্যাবর্তন ঘটিলে কী হইবে! বিশ্বজনীন সংবাদ সংস্থাগুলো নয়া বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থার বিরোধিতায় কোথাও এক কদম পিছপা হয় নাই। ফলে এ ব্যবস্থা আঁতুড়ঘরেই শহীদ হয়। আন্তর্জাতিক খবরের বাজারে বৃহত্তর পুঁজির বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য শুধু অক্ষুণ্ন আছে বলিলেই যথাযথ বলা হইবে না, তাহার কামড় আরও দৃঢ় হইয়াছে।

 

 

বিন্ডহেক ঘোষণার পুরা নাম ‘মুক্ত, স্বাধীন এবং বহুজনীন সংবাদক্ষেত্রের লক্ষ্যে বিন্ডহেক ঘোষণা’। এই ঘোষণার দাবিনামা ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল হইতে ৩ মের মধ্যে গ্রহণ করা হয় নামিবিয়ার রাজধানী শহরে। এখানেই ৩ মে তারিখের জন্ম। এইরকম আরও অনেক সম্মেলন আর ঘোষণার চোটে এখন পৃথিবীর কান চৌচির। এইখান হইতেই নতুন বিশ্ব সংবাদক্ষেত্রের আরেক নতুন বিন্যাস দেখা যাইতেছে।

 

 

এ বিন্ডহেক বিন্যাস কার্যত নয়া বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থার দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার জন্যই। নয়া ব্যবস্থার দাবি, বিশেষত ম্যাকব্রাইড কমিশনের রিপোর্ট ১৯৮০ সালের পর যে বিতর্কের সূচনা করিয়াছিল (আর যাহা ইউনেস্কোর মধ্যে ভাঙনের সূচনা করিয়াছিল) বিন্ডহেক ঘোষণা বলা যায়, তাহার সাময়িক অবসান ঘটাইল।

 

 

নয়া বৈশ্বিক খবর আদান-প্রদান ব্যবস্থার অনেক দুশমন। ইহাদের মধ্যে আছেন অনেক বিশেষজ্ঞ, আছে অনেক প্রতিষ্ঠান। ইহারা মনে করেন উত্তর-দক্ষিণ ভারসাম্যের দাবি তুলিয়া উন্নতিশীল দেশের রাষ্ট্রনায়করা কেবল সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীন হইবার ক্ষমতা হরণ করিতেছেন। ১৯৮৯ সালের পর হইতে এই বিশেষজ্ঞরা চোখেমুখে বলিতেছেন, ইউনেস্কোর মূল লক্ষ্য ‘কথা ও ছবির অবাধ প্রবাহ’ অক্ষুণ্ন রাখিবার খাতিরে ‘কোনোরকম বাধাবিপত্তি ছাড়াই মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করিতে পারিলে এই দুনিয়ার উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে ব্যাপক আর বেহতর ভারসাম্যময় খবরাখবরের আদান-প্রদান সম্ভবপর হইবে। আর কোনো সংস্কারের দরকার হইবে না।

 

 

এক্ষণে আমরা যে বিশ্ব সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা দিবস পালন করিতেছি, তাহা ১৯৮৯ সাল হইতে আন্তর্জাতিক পুঁজি বিজিত নতুন আদান-প্রদান বিন্যাস নীতির গৌরাঙ্গ কীর্তন বৈ নহে।

আলহামদুলিল্লাহ।