স্বাধীন ‘কৌশলগত ডকট্রিন’ প্রণয়নের এখনই সময়
ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী [প্রকাশ : যুগান্তর, ০৬ মে ২০২৬]

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি-প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের মাত্র এগারো দিন পর-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সমন্বিত বিমান হামলা চালায়, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করে এবং ইরানের সামরিক কমান্ড কার্যত ধ্বংস করে দেয়। ইরান পালটা পদক্ষেপ হিসাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, বাহরাইন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালায়। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন বিএনপি সরকার শুধু অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েনি-বরং বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান নির্ধারণের এক সংজ্ঞায়িত মুহূর্তের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে রাখতে হবে, গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশ একটি নতুন ‘বৈশ্বিক ব্যবস্থার’ যুগে প্রবেশ করেছে, তবে মানানসই কোনো ‘কৌশলগত ডকট্রিন’ প্রণয়ন ছাড়াই।
ভারত-রাশিয়া সামরিক চুক্তি, বাংলাদেশের দোরগোড়ায় ভূকম্পন : বাংলাদেশের প্রতিবেশী অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তনটি ঢাকায় কার্যত কোনো নীতিনির্ধারণী-মনোযোগ পায়নি বলেই মনে হচ্ছে। রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিক্স সাপোর্ট চুক্তি-যা আরইএলওএস নামে পরিচিত-ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হয়। রুশ পার্লামেন্টের নিুকক্ষ দুমা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এটি অনুমোদন করে, ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। আরইএলওএস চুক্তির আওতায় ভারত ও রাশিয়া পরস্পরের ভূখণ্ডে ৩ হাজার সৈন্য, পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ এবং দশটি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে। এটি কোনো প্রতীকী অংশীদারত্ব নয়।
এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৃহত্তম পারমাণবিক রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ সচল সামরিক সরবরাহ কাঠামো-যা বাংলাদেশের কৌশলগত পরিধির ঠিক ওপরে বসে আছে। ভারত ইতোমধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ছাড়ে রুশ জ্বালানি কিনছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে-যখন তেহরানে বোমা পড়ছিল-তখন ইসরাইল সফর করেছেন। কথা বলেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর গায়ে হাত রেখে। এক্ষেত্রে ভারত একটি সূক্ষ্ম বহুমুখী কৌশল অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ান সামরিক অবকাঠামোর ব্যবহারের পাশাপাশি আমেরিকান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করেছে দেশটি। পাশাপাশি ইসরাইলি গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে আসছে সেই ১৯৭১ থেকে। ভারত দশকের পর দশক ধরে এমন প্রভাব গড়ে তুলেছে যাতে সে কোনো এক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিটি পরাশক্তির সঙ্গে একসঙ্গে খেলতে পারে।
সেভাবেই দেশটি তার পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজিয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি সত্ত্বেও পাকিস্তান তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইসলামি বিশ্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সক্রিয় কূটনৈতিক মূলধনে রূপান্তরিত করেছে। পাকিস্তানের কৌশলগত পৃষ্ঠপোষক হিসাবে রয়েছে চীন। যারা ভারতের বিরুদ্ধে পকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরপত্তায় দারুণভাবে দেশটিকে সমৃদ্ধ করছে। অপারেশন সিঁদুর-এ পাকিস্তানের ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ফেলে দেওয়ার সফলতা তার প্রকৃষ্ট নজির। চীনের পাশাপাশি দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদার হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শুধু তাই নয় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মধ্যস্থতা করে দেশটি বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের চেয়ে বড় অর্থনীতি ও বিশ্বব্যাপী আরও বেশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা সত্ত্বেও বিশ্ব আলোচনার টেবিলে আজ অনুপস্থিত।
পাকিস্তানের মডেল শিক্ষণীয়, তবে অনুকরণীয় নয় : এখন প্রশ্ন হচ্ছে বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের মডেল হুবহু অনুকরণীয় কিনা। উত্তর হচ্ছে-বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের জোট কাঠামো হুবহু অনুসরণ করা চ্যালেঞ্জিং, অনেকাংশে সম্ভবপরও নয়। তবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মডেলটি শিক্ষণীয়। এর কারণ হচ্ছে-পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরের (সিপিইসি) গভীর কাঠামোগত নির্ভরতার মধ্যে আটকে আছে। যেমন : চীনা অর্থায়নে নির্মিত পাকিস্তানি অবকাঠামো, চীনা শর্তে চীনা ঋণ, পাকিস্তানের পশ্চিম করিডরে চীনা সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ইত্যাদি। অপরদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে লেনদেনমূলক ও শাস্তিমূলক ছিল। আর তৃতীয়ত, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত ও সড়ক যোগাযোগ দেশটিকে অনন্য গুরুত্বে নিয়ে গেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের ভূ কৌশলগত অবস্থান ও সুযোগ ভিন্ন। এটি আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।
