তেলের দাম বৃদ্ধিতে চাপ বাড়ছে জনজীবনে
মৃত্তিকা সাহা [প্রকাশ: খবরের কাগজ, ২০ এপ্রিল ২০২৬]

আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উপাদান হচ্ছে জ্বালানি তেল। উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, শিল্প–সব ক্ষেত্রে তেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি জনজীবনের প্রায় সব খাতে প্রভাব পড়বে–এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মাথায় দেশে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়া এবং শিল্প খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যার ফলে নতুন করে চাপে পড়বেন দেশের নিম্ন ও মধ্যমআয়ের মানুষজন।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর নতুন দামে ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে একই দিনে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দাম গতকাল সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তেলের দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়, যার ফলে ভাড়া বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা।
এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্মস্থলে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন–সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ছে। পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় জড়িত। তেলের দাম বাড়ায় এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চাল, ডাল, সবজি, মাছসহ প্রায় সব পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পাম্প, ট্রাক্টরসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রের খরচ বেড়ে যাবে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। শিল্প ও উৎপাদন খাতেও এর প্রভাব পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার থাকলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়, যা শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। তেলের দাম বাড়ার ফলে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা হ্রাস পায়।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এমনিতেই চাপে রয়েছে। এখন জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ায় এই চাপ আরও বাড়বে। যদিও মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা সরকারের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। সরকার চাইলেও শেষ পর্যন্ত সেটা ধরে রাখতে পারেনি। তিনি বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যারা সরাসরি তেল কিনছেন তাদের খরচ বাড়বে এবং যেসব ক্ষেত্রে তেল ব্যবহৃত হয় সেখানেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। এর প্রভাব যাতায়াত খরচ ও যানবাহনের টিকিটের দাম, উৎপাদন খাত এবং আমদানি-রপ্তানি শিল্পের ওপর পড়বে। এর ফলে ভোক্তা এবং উৎপাদক উভয়ই বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি আরও বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং এর ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, এই পরিস্থিতির প্রভাবে শিল্প ও রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক পড়তে পারে, বিশেষ করে জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে, গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আইএমএফের চাপে নয়, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সরকারি তহবিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত নির্বাচিত সরকার মেনে নেবে না। ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সব ধরনের তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্তের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় কারণ হলো সরকারের রাজস্ব আদায়ের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি। সরকারের পক্ষে এই বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি আর দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তবে শুধু দাম বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেতে পারত এবং সরকারের এ বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে যদি তেলের দাম কমে, তবে সরকার যেন বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম কমিয়ে আনে। যদিও আমাদের দেশের সংস্কৃতি হচ্ছে, একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে সেটা আর কখনোই কমানো হয় না।
এদিকে সরকার ভর্তুকি কমানোর উদ্দেশ্যে দাম বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হলেও, এতে সরবরাহব্যবস্থা কতটা উন্নত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলপি গ্যাসের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়েও ২০০–৩০০ টাকা বেশি দামে ভোক্তাদের গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বাজার তদারকির অভাব এবং কালোবাজারির অভিযোগও রয়েছে। যদিও সরকার কালোবাজারি দমনের কথা বলছে, তবে বাস্তবে বড় পরিসরে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নতুন করে শুরু হয়নি; বরং এর প্রভাব আগেই পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর আগেই পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ওপরও প্রভাব পড়ে। এখন দাম বৃদ্ধির ফলে এই চাপ আরও বেড়ে গেছে। পরিবহন খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
এতে সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে গেছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ব্যবসায়ীরা পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচে সমঝোতা করছেন। তিনি বলেন, সরকারের পূর্বের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান সিদ্ধান্তের মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকে, তাহলে সংকট তৈরি হলো কেন? এই ধরনের পরিস্থিতি জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পেট্রলপাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে কিছুটা শৃঙ্খলা ছিল, বর্তমানে সেখানে ভিড় ও চাপ বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন– বাজারে কার্যকর মনিটরিং এবং স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ, জ্বালানির বিকল্প উৎস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা। এ ছাড়া জনগণকেও সচেতনভাবে জ্বালানির ব্যবহার কমানো ও সাশ্রয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে।