কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সংকটময় সন্ধিক্ষণে পররাষ্ট্রনীতি/দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার

ড. খলিলুর রহমান [প্রকাশ : খবরের কাগজ, ২৭ এপ্রিল ২০২৬]

সংকটময় সন্ধিক্ষণে পররাষ্ট্রনীতি/দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অতীতে তার স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদিও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তবুও এটি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা, অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।...

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বর্তমানে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে, যা গভীর ও সতর্ক পর্যালোচনার দাবি রাবে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের কূটনীতি বাস্তববাদিতা, ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ধারাবাহিক অঙ্গীকার দ্বারা চিহ্নিত ছিল, একই সঙ্গে সব প্রধান অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টাও ছিল সুস্পষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশকে জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে বাস্তব সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছে।

 

 

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই কৌশলগত সার্বভৌমত্ব ও নীতিগত স্বচ্ছতা এখন চাপের মুখে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় বলে বিবেচিত হয়েছে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে। উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

 

 

পররাষ্ট্রনীতির শক্তির মূল উৎস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সংহতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা। এ উপাদানগুলো দুর্বল বলে প্রতীয়মান হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা প্রদর্শনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

 

গত ২০ মাসে ক্রমবর্ধমানভাবে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পররাষ্ট্রনীতি কৌশলগত না হয়ে ক্রমেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে। একসময় যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বাংলাদেশের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল, তা এখন অনেকাংশেই অনুপস্থিত বা দুর্বল। বরং একটি খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষণ আমরা দেখছি, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।

 

 

এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার বিবর্তন। ঐতিহাসিকভাবে এই মন্ত্রণালয়ই পররাষ্ট্রনীতির পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। বিভিন্ন খাতে নীতিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান এবং পেশাদারত্ব ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরাই ছিল এর মূল দায়িত্ব।

 

 

বর্তমানে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আগের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবক হয়ে পড়েছে। জনপরিসরে এর দৃশ্যমানতা কমে গেছে এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক আলোচনা পরিচালনা ও প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে। শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠের অনুপস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতি একাধিক প্রভাবকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা নীতিগত সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করছে।

 

 

এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ধারণা নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কার্যকর কূটনীতির জন্য সাধারণত একটি সুসমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সরকারের বিভিন্ন অংশ সুস্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করে। এই সমন্বয় দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদি ও ফলপ্রসূ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

 

এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি উদ্বেগ হলো নীতি-নির্ধারণী মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারসমূহ যা সবসময় জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। ক্রমেই এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, কিছু নীতিগত অবস্থান আংশিকভাবে হলেও প্রভাবশালী বিদেশি শক্তির পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। যদিও বর্তমান আন্তসংযুক্ত বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনিবার্য, তবুও জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ধারণা বজায় রাখা সার্বভৌম কূটনীতির মূল ভিত্তি।

 

 

বাংলাদেশ অতীতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেছে, যেখানে সব অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ পদ্ধতি দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। এ ভারসাম্য থেকে বিচ্যুতি কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করছে এবং শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনার সক্ষমতাও সীমিত করছে।

 

 

অন্যদিকে, পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও দেশের তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সরবরাহ সংকট, বৈদেশিক খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক রপ্তানি প্রতিযোগিতার মতো নানা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে পররাষ্ট্রনীতি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

অর্থনৈতিক কূটনীতি- যার মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। বাংলাদেশ যদিও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মতো বহুপক্ষীয় ফোরামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে, তবুও এটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন যে, এসব প্রচেষ্টা কতটা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত। সতর্ক থাকতে হবে যেন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অতিরিক্তভাবে প্রতীকী সাফল্যের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। যেমন বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে পদ বা দৃশ্যমানতা অর্জন।

 

 

বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা অবশ্যই আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা ও প্রভাব বাড়ায়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে এটি কতটা দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে বাস্তব ফলাফল অর্জনে সহায়তা করছে তার ওপর। তাই এ ক্ষেত্রগুলোতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন অপরিহার্য।

 

 

বর্তমান গতিপথের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি ও প্রতিযোগী দেশের চুক্তির দ্বারা প্রভাবিত। এ পরিস্থিতিতে একটি সক্রিয় ও কৌশলগতভাবে সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি ঝুঁকি হ্রাস এবং নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।

 

 

বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও নীতিগত সামঞ্জস্যের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে পরিবর্তিত সম্পর্ক বৈশ্বিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে ভুল পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত। যেসব দেশ স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং ধারাবাহিকভাবে তা অনুসরণ করে, তারা সুযোগ ও ঝুঁকি উভয়ই দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

 

 

এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি নীতিগত বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

 

প্রথমত, পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই অগ্রাধিকারের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে কার্যকারিতা বাড়বে।

 

 

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা-নীতিগত সামঞ্জস্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একটি দক্ষ ও ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারে।

 

 

তৃতীয়ত, প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রেখে অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্তি। ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

 

চতুর্থত, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো দেশি ও আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। নীতির লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট যোগাযোগ পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলে এবং কার্যকর অংশীদারত্ব সহজকরে।

 

 

সবশেষে, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও আলোচনার সক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। যদিও পররাষ্ট্রনীতি একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র, এর কার্যকারিতা বৃহত্তর শাসন কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

 

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অতীতে তার স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদিও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তবুও এটি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা, অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

 

 

আমাদের শেষ লক্ষ্য কেবল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষণ নয়, বরং পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করা, যা জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়