এমনি বাস্তবতায় বাংলাদেশ এমন একটি স্বাধীন কৌশলগত কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা ভারতের সামরিক সর্বদিকমুখিতা বা পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষক-নির্ভরতা-কোনো মডেলকেই অবিকল নকল করবে না। এখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য স্পষ্ট ফরমুলা হচ্ছে : চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক নোঙর হিসাবে রেখে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু স্পষ্টতই নির্ভরতামুক্ত সম্পর্ক বজায় রাখা।
চীন+যুক্তরাষ্ট্র+ভারত নীতির কৌশলগত যুক্তি : চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং একটি বড় অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ উচিত সামরিক কারণে নয়; বরং কৌশলগত কারণে। চীন বাংলাদেশকে অবকাঠামোগত পুঁজি, প্রযুক্তিগত হস্তান্তর এবং বাজার সুবিধা-এমন সব বিষয়ে প্রদান করছে, যা বর্তমানে অন্য কোনো শক্তিই এত ব্যাপক পরিসরে দিতে প্রস্তুত নয়। চীনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে নয়, বরং একইসঙ্গে একটি ‘দ্বিতীয় নোঙর’ গড়ে তোলার মাধ্যমেই পরনির্ভরশীলতা পরিহার করা সম্ভব। সেই দ্বিতীয় অবলম্বনটি অবশ্যই হতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প-যা দেশটির অর্থনৈতিক সাফল্যের চালিকাশক্তি-প্রায় পুরোপুরিভাবে আমেরিকান ও ইউরোপীয় ভোক্তা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা এবং উচ্চশিক্ষা খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এমন একটি কাঠামোগত নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে, যা উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক।
জুলাই অভ্যুত্থানপরবর্তী গণতন্ত্রপন্থি গণজাগরণের শক্তিতে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমান সরকারের ওয়াশিংটনে এক স্বাভাবিক বৈধতা রয়েছে, যা হাসিনা সরকার অনেক আগেই নষ্ট করে ফেলেছিল। এ সদিচ্ছাকে একটি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করার এটাই উপযুক্ত সময়-একটি বাংলাদেশ-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্ব, যা শুধু বাণিজ্য সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা রসদ সরবরাহ এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নির্ভরশীল প্রতিবেশী থেকে সম্মানিত সমকক্ষে রূপান্তরিত করতে হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ, হ্যাঁ। সহযোগিতামূলক, অবশ্যই। কিন্তু সার্বভৌম-এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে ‘না’ বলার ক্ষমতাও থাকতে হবে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বজায় রাখতে পারে না।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোর অপ্রতিসম নির্ভরশীলতাও বাংলাদেশ বহন করতে পারে না। আর এ নির্ভরশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ জোট সরকার। তারেক রহমান সরকারকে অবশ্যই কথার মাধ্যমে নয়, কাজের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে, বাংলাদেশ ভারতের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগী প্রতিবেশী-কিন্তু নির্ভরশীল নয়। তিস্তার পানির অধিকার অবশ্যই বহুপাক্ষিক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা বাস্তবায়নে চুক্তির নবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ট্রানজিট চুক্তিগুলো অবশ্যই অর্থনৈতিক সুবিধার দিক থেকে পারস্পরিক হতে হবে এবং প্রয়োজনে এগুলোর পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাকে কৌশলগত মূলধনে রূপান্তর : জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী দেশ। বাংলাদেশের সৈন্যরা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে দায়িত্ব পালন করছে। এটি শুধু একটি মানবিক অবদান নয়-এটি একটি বিশাল অব্যবহৃত কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ যা বাংলাদেশ ক্রমাগত কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ তার শান্তিরক্ষা অবদানকে ব্যবহার করে-সদিচ্ছার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে পারে। এর পরিবর্তন অবশ্যই করতে হবে। বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে, কৌশলগত সংযোগ ছাড়া নৈতিক অবদান প্রশংসা তৈরি করে, কিন্তু ক্ষমতা দেয় না। বাংলাদেশ তার অবদানের অনুপাতে বিশ্বমঞ্চে ক্ষমতা পাওয়ার যোগ্য অধিকারী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি একটি আহ্বান : তারেক রহমান এক সত্যিকারের ঐতিহাসিক মুহূর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের এমন ভৌগোলিক, জনসংখ্যাগত এবং অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে, যা দেখে বেশির ভাগ মধ্যম শক্তিই ঈর্ষা করবে।
বাংলাদেশের যা অভাব তা হলো নীতি। একটি সুস্পষ্ট, প্রকাশিত এবং ধারাবাহিকভাবে সমর্থিত পররাষ্ট্রনীতির পরিচয়, যা বিশ্বকে-এবং তার নিজের নাগরিকদের-বলে দেবে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কী সে নিঃশর্তভাবে রক্ষা করবে এবং অংশীদারত্বের বিনিময়ে কী দিতে ইচ্ছুক। অধ্যাপক ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শাসন সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তারেক রহমান সরকারকে এখন এর ওপর কৌশলগত কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সূত্রটি জটিল নয়। অর্থনৈতিকভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে ভিত্তি স্থাপন করুন। নির্ভরশীলতা ছাড়া ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখুন। পরবর্তী সংকটের আগেই জ্বালানি সার্বভৌমত্ব গড়ে তুলুন, সংকট চলাকালীন নয়। বাংলাদেশকে নিজেকেই বেছে নিতে হবে-একটি সার্বভৌম, নীতিবান, বহুমুখী রাষ্ট্র হিসাবে, যার মধ্যে পরাশক্তিদের টেবিলে আবেদনকারী হিসাবে নয়, বরং যোগ্য অংশীদার হিসাবে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস থাকবে।
ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী : স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক-ডাচেস-এর সহকারী অধ্যাপক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